বাংলাদেশে এখন আর কাঁঠাল শুধু মৌসুমি ফল নয়। এই ফলকে ঘিরে ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে সম্ভাবনাময় একটি প্রক্রিয়াজাত শিল্প। কাঁঠাল থেকে এখন তৈরি হচ্ছে চিপস, আচার, ফ্রেশ কাট, বার্গার, চপ, নানা ধরনের জলখাবারসহ প্রায় ৩০ ধরনের পণ্য। এর মধ্যে কয়েকটি ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের অন্তত ৩০টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। একই সঙ্গে রাজধানী ঢাকা, গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার বাজার ও ছোট-বড় দোকানেও এসব পণ্যের উপস্থিতি বাড়ছে।
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ কাঁঠাল উৎপাদনকারী দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ এখনো এ খাতের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি। আধুনিক প্রযুক্তি, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, কোল্ড-চেইন ব্যবস্থা এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে কাঁঠালভিত্তিক রপ্তানি শিল্প কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোতে পারছে না। বর্তমানে ব্যক্তিগত উদ্যোগে মাত্র সাত থেকে আটজন উদ্যোক্তা বিদেশে কাঁঠালের প্রক্রিয়াজাত পণ্য রপ্তানি করছেন।
প্রতিষ্ঠানভেদে বছরে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ ডলারের প্রক্রিয়াজাত কাঁঠালপণ্য বিদেশে বিক্রি হচ্ছে। একই সময়ে দেশের অভ্যন্তরেও এসব পণ্যের বাজার ধীরে ধীরে বিস্তৃত হচ্ছে। বিভিন্ন মেলা, সুপারশপ ও খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রে এখন কাঁঠালের চিপস, আচার ও অন্যান্য পণ্য সহজেই দেখা যাচ্ছে।
এই খাতে কাজ করা উদ্যোক্তাদের মধ্যে অন্যতম হাজেরা অ্যাগ্রো প্রাইভেট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং আড়ৎ অ্যাগ্রো বিডির কর্ণধার মোহাম্মদ কাঞ্চন মিয়া। মানিকগঞ্জের এই উদ্যোক্তা দেশের সবচেয়ে বেশি কাঁঠাল উৎপাদনকারী জেলা গাজীপুরের মাওনায় গড়ে তুলেছেন প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা।
তার ভাষ্য, বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৩০টি দেশে বাংলাদেশের কাঁঠাল ও কাঁঠালজাত পণ্য যাচ্ছে। বিশেষ করে শীতপ্রধান দেশগুলোতে এসব পণ্যের চাহিদা উল্লেখযোগ্য। চিপস, আচার, ফ্রেশ কাট কাঁঠাল এবং আস্ত কাঁঠাল বিদেশের বাজারে নিয়মিত রপ্তানি হচ্ছে।
কাঞ্চন মিয়া জানান, ২০২২ সালে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর তিনি কাঁঠাল প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজ শুরু করেন। বর্তমানে কাঁঠাল থেকে প্রায় ৩০ ধরনের পণ্য তৈরি করা সম্ভব হলেও তার প্রতিষ্ঠানে সবগুলো উৎপাদিত হয় না। বিভিন্ন নারী উদ্যোক্তা বার্গার, চপ, জলখাবার ও অন্যান্য খাদ্যপণ্য তৈরি করেন। চাহিদা অনুযায়ী সেসব সংগ্রহ করে বাজারজাত করা হয়।
রপ্তানিযোগ্য পণ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি যাচ্ছে ফ্রেশ কাট কাঁচা কাঁঠাল, কাঁঠালের চিপস, আচার, আস্ত কাঁঠাল, বিচি এবং বিচির গুঁড়া। এসব পণ্য বর্তমানে চীন, জাপান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন, যুক্তরাজ্য, আয়ারল্যান্ড, ফ্রান্স, ইতালি, জার্মানি, পর্তুগাল, স্পেন, সুইডেন, ডেনমার্ক, নরওয়ে, বেলজিয়াম, সুইজারল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। রাশিয়ার বাজারেও এসব পণ্যের ভালো সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান তিনি।
