দেশের শিল্প খাতে বড় ধরনের অচলাবস্থার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে গ্যাসসংযোগ সংকটকে ঘিরে। হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে কারখানা নির্মাণ শেষ করলেও প্রয়োজনীয় গ্যাস না পাওয়ায় বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদনে যেতে পারছে না। ফলে একদিকে বিপুল বিনিয়োগ অলস পড়ে আছে, অন্যদিকে ঋণের সুদের চাপ সামলাতে গিয়ে উদ্যোক্তারা আর্থিক সংকটে পড়ছেন।
শিল্প মালিকদের মতে, সরকারি আশ্বাসের ভিত্তিতে বিনিয়োগ করলেও সময়মতো গ্যাস সরবরাহ না হওয়ায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এর অন্যতম উদাহরণ মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের (এমজিআই) কুমিল্লা অর্থনৈতিক অঞ্চলে নির্মিত দুটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান। প্রায় ৭ হাজার ৩২০ কোটি টাকা বিনিয়োগে গড়ে তোলা কাচ ও রড উৎপাদন কারখানার নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে যথাক্রমে আড়াই বছর ও দেড় বছর আগে। তবে এখনো গ্যাসসংযোগ না পাওয়ায় উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হয়নি।
প্রতিষ্ঠানটির সূত্র জানায়, সরকারি আশ্বাসের ওপর আস্থা রেখে নিজস্ব অর্থায়নে প্রায় ৫৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে গ্যাসলাইনসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। তবুও গ্যাস না পাওয়ায় পুরো বিনিয়োগ কার্যকর করা যাচ্ছে না।
এমজিআইয়ের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল গণমাধ্যমকে জানান, বিদেশি ঋণের অর্থে কারখানা দুটি নির্মাণ করা হয়েছে। এর বিপরীতে প্রতি মাসে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে। বিদেশি ঋণ পুনঃতফসিল বা সুদ মওকুফের সুযোগ না থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, কুমিল্লা অর্থনৈতিক অঞ্চলের সাতটি কারখানায় প্রায় ১৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গ্যাসসংযোগ না থাকায় পুরো প্রকল্পই কার্যত স্থবির অবস্থায় রয়েছে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, তিতাস গ্যাসসহ দেশের ছয়টি গ্যাস বিতরণ কোম্পানির কাছে বর্তমানে শিল্প খাতে গ্যাসসংযোগের জন্য ১ হাজার ৮০০টির বেশি আবেদন জমা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫৫০টি প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে এবং সংযোগ ফিও পরিশোধ করেছে। তবুও তারা এখনো গ্যাসের অপেক্ষায় রয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী সম্প্রতি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ সচিবকে পাঠানো এক চিঠিতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পপ্রতিষ্ঠানে দ্রুত গ্যাসসংযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, সংযোগ দিতে না পারলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি কমে যাবে এবং ভবিষ্যতে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ করাও কঠিন হয়ে পড়বে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে কুমিল্লার মেঘনা উপজেলায় এমজিআইয়ের ৩৬১ একর আয়তনের অর্থনৈতিক অঞ্চলে কাচ ও রড কারখানার নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের পাইপলাইন স্থাপন করা হলেও এখনো সংযোগ দেওয়া হয়নি। শ্রমিকদের জন্য আবাসন নির্মাণও শেষ হয়েছে।
তবে অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রবেশের সড়কের অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। বিভিন্ন স্থানে বড় গর্ত ও জলাবদ্ধতার কারণে যাতায়াতে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এমজিআইয়ের মহাব্যবস্থাপক (হিসাব ও অর্থ) সুমন চন্দ্র ভৌমিক জানান, সড়ক উন্নয়নের জন্য প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব করা হলেও এখনো অনুমোদন মেলেনি। ফলে শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় মানুষ উভয়ই ভোগান্তির মুখে রয়েছেন।
শুধু এমজিআই নয়, দেশের শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠীগুলোর অনেকেই একই সংকটে রয়েছে। মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ায় হোসেন্দি অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগে সিটি গ্রুপের পাঁচটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান—সিমেন্ট, চিনি, কাগজ, জাহাজ ও এলপিজি কারখানা—গ্যাসের অভাবে চালু করা যাচ্ছে না।
সিটি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হাসান বলেন, প্রতিষ্ঠানটিকে প্রতিদিন প্রায় ৫ কোটি টাকা সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে। অথচ কবে গ্যাসসংযোগ পাওয়া যাবে, সে বিষয়েও কোনো নিশ্চিত তথ্য নেই।
একই পরিস্থিতিতে রয়েছে হা-মীম গ্রুপ, টি কে গ্রুপ এবং বাংলাদেশ অটো ইন্ডাস্ট্রিজসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। চট্টগ্রামের মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে বাংলাদেশ অটো ইন্ডাস্ট্রিজ প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা বিনিয়োগে বৈদ্যুতিক গাড়ি ও ব্যাটারি উৎপাদন কারখানা স্থাপন করেছে। কিন্তু গ্যাসসংযোগ না থাকায় উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না।
দেশে গ্যাস সংকটের ইতিহাসও দীর্ঘ। ২০০৯ সালে শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে এবং ২০১০ সালে আবাসিক খাতে নতুন গ্যাসসংযোগ বন্ধ করে সরকার। পরে সীমিত আকারে কিছু সংযোগ দেওয়া হলেও চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান ক্রমেই বেড়েছে।
বর্তমানে দেশে দৈনিক প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে, যেখানে মোট চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। পেট্রোবাংলার হিসাবে, প্রতিশ্রুত শিল্পসংযোগগুলো বাস্তবায়নের জন্য অতিরিক্ত প্রায় ৩৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন কমে যাওয়ায় সংকট আরও গভীর হয়েছে। বর্তমানে যে পরিমাণ উত্তোলনযোগ্য গ্যাস মজুত রয়েছে, তা বর্তমান উৎপাদন হারে সাত থেকে আট বছরের বেশি স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলমের মতে, জ্বালানি খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো জরুরি। একই সঙ্গে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে গুরুত্ব দিতে হবে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠানকে আগে থেকেই গ্যাসসংযোগের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তাদের বিষয়টি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তবে নতুন করে শিল্পে গ্যাস সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। তার মতে, আগামী চার থেকে পাঁচ বছর গ্যাস সংকট অব্যাহত থাকতে পারে। তাই দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি, জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ এখনই জোরদার করা প্রয়োজন।

