২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে মানব উন্নয়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের একটি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা থাকলেও এর ভিত্তি দুর্বল বলে মন্তব্য করেছে গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
সংস্থাটি বলছে, বাজেটে যেসব উচ্চাভিলাষী সামষ্টিক অর্থনৈতিক লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, সেগুলোর ভিত্তি নড়বড়ে। একই সঙ্গে প্রস্তাবিত রাজস্ব কাঠামো বর্তমান অবস্থায় টিকে থাকার মতো নয়।
গতকাল রোববার গুলশানের একটি হোটেলে আয়োজিত ‘বাজেট সংলাপ ২০২৬’-এ সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন সংস্থার ‘বাংলাদেশ উন্নয়ন পর্যালোচনা’ বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন। সেখানে তিনি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে আটটি মূল পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ১১ জুন সংসদে যে বাজেট পেশ করেন, সেটির ভিত্তিতেই এই মূল্যায়ন করা হয়েছে বলে জানায় সিপিডি।
সংস্থাটির বিশ্লেষণে বলা হয়, সাড়ে ছয় শতাংশ মোট দেশজ উৎপাদন প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য গত অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে থাকা প্রায় পাঁচ শতাংশ লক্ষ্যের তুলনায় অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত দিলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাময়িক তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে প্রকৃত প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র চার দশমিক ১৪ শতাংশ।
রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রেও বড় ব্যবধানের কথা তুলে ধরেছে সিপিডি। তাদের মতে, সরকার ১৮ দশমিক দুই শতাংশ প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত তথ্যের ভিত্তিতে সংস্থাটির প্রাক্কলন বলছে, গত অর্থবছরে প্রকৃত রাজস্ব আদায় হতে পারে প্রায় চার লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা। ফলে লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজনীয় প্রবৃদ্ধি দাঁড়ায় প্রায় ৫৪ দশমিক চার শতাংশ, যা বাস্তবায়নযোগ্য নয় বলে মনে করছে সংস্থাটি।
মানবসম্পদ খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও সিপিডি সতর্ক করেছে ব্যবহারের দুর্বলতা নিয়ে। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ গত সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ১২৪ শতাংশ এবং শিক্ষা খাতে ৪২ দশমিক সাত শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে সংস্থাটি বলছে, এসব খাতে দীর্ঘদিন ধরেই বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা দুর্বল। উদাহরণ হিসেবে তারা জানায়, স্বাস্থ্য খাতে উন্নয়ন বরাদ্দ ব্যবহারের হার ২০১৪-১৫ অর্থবছরের ৮০ শতাংশ থেকে কমে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মাত্র ৩০ শতাংশে নেমে এসেছে।
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির ক্ষেত্রেও উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার চিত্র তুলে ধরে সিপিডি। তিন লাখ কোটি টাকার বরাদ্দ গত অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ৫০ শতাংশ বেশি হলেও বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। গত বছরের প্রথম ১০ মাসে এর মাত্র ৩৫ দশমিক চার শতাংশ ব্যয় হয়েছে বলে জানায় সংস্থাটি।
সিপিডি আরও উল্লেখ করেছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকা আটটি বড় প্রকল্পের একটিও, যার মধ্যে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে, সময়মতো শেষ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। ব্যক্তিগত আয়কর কাঠামো নিয়েও বৈষম্যের অভিযোগ তুলেছে সংস্থাটি। তাদের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, বার্ষিক ৩০ লাখ টাকার বেশি আয়কারীদের তুলনায় নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর করের চাপ অনুপাতে বেশি বেড়েছে।
সামাজিক নিরাপত্তা খাতে চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ ১৩ দশমিক নয় শতাংশ বেড়ে এক লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। তবে এর বড় অংশ—পেনশন ব্যবস্থাপনা ও কৃষি ভর্তুকি—সামাজিক নিরাপত্তা ব্যয়ের ৪৩ দশমিক দুই শতাংশ জুড়ে রয়েছে, যা সরাসরি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য নয় বলে মন্তব্য করেছে সিপিডি।
কর্মসংস্থান সৃষ্টির সরকারি প্রতিশ্রুতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটি। ১৮ মাসে এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান তৈরির অঙ্গীকার থাকলেও কর্মসংস্থান-সংশ্লিষ্ট চারটি প্রধান মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ মোট বাজেটের অংশ হিসেবে কমেছে বা স্থবির রয়েছে। বিশেষ করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ ৯০৯ কোটি টাকা থেকে কমে ৩২৯ কোটি টাকায় নেমে এসেছে।
এছাড়া ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের সময় পিছিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করা হলেও উত্তরণের পর বাণিজ্য সুবিধা কমে যাওয়ার ঝুঁকি মোকাবিলায় বাজেটে কোনো মধ্যমেয়াদি রূপরেখা নেই বলেও উল্লেখ করেছে সিপিডি।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে নতুন সরকারের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা প্রমাণের প্রথম বড় সুযোগ এই বাজেট। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের গুণগত মান এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ওপর।