দেশের বাজারেও কাঁঠালের প্রক্রিয়াজাত পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। ঢাকা, গাজীপুর ও যশোরে এসব পণ্য বিক্রি হচ্ছে। বিশেষ করে উত্তরার কয়েকটি সুপারশপ এবং গাজীপুরের বিভিন্ন বিক্রয়কেন্দ্রে ফ্রেশ কাট কাঁঠাল, চিপস ও আচার পাওয়া যাচ্ছে। ধীরে ধীরে রাজধানীর আরও বড় সুপারশপেও এসব পণ্য যুক্ত হচ্ছে।
হাজেরা অ্যাগ্রোর যাত্রা শুরু হয় ১৯৮৮ সালে নেদারল্যান্ডস থেকে আলু আমদানির মাধ্যমে। প্রতিষ্ঠানটি ২০১৬ সালে কাঁঠাল রপ্তানি শুরু করে। পরে ২০২২ সালে কাঁঠাল প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং ২০২৩ সালে প্রক্রিয়াজাত পণ্য রপ্তানির কার্যক্রম চালু করে। সবচেয়ে বেশি রপ্তানি হয়েছে ২০২৩ সালে। পরবর্তী দুই বছরে রপ্তানি কিছুটা কমে গেলেও ২০২৬ সালে ২৫০ কোটি টাকার কাঁঠাল রপ্তানির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এ বছর প্রক্রিয়াজাত পণ্য রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ ডলার।
বর্তমানে বছরে প্রায় ৫ থেকে ৬ টন প্রক্রিয়াজাত পণ্য এবং ২০ থেকে ৫০ টন কাঁঠাল রপ্তানি করছেন কাঞ্চন মিয়া। কাঁঠাল রপ্তানি থেকে তার আয় ৮০ হাজার থেকে দেড় লাখ ডলার এবং প্রক্রিয়াজাত পণ্য থেকে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ ডলারের মধ্যে।
মাওনার শোলহাটে গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে প্রায় ১৫ জন কাজ করেন। এর মধ্যে ১২ জনই নারী। শুরুতে মাত্র ২ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে এ কার্যক্রম শুরু করেছিলেন কাঞ্চন মিয়া। তিনি কৃষকদের কাছ থেকে মৌসুমভেদে প্রতি কেজি কাঁঠাল ১৫ থেকে ২০ টাকায় কিনলেও মৌসুমের শেষ দিকে কখনো কখনো ১৫০ টাকা পর্যন্ত দাম দিতে হয়।
তার মতে, দেশে এখনো কাঁঠাল প্রক্রিয়াজাতকরণ মূলত গ্রামীণ ও প্রচলিত পদ্ধতিতে হচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার খুবই সীমিত। গ্রামের নারীরা দা-বঁটি দিয়ে কাঁঠাল কেটে পরিষ্কার করেন। এরপর বিভিন্ন ধাপ অনুসরণ করে মূল্য সংযোজনের মাধ্যমে তৈরি করা হয় চিপস, আচারসহ অন্যান্য পণ্য।
তিনি মনে করেন, আধুনিক যন্ত্রপাতি, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবহন এবং উন্নত সরবরাহ ব্যবস্থা থাকলে উৎপাদন ও রপ্তানি কয়েক গুণ বাড়ানো সম্ভব হতো। বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বড় সুপারশপগুলোতে সহজে পণ্য সরবরাহ করা গেলে এ শিল্প দ্রুত সম্প্রসারিত হতে পারে।
ভারতের কেরালাকে অনুসরণ করে কাঁঠাল প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তুলতে চান কাঞ্চন মিয়া। তিনি জানান, কেরালার প্রযুক্তি ও উৎপাদন ব্যবস্থা দেখে অনলাইনের মাধ্যমে নিজ প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেন। তার দাবি, পর্যাপ্ত সহায়তা ও উন্নত বিমান পণ্য পরিবহন সুবিধা থাকলে তিনি একাই ৫০০ কোটি টাকার কাঁঠাল রপ্তানি করতে সক্ষম হতেন।
তিনি আরও বলেন, দেশে এখন বাণিজ্যিকভাবে কাঁঠাল চাষ বাড়ছে। গাজীপুরে অনেক কৃষক আঠাবিহীন কাঁঠালের বাগান গড়ে তুলেছেন। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের পোস্ট-হারভেস্ট প্রযুক্তি বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. গোলাম ফেরদৌস চৌধুরীর কাছ থেকেই তারা কাঁঠাল প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।
