দেশের দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন এবং সামাজিক ও অবকাঠামোগত সুবিধা বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে ২০০০ সালে সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (এসডিএফ) প্রতিষ্ঠা করে সরকার। সম্পূর্ণ অলাভজনক ভিত্তিতে পরিচালিত এই প্রতিষ্ঠানটি গত প্রায় আড়াই দশকে দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচির আওতায় বিশ্বব্যাংকের ঋণ ও সরকারি তহবিল মিলিয়ে মোট ৬ হাজার ৪৮৩ কোটি ২৩ লাখ টাকা ব্যয় করেছে।
তবে দীর্ঘ সময় ও বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও প্রতিষ্ঠানটির কার্যকারিতা ও অর্জন নিয়ে এখন নানা প্রশ্ন উঠেছে। পাশাপাশি এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য নেয়া বৈদেশিক ঋণের দায়ভার রাষ্ট্রের ওপর বাড়তে থাকায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর অভিযোগ, সুশাসনের ঘাটতি, অনিয়ম-দুর্নীতি, প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্বলতা এবং অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক প্রভাবের কারণে এসডিএফ প্রত্যাশিত ফল দিতে ব্যর্থ হয়েছে। অনেক প্রকল্প যথাযথ পরিকল্পনা ও বাস্তবতা যাচাই ছাড়া নেওয়ায় ব্যয়িত অর্থের বড় অংশের কাঙ্ক্ষিত সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুফল মেলেনি।
একটি স্বায়ত্তশাসিত ও টেকসই সামাজিক উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান হওয়ার কথা থাকলেও এসডিএফ ধীরে ধীরে বিশ্বব্যাংক নির্ভর প্রকল্পভিত্তিক কাঠামোয় পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আরও বলা হয়, এক প্রকল্প শেষ হওয়ার আগেই আরেকটি প্রকল্প ডিজাইন করা, পরীক্ষা বা উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই জনবল স্থানান্তর এবং দীর্ঘমেয়াদি চাকরিনির্ভর সংস্কৃতি গড়ে তোলা হয়েছে। এতে প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অন্যদিকে, সরকার বিশ্বব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে সেই অর্থ এসডিএফকে অনুদান হিসেবে দেয়। ফলে প্রকল্পের অর্থ মাঠপর্যায়ে ফেরত না এলেও ঋণের সম্পূর্ণ দায় রাষ্ট্র ও জনগণের ওপরই থেকে যায়। অভিযোগ রয়েছে, ‘ভ্যালু ফর মানি’ নিশ্চিত করার পরিবর্তে বড় অংশ অর্থ ব্যয় হয়েছে প্রশাসনিক খরচ ও জনবলের বেতনভাতায়।
প্রতিষ্ঠানটির শুরু থেকে এখন পর্যন্ত সমাপ্ত ছয়টি প্রকল্পে মোট বরাদ্দ ছিল ৩ হাজার ৩৮৩ কোটি ২৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে রয়েছে—নতুন জীবন জীবিকা উন্নয়ন প্রকল্পে ১ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা, ক্ষমতায়ন ও জীবিকা উন্নয়ন ‘নতুন জীবন’ প্রকল্পে ৮৯৭ কোটি টাকা, সামাজিক বিনিয়োগ কর্মসূচিতে ৪১৩ কোটি টাকা, ২০০৭ সালের বন্যা পুনর্বাসন ও পুনরুদ্ধার কর্মসূচিতে ১৭৫ কোটি টাকা, সিডর-পরবর্তী জীবিকা পুনরুদ্ধার প্রকল্পে ৬৮ কোটি টাকা এবং মঙ্গা মোকাবিলা উদ্যোগে ৫ কোটি টাকা।
বর্তমানে এসডিএফের তিনটি প্রকল্প চলমান রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রকল্প ‘রেজিলিয়েন্স, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও জীবিকা উন্নয়ন’ প্রকল্পে প্রায় ৩৪ কোটি ডলার বা প্রায় ২ হাজার ৯০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে, যার মধ্যে বিশ্বব্যাংকের ৩০ কোটি ডলার এবং সরকারের ৪ কোটি ডলার। এছাড়া কোভিড-১৯ অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রণোদনার আওতায় ৩০০ কোটি টাকার মধ্যে ইতোমধ্যে ২০০ কোটি টাকা নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রভাবশালী সংসদ সদস্যদের তদবিরে বৈজ্ঞানিক লক্ষ্য নির্ধারণ উপেক্ষা করে বিভিন্ন এলাকায় বড় প্রকল্প গ্রহণ এবং বিপুল জনবল নিয়োগ করা হয়েছে। ২০২০ সালের পর এ প্রবণতা আরও তীব্র হয়, ফলে সুবিধাভোগী নির্বাচন ও অর্থ বরাদ্দে স্বচ্ছতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বর্তমানে চলমান তিন প্রকল্পে প্রায় দেড় হাজার কর্মী কর্মরত আছেন। সম্প্রতি ল্যাপটপ ক্রয়, দ্বৈত চাকরি, তহবিলের অপব্যবহার এবং অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেটের প্রভাব নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
এসডিএফের বর্তমান চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নুরুল আমিনের পদত্যাগ দাবিতে গত মাসে কর্মীদের একটি অংশ আন্দোলনে নামে। তারা সংবাদ সম্মেলন করে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ তোলে এবং সরকারের কাছে স্মারকলিপি দেয়। একই সঙ্গে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে লিখিত অভিযোগও জমা দেওয়া হয় বলে জানা গেছে।
সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি হলো ৩২ কোটি টাকার ল্যাপটপ ক্রয় প্রকল্প, যেখানে প্রায় ১৫ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, কমিউনিটি ক্রয় নীতি ভেঙে একটি লাইসেন্সবিহীন ও অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই ক্রয় সম্পন্ন করা হয়।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ই-ট্রেড লাইসেন্স অনুযায়ী, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসা শুরু হয় ২০২৫ সালের ১ জুলাই এবং লাইসেন্স ইস্যু হয় ২৪ আগস্ট। অথচ একই বছরের জুলাই ও আগস্টে এসডিএফে ল্যাপটপ সরবরাহ দেখানো হয়। পরবর্তীতে ২০ জেলার ৩ হাজার ২০০ গ্রামে সরবরাহ করা ল্যাপটপের বড় অংশ বিকল হয়ে পড়ে এবং ওয়ারেন্টি না পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
এসডিএফের মানবসম্পদ নীতি লঙ্ঘন করে ৬২ বছর বয়সী ব্যবস্থাপনা পরিচালককে নিয়মিত সুবিধার আওতায় এনে প্রভিডেন্ট ফান্ডের সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। এছাড়া যুব প্রশিক্ষণের বিভিন্ন প্যাকেজে পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিতে ক্রয় প্রক্রিয়ায় চাপ প্রয়োগ এবং কম মূল্যের দরদাতাকে বাদ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
অন্যদিকে, বিশ্বব্যাংকের এক মূল্যায়নে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে এসডিএফকে সর্বনিম্ন ‘সি’ ক্যাটাগরিতে (অসন্তোষজনক) রাখা হয়। অভিযোগ রয়েছে, মেয়াদ বৃদ্ধির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা হয় যাতে অডিটে অনিয়ম ধরা না পড়ে।
প্রধান কার্যালয় পরিবর্তনের নামে ভুয়া ভাউচার তৈরি করে দেড় কোটি টাকা আত্মসাৎ, পুরনো এসি ও আসবাব কম দামে বিক্রি করে অর্থ লোপাট এবং নিম্নমানের চিকিৎসা সরঞ্জাম ক্রয় করে সেগুলো অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকার অভিযোগও তদন্তে এসেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে বর্তমানে তদন্ত করছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। ১৫ জুন এসডিএফের ১৮ জন আঞ্চলিক ও জেলা ব্যবস্থাপককে তলব করে তথ্য-প্রমাণসহ হাজির হতে বলা হয়।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক বলেন, অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং তদন্ত চলমান রয়েছে। বর্তমান প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, একটি দীর্ঘমেয়াদি নিয়মবহির্ভূত কাঠামো টিকিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে, যেখানে নির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠীর চাকরি ও সুবিধা বজায় রাখাই মূল উদ্দেশ্য।
অন্যদিকে, প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরে সাবেক এক অর্থ পরিচালককে ঘিরেও দুই প্রতিষ্ঠানে একসঙ্গে চাকরি ও বেতন নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এছাড়া রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অর্থ ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে, যার ভিত্তিতে তাকে বরখাস্ত করা হলে অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ বাড়ে।
এসডিএফ চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, অভিযোগগুলো সরকার তদন্ত করুক, এবং সত্য পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক—এতে তাদের কোনো আপত্তি নেই। প্রতিষ্ঠানটির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী বোর্ডে অধিকাংশই সাবেক ও বর্তমান আমলা। অভিযোগ রয়েছে, তদবির ও প্রভাব খাটিয়ে নিয়োগের একটি সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরে চলমান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসডিএফের বর্তমান সংকট কেবল অনিয়মের নয়, বরং এটি দীর্ঘদিনের সুশাসন ঘাটতির প্রতিফলন। প্রকল্পনির্ভর কাঠামো, দুর্বল নজরদারি এবং জবাবদিহির অভাবে প্রতিষ্ঠানটি কাঠামোগত ঝুঁকিতে পড়েছে। সময়মতো সংস্কার না হলে এটি রাষ্ট্রের জন্য দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক বোঝা হয়ে উঠতে পারে। এর আগেও দারিদ্র্য বিমোচনের বিভিন্ন প্রকল্প যেমন ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ কর্মসূচিতে অনিয়ম, নিয়োগ বাণিজ্য ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছিল। এসব ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলাও রয়েছে।
সাবেক অর্থ সচিব ও মহাহিসাব নিরীক্ষক মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী বলেন, এ ধরনের প্রতিষ্ঠান দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারলেও কার্যকর নজরদারি না থাকলে ‘ভ্যালু ফর মানি’ নিশ্চিত হয় না। ঋণের দায় শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকেই বহন করতে হয়। তাই সুশাসন ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা ছাড়া এসব প্রকল্প জনসম্পদের অপচয়ে পরিণত হতে পারে।

