তরুণ প্রজন্মের জন্য ডিজিটাল অর্থনীতিতে নতুন সুযোগ সৃষ্টি এবং দেশে বৈশ্বিক পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মের কার্যক্রম শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অনলাইন পেমেন্ট সেবা প্রতিষ্ঠান পেপ্যালসহ একাধিক বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে।
আজ সোমবার (২২ জুন) রাজধানীর গ্রিন রোডে ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের অডিটোরিয়ামে ‘সংখ্যার বাইরে, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গড়া: প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট ২০২৬–২৭’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বাজেটে তরুণ প্রজন্মকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষায়, স্টার্টআপ, ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য কর অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিদেশ থেকে আয় দেশে আনার প্রক্রিয়াও সহজ করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, আগে ছোট অঙ্কের অর্থ আনতে জটিল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হতো। এখন নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত অর্থ আনার ক্ষেত্রে ফরম পূরণের বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি। বড় অঙ্কের ক্ষেত্রে কিছু তথ্য জানাতে হতে পারে, তবে পুরো ব্যবস্থাই সহজ করা হয়েছে।
বৈশ্বিক পেমেন্ট ব্যবস্থার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মকে বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করার আহ্বান জানানো হয়েছে। ইতোমধ্যে পেপ্যালসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আসার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। ডিজিটাল অবকাঠামো নিয়ে তিনি বলেন, সিম সংক্রান্ত কিছু খরচ কমানো হয়েছে এবং ডিজিটাল সেবার বিভিন্ন বাধা হ্রাস করা হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে দেশকে বাস্তব অর্থে ডিজিটাল ব্যবস্থায় নিয়ে যাওয়া।
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, ডিজিটাল ব্যবস্থায় সবকিছু অন্তর্ভুক্ত হলে কর ফাঁকি দেওয়া কঠিন হবে। পাশাপাশি সরকারি সেবায় সরাসরি উপস্থিতি কমে গেলে দুর্নীতিও হ্রাস পাবে বলে তিনি মনে করেন। তাঁর মতে, অনলাইন সেবা বাড়লে নাগরিকদের সময় ও ভোগান্তি দুটোই কমবে।
বাজেট প্রণয়নের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি জানান, মাত্র দেড় মাসের মধ্যে বাজেট তৈরি করা হয়েছে। বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, যুদ্ধ ও অভ্যন্তরীণ চাহিদার বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, অতীতে অর্থনীতি কিছু নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে ছিল। ফলে সাধারণ মানুষ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সুযোগ সীমিত হয়ে গিয়েছিল। নতুন বাজেটে অর্থনীতিকে সবার জন্য উন্মুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
অর্থনীতিতে অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, অর্থনীতির সুফল যদি সাধারণ মানুষের কাছে না পৌঁছে, তাহলে প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানের কোনো বাস্তব অর্থ থাকে না। তাই নতুন অর্থনৈতিক মডেল হিসেবে ‘অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ন’-এর কথা বলা হয়েছে।
সৃজনশীল অর্থনীতির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, সমাজের যেসব জনগোষ্ঠী আগে মূলধারার অর্থনীতির বাইরে ছিল, তাদের অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে কামার, কুমার, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের কারিগর, বাউল, পালাগান ও থিয়েটার শিল্পীরা রয়েছেন। তিনি জানান, পূর্বাচলে ১৬০ একর জমির ওপর একটি থিয়েটার জেলা গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে।
পুঁজিবাজার নিয়ে আশাবাদ প্রকাশ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থায় যোগ্যতার ভিত্তিতে জনবল নিয়োগ করা হয়েছে। বড় বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো বাজারে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, জেপি মরগ্যান তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছে এবং তারা বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। আগামী দুই বছরের মধ্যে পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সিজিএসের সভাপতি জিল্লুর রহমান। আরও উপস্থিত ছিলেন অর্থনীতিবিদ সেলিম জাহান, বিসিআই সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ, ট্রান্সকম লিমিটেডের সিইও সিমিন রহমানসহ বিভিন্ন খাতের প্রতিনিধিরা।
অর্থনীতিবিদ সেলিম জাহান বলেন, বাজেট ও অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু মানুষ। তাঁর মতে, শুধু সংখ্যা বা বরাদ্দ নয়, উন্নয়নের মূল বিচার হওয়া উচিত মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন। তিনি আরও বলেন, বাজেট শুধু সংখ্যার হিসাব নয়, এটি একটি দর্শন। অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের মাধ্যমে মানবিক সমাজ গড়ার লক্ষ্য থাকা জরুরি।