ফল বিশেষজ্ঞ এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্পের সাবেক প্রকল্প পরিচালক ড. মেহেদী মাসুদ বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তৈরি করতে হলে কাঁঠালের জন্য ফ্রিজ ড্রাইং প্রযুক্তি অত্যন্ত প্রয়োজন। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ফলের পুষ্টিগুণ, রং ও মান অক্ষুণ্ন রেখে পানি অপসারণ করা যায়। ফলে উচ্চমূল্যের চিপস ও অন্যান্য মূল্য সংযোজিত পণ্য উৎপাদন সম্ভব হয়।
কৃষি বিশেষজ্ঞ ড. সুরজিৎ সরকার বলেন, কাঁচা কাঁঠালের প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ বর্জ্য অংশ থেকে পেকটিন বা সাইলেজ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় দ্বিতীয় ধাপের প্রক্রিয়াজাত শিল্প না থাকায় এ খাতের উৎপাদন ব্যয় এখনো বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি।
ড. মো. গোলাম ফেরদৌস চৌধুরীর মতে, কাঁঠালের চিপস, শুকনো পণ্য কিংবা কাঁঠালসত্ত্ব উৎপাদনের জন্য আধুনিক ড্রায়ার, বিশেষ যন্ত্রপাতি এবং উন্নত প্যাকেজিং ব্যবস্থা প্রয়োজন। কিন্তু দেশে এসব অবকাঠামো এখনো পর্যাপ্ত নয়। পাশাপাশি কাঁঠালের আঠা দূর করার প্রযুক্তি শিল্প পর্যায়ে সীমিত থাকাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এসব সমস্যা সমাধান করা গেলে কাঁঠালভিত্তিক শিল্পের ব্যাপক সম্প্রসারণ সম্ভব হবে।
দেশে কাঁঠালের উৎপাদনও ধারাবাহিকভাবে উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৬২ হাজার ২৭৩ হেক্টর জমিতে ১৮ লাখ ৯৩ হাজার ৩০৩ টন কাঁঠাল উৎপাদিত হয়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫৮ হাজার ৬৭০ হেক্টরে ১৮ লাখ ২৪ হাজার টন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৫৮ হাজার ৭০০ হেক্টরে ১৮ লাখ ৩০ হাজার ১৩১ টন এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৫৮ হাজার ৯১৩ হেক্টরে ১৮ লাখ ৩৫ হাজার ৭৪ টন কাঁঠাল উৎপাদন হয়েছে। সবচেয়ে বেশি উৎপাদন হয় গাজীপুর, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায়।
তবে উৎপাদন বাড়লেও রপ্তানির পরিমাণ কমেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২ হাজার ২৩১ টন কাঁঠাল রপ্তানি হলেও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে ২ হাজার ২৪ টনে দাঁড়ায়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আরও কমে রপ্তানি হয় ১ হাজার ৮৩ টন। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ২১ জুন পর্যন্ত রপ্তানি হয়েছে ১ হাজার ২০৩ টন। একই সময়ে বিশ্বের ৩৭টি দেশে বাংলাদেশ থেকে মোট ২৪ হাজার ৩৫১ টন বিভিন্ন ধরনের ফল রপ্তানি হয়েছে।
বছরে প্রায় ১৯ লাখ টন কাঁঠাল উৎপাদন করে বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকলেও বাংলাদেশ এখনো এই ফলকে বড় শিল্পপণ্যে রূপ দিতে পারেনি। সংশ্লিষ্টদের মতে, আঠামুক্ত জাতের সম্প্রসারণ, আধুনিক প্রক্রিয়াজাত প্রযুক্তি, কোল্ড-চেইন অবকাঠামো, উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা এবং পরিকল্পিত বাণিজ্যিক বাগান গড়ে তোলা গেলে কাঁঠাল দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাতে পরিণত হতে পারে।

