আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কর ব্যবস্থায় বৈষম্য কমানোর কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি বলে মনে করছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটির মতে, রাজস্ব আহরণের চাপ মূলত সাধারণ মানুষের ওপরই পড়ছে। অন্যদিকে প্রভাবশালী ব্যক্তি ও বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের কর ফাঁকি ঠেকাতে দৃশ্যমান কোনো কার্যকর ব্যবস্থা রাখা হয়নি।
গত বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) সিপিডি ও ক্রিশ্চিয়ান এইড বাংলাদেশ আয়োজিত এক যৌথ সংলাপে এসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়। সেখানে ‘ট্যাক্স জাস্টিস ইন দ্য ন্যাশনাল বাজেট: অবজারভেশনস অন ফিসকাল প্রপোজালস ফর এফওয়াই ২০২৬-২৭’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট তামিম আহমেদ।
সংলাপে সভাপতিত্ব ও সঞ্চালনা করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। এতে বক্তব্য দেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ, বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম এবং এনবিআরের সদস্য ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী।
প্রতিবেদনে বলা হয়, কর ন্যায়বিচারের অন্যতম ভিত্তি হলো প্রগতিশীল কর ব্যবস্থা। অর্থাৎ যার আয় বেশি, তার করের হারও বেশি হওয়া উচিত। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান কর কাঠামো সেই নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। প্রস্তাবিত বাজেটে মোট রাজস্ব আয়ের সর্বোচ্চ ৩৮ শতাংশ ভ্যাট থেকে সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। যেহেতু ভ্যাট একটি পরোক্ষ কর, তাই এটি আয়ের পার্থক্য বিবেচনা না করেই সবার ওপর সমানভাবে প্রযোজ্য হয়।
সিপিডির ভাষ্য অনুযায়ী, একজন দিনমজুর বা রিকশাচালক যখন এক লিটার সয়াবিন তেল কিংবা শিশুখাদ্য কিনেন, তখন তাকে যে পরিমাণ ভ্যাট দিতে হয়, দেশের ধনী ব্যক্তিকেও একই পরিমাণ ভ্যাট দিতে হয়। ফলে আয়ের তুলনায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর করের প্রকৃত চাপ অনেক বেশি পড়ে। এ কারণেই পরোক্ষ করের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতাকে বাজেটের অন্যতম বৈষম্যমূলক দিক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংস্থাটি আরও বলেছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেলেও করমুক্ত আয়ের সীমা প্রথম দুই বছরের জন্য ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকাতেই অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। যদিও পরবর্তী বছরগুলোতে এই সীমা পর্যায়ক্রমে ৪ লাখ এবং ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকায় উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে, তবু বর্তমান পরিস্থিতিতে তা করদাতাদের জন্য তাৎক্ষণিক কোনো স্বস্তি আনছে না।
সিপিডির প্রতিবেদনে বাজেটের আরেকটি বড় বৈষম্যমূলক দিক হিসেবে আবাসন খাতে অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালো টাকা বৈধ করার সুযোগের সমালোচনা করা হয়েছে। এতে বলা হয়, একদিকে সৎ করদাতারা নিয়মিত আয়ের ওপর সর্বোচ্চ ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বা তারও বেশি হারে কর পরিশোধ করছেন। অন্যদিকে কর ফাঁকি দিয়ে অর্জিত অর্থের মালিকরা বিশেষ সুবিধায় তুলনামূলক কম কর দিয়ে সেই অর্থ বৈধ করার সুযোগ পাচ্ছেন। এতে সৎ করদাতারা নিরুৎসাহিত হন এবং কর ব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়, শুধু ২০২২-২৩ অর্থবছরেই কর ফাঁকি ও কর এড়ানোর কারণে দেশের রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২৬ হাজার ২৩৬ কোটি টাকা। সিপিডির মতে, এই অর্থের বড় অংশ উচ্চবিত্ত, বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর বিভিন্ন আইনি ফাঁকফোকর ব্যবহারের মাধ্যমে হারিয়ে যাচ্ছে। এনবিআরের কাঠামোগত দুর্বলতা এবং স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার ঘাটতিও এ পরিস্থিতির অন্যতম কারণ। ফলে কর ফাঁকি রোধে ব্যর্থ হয়ে সরকার শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপর ভ্যাট ও অন্যান্য পরোক্ষ করের চাপ বাড়াচ্ছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বিশ্বের অনেক উন্নত দেশে ধনী-দরিদ্র বৈষম্য কমাতে উত্তরাধিকার কর বা সম্পদ কর কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু এবারের বাজেটে ধনীদের সঞ্চিত সম্পদের ওপর অতিরিক্ত কর আরোপের কোনো উদ্যোগ নেই। একই সঙ্গে করের অর্থে পরিচালিত শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও বরাদ্দকে অপর্যাপ্ত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির মাত্র ০ দশমিক ৯২ শতাংশ এবং শিক্ষা খাতে ১ দশমিক ৭৯ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
তবে প্রতিবেদনে ৪১ লাখ নারীর জন্য ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বলা হয়েছে, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না থাকায় সাধারণ মানুষকে চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে ব্যক্তিগত সম্পদ বিক্রি করার মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
কর ব্যবস্থায় বৈষম্য কমাতে সিপিডি ও ক্রিশ্চিয়ান এইড বাংলাদেশ পাঁচটি সুপারিশ তুলে ধরেছে। এর মধ্যে রয়েছে পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ধনীদের জন্য প্রগতিশীল প্রত্যক্ষ করের পরিধি বাড়ানো এবং সম্পদ কর চালু করা। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতি বছর করমুক্ত আয়ের সীমা পুনর্নির্ধারণ করা। সাধারণ ভ্যাটের হার ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশে আনা এবং দরিদ্র পরিবারের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে ভ্যাটের বিপরীতে নগদ ফেরত বা রেয়াত সুবিধা চালু করা। পাশাপাশি আবাসন খাতে কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ স্থায়ীভাবে বন্ধ করারও সুপারিশ করা হয়েছে।

