২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এত বড় বাজেট আদৌ দেশের প্রয়োজন মেটায় কি না—এ নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
তবে দেশের জনসংখ্যার চাপ, দ্রুত পরিবর্তিত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং নাগরিকদের জীবনমান উন্নয়নের প্রত্যাশার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এ বাজেটকে একেবারে অপ্রয়োজনীয় বলা কঠিন। বিশেষ করে শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির নানা উদ্যোগকে ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে। বাজেটে নতুনভাবে যুক্ত হয়েছে সৃজনশীল অর্থনীতি খাত, যেখানে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দের অঙ্গীকার করা হয়েছে।
সরকার এ বাজেটে ১০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য ঘোষণা করেছে। পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়ন, উদ্যোক্তা তৈরি এবং যুবসমাজকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান শক্তি হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও বলা হয়েছে। সরকারের দাবি, সৃজনশীল অর্থনীতি ভবিষ্যতে মোট দেশজ উৎপাদনে বড় অবদান রাখবে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে। তবে বাস্তব চিত্র নিয়ে প্রশ্নও উঠছে। গত কয়েক বছরের বাজেট ঘোষণাগুলোতেও একই ধরনের কর্মসংস্থান প্রতিশ্রুতি ছিল। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে তরুণদের একটি বড় অংশ দেশের বাইরে পাড়ি জমাচ্ছে।
পরিসংখ্যান বলছে, বিদেশগামী কর্মীর সংখ্যা প্রতি বছরই ওঠানামা করছে। ২০২১ সালে ৬ লাখ ১৭ হাজারের বেশি মানুষ বিদেশে গেছে। ২০২২ সালে এই সংখ্যা বেড়ে প্রায় ১১ লাখ ৩৫ হাজারে পৌঁছায়। ২০২৩ সালে তা ১৩ লাখ ছাড়িয়ে যায়। ২০২৪ সালে বিদেশে গেছে প্রায় ১০ লাখ মানুষ। সর্বশেষ ২০২৫ সালে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১ লাখ ৩২ হাজারে।
বিদেশে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি সবসময় নেতিবাচক নয়। কিন্তু যখন কোনো দেশ অভ্যন্তরীণভাবে পর্যাপ্ত ও মর্যাদাপূর্ণ চাকরি তৈরি করতে ব্যর্থ হয়, তখন তরুণদের বিদেশমুখিতা বাড়ে। অতীত বাজেটগুলোর প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও দেশের শ্রমবাজারে শিক্ষিত যুবকদের জন্য কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি—এমন অভিযোগও রয়েছে।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বিদেশে যাওয়া শ্রমিকদের বড় অংশই এখনো স্বল্পদক্ষ বা অদক্ষ। বহু বছর ধরে কারিগরি শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের কথা বলা হলেও বাস্তব অগ্রগতি সীমিত। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিদেশগামী শ্রমিকদের প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশই স্বল্পদক্ষ বা অদক্ষ। যা ভারত, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন ও ভিয়েতনামের তুলনায় বেশি।
শুধু নীতিগত ঘোষণা নয়, বাস্তবায়নের ঘাটতিও এখানে বড় প্রশ্ন। প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন ও বিভিন্ন প্রকল্প চালু থাকলেও প্রশিক্ষিতদের কতজন সত্যিকারের দক্ষ কর্মী হিসেবে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রবেশ করতে পারছেন—এ নিয়ে স্পষ্ট মূল্যায়ন নেই।
প্রতি বছর বাজেটে কর্মসংস্থান লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও পরবর্তী বাজেটে তার পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন খুব কমই দেখা যায়। কোন খাতে কত চাকরি তৈরি হলো, কতটা টেকসই হলো, কেন লক্ষ্য পূরণ হলো না—এসব প্রশ্নের জবাবদিহিতা দুর্বল বলেই মনে করা হয়।
ফলে কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি অনেক সময় রাজনৈতিক ঘোষণায় সীমাবদ্ধ থেকে যায়। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে শিক্ষিত তরুণদের ওপর। তাদের বড় একটি অংশ মনে করে, যোগ্যতা নয় বরং অর্থ ও প্রভাবই চাকরি পাওয়ার মূল নিয়ামক। সরকারি নিয়োগে অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশ্নফাঁস ও দুর্নীতির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। একটি আন্তর্জাতিক সূচকে ১০০-এর মধ্যে ২৪ নম্বর পেয়ে বাংলাদেশ ২০২৫ সালে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে ১৩তম অবস্থানে রয়েছে—এ তথ্যও আলোচনায় আসে।
এই প্রেক্ষাপটে সৃজনশীল অর্থনীতি খাতে বরাদ্দ একটি নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিলেও এর সফলতা নির্ভর করবে বাস্তব কাঠামোর ওপর। বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প খাতের সমন্বয়, গবেষণায় বিনিয়োগ, প্রযুক্তি অবকাঠামো, স্টার্টআপ পরিবেশ, মেধাস্বত্ব সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ না বাড়ালে এই খাতের সম্ভাবনা সীমিত থাকবে।
বাস্তবতা হলো, সমস্যা শুধু কর্মসংস্থান নিয়ে প্রতিশ্রুতির অভাব নয়; বরং সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দুর্বলতা। দেশের ভেতরে যদি পর্যাপ্ত ও মানসম্মত চাকরি তৈরি হতো, দক্ষতা উন্নয়ন কার্যকর হতো এবং মেধাভিত্তিক প্রতিযোগিতার ওপর আস্থা তৈরি করা যেত—তাহলে তরুণদের বিদেশমুখিতা এতটা বাড়ত না।
২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে বরাদ্দের পরিমাণে নয়, বরং ফলাফলে। আগামী এক বছরে যদি সরকার ১০ লাখ কর্মসংস্থান বাস্তবায়ন করতে পারে, দক্ষ শ্রমিকের অনুপাত বাড়াতে পারে এবং তরুণদের জন্য দেশের ভেতরে বাস্তব সুযোগ তৈরি করতে পারে—তাহলে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে। তবে এর জন্য শুধু অর্থ বরাদ্দ যথেষ্ট নয়। সৃজনশীল অর্থনীতির ধারণাকে আরও স্পষ্ট করতে হবে। এটি শুধু কনটেন্ট নির্মাণে সীমাবদ্ধ না রেখে বিস্তৃত পরিসরে তরুণদের যুক্ত করার সুযোগ তৈরি করতে হবে।
একই সঙ্গে নিয়োগ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো পাঠ্যক্রম হালনাগাদ করা, প্রযুক্তিনির্ভর ও কারিগরি শিক্ষায় জোর দেওয়া এবং উদ্যোক্তা তৈরির পরিবেশ সহজ করা জরুরি। তরুণরা সহজে ব্যবসা শুরু করতে পারা, ঋণ পাওয়া এবং লাইসেন্স প্রক্রিয়া সহজ হওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, ব্যবসা করার ক্ষেত্রে হয়রানি, চাঁদাবাজি বা অনৈতিক চাপ থেকে মুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা। কারণ এই অনিশ্চয়তাই অনেক শিক্ষিত তরুণকে দেশে উদ্যোক্তা হওয়ার বদলে বিদেশে যাওয়ার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
- ড. মো. ফরিদ তালুকদার: সহকারী অধ্যাপক, ব্যবস্থাপনা বিভাগ, ম্যাকনিজ স্টেট ইউনিভার্সিটি, লুইজিয়ানা, যুক্তরাষ্ট্র।

