দেশের সিমেন্টশিল্প বর্তমানে এক কঠিন সময় অতিক্রম করছে। একদিকে উৎপাদন ব্যয় ক্রমাগত বাড়ছে, অন্যদিকে বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় শিল্পটি দ্বিমুখী চাপের মুখে পড়েছে। নির্মাণ খাতে দীর্ঘদিনের মন্দা, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের ধীরগতি, বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতা এবং ব্যক্তি পর্যায়ে নতুন বাড়িঘর নির্মাণ কমে যাওয়ার প্রভাব সরাসরি পড়ছে সিমেন্টের বাজারে।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন খাতগুলোর একটি হলেও বর্তমানে সিমেন্টশিল্প তার পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগাতে পারছে না। কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা অনেক বেশি হলেও বাজারে সেই অনুপাতে চাহিদা নেই। ফলে উৎপাদন সক্ষমতার বড় অংশ ব্যবহারহীন অবস্থায় পড়ে থাকছে। এতে মুনাফা কমে যাচ্ছে এবং শিল্পটির দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএমএ) সূত্র জানায়, দেশে বর্তমানে ৪০টি সিমেন্ট কারখানার মোট উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৮৬ মিলিয়ন টন। কিন্তু ২০২৫ সালে মোট বিক্রি হয়েছে মাত্র ৩৯ দশমিক ৭৯ মিলিয়ন টন। অর্থাৎ উৎপাদন সক্ষমতার অর্ধেকেরও বেশি অংশ অব্যবহৃত রয়েছে। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে বিক্রি আরও ৩ শতাংশ কমেছে, যা বাজার পরিস্থিতির আরও অবনতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বড় অবকাঠামো প্রকল্পের কাজের গতি কমে এসেছে। একই সঙ্গে আবাসন খাতে নতুন বিনিয়োগও প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায়নি। উচ্চ সুদের হার এবং নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধির কারণে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান অনেক ক্ষেত্রেই নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগ থেকে সরে আসছে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে সিমেন্ট খাতে।
বিসিএমএর সভাপতি এবং চিটাগাং চেম্বারের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, চাহিদা হ্রাস, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং অর্থায়নের উচ্চ ব্যয়—সব মিলিয়ে শিল্পটি এখন বহুমুখী চাপে রয়েছে। তিনি মনে করেন, খাতটির টেকসই উন্নয়নের জন্য দ্রুত নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, দেশের সিমেন্টশিল্প প্রায় পুরোপুরি আমদানিনির্ভর। ক্লিংকার, স্ল্যাগ, চুনাপাথর, ফ্লাই অ্যাশ এবং জিপসামের মতো প্রধান কাঁচামালের অধিকাংশই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে এসব কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি এবং টাকার অবমূল্যায়নের কারণে আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও সরবরাহ ব্যবস্থার অনিশ্চয়তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
জ্বালানি তেল ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাবও পুরো সরবরাহ ব্যবস্থাজুড়ে পড়েছে। কাঁচামাল আমদানি থেকে শুরু করে উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে খরচ বেড়েছে। অন্যদিকে ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদের হার উদ্যোক্তাদের জন্য অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি করছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, বিদ্যুতের দাম ১৬ শতাংশ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়বে। তাঁদের মতে, বর্তমান কর ও শুল্ককাঠামোও শিল্পবান্ধব নয়। এ কারণে কাঁচামাল আমদানিতে অগ্রিম আয়কর কমানো, বিক্রয় পর্যায়ে করের চাপ হ্রাস এবং শিল্পবান্ধব নীতিসহায়তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।
বিসিএমএর নেতারা মনে করেন, দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে গতি ফিরিয়ে আনা, নির্মাণ ও আবাসন খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো, কর ও শুল্ক কাঠামো পুনর্বিবেচনা করা এবং রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। অন্যথায় পর্যাপ্ত উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্প খাত আরও গভীর সংকটে পড়তে পারে।

