আগামী এক দশকের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করতে হলে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত অন্তত ১৫ শতাংশে উন্নীত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন। তবে তাঁর মতে, ব্যবসায়ী ও প্রশাসনের মধ্যে যোগসাজশ চলতে থাকলে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হবে না।
ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতীয় বাজেট নিয়ে আয়োজিত এক সেমিনারে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ক্লাব এ সেমিনারের আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান। আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক অধ্যাপক এ কে এনামুল হক।
ড. ফরাসউদ্দিন বলেন, করের সর্বোচ্চ হার ২০ শতাংশের বেশি হওয়া উচিত নয়। তাঁর ভাষ্য, করের হার অতিরিক্ত বাড়ানো হলে মানুষ কর দিতে নিরুৎসাহিত হয় এবং অনেকেই সম্পদ গোপন করার চেষ্টা করেন। তাই শুধু করের হার বাড়িয়ে রাজস্ব আদায়ের চিন্তা বাস্তবসম্মত নয়। তিনি আরও বলেন, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ পিছিয়ে দেওয়ার চিন্তা সঠিক হবে না।
রেমিট্যান্সের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে সাবেক এই গভর্নর বলেন, প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ কাজে লাগিয়ে তিস্তা ব্যারাজের মতো বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব। এ জন্য বিদেশি অর্থায়নের প্রয়োজন নেই। তাঁর প্রস্তাব, প্রবাসীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহের সময় জানাতে হবে যে প্রথম তিন বছর কোনো মুনাফা দেওয়া হবে না। এরপর থেকে বছরে ১২ শতাংশ হারে মুনাফা দেওয়া হবে। তাঁর মতে, বিশ্বের অনেক দেশে সেতু ও সড়ক নির্মাণে এ ধরনের অর্থায়ন পদ্ধতি ব্যবহৃত হচ্ছে এবং লাভজনক হওয়ায় বিনিয়োগকারীরাও এতে আগ্রহ দেখান।
তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতির বর্তমান আকার বিবেচনায় এবারের জাতীয় বাজেট অন্তত ১৪ লাখ কোটি টাকা বা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২০ শতাংশ হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেট জিডিপির মাত্র ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ। এমনকি এই বাজেটও যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা যাবে কি না, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে।
ড. ফরাসউদ্দিনের মতে, জনসংখ্যায় পাকিস্তান এগিয়ে থাকলেও বাংলাদেশের জিডিপি ও মাথাপিছু আয় বেশি। তবে শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না, সম্পদের ন্যায্য বণ্টনও নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, ১৯৭২ সালে বৈষম্যের সূচক ছিল শূন্য দশমিক ৩২, যা বর্তমানে বেড়ে শূন্য দশমিক ৫০ হয়েছে। এটি বৈষম্য বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয় এবং দেশের অগ্রগতির ক্ষেত্রে উদ্বেগের বিষয়।
জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য কর্মঘণ্টা পুনর্বিন্যাসেরও পরামর্শ দেন তিনি। তাঁর মতে, সোমবার থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা এবং শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত অফিস চালু থাকলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ব্যবহার কমানো সম্ভব হবে।
একই সঙ্গে তিনি জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর ওপর জোর দেন। গ্যাসের সংকট সমাধানে নতুন করে আবাসিক গ্যাস সংযোগ না দিয়ে সবাইকে সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহারের আওতায় আনারও পরামর্শ দেন তিনি।

