নতুন অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) জমা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব থেকে সরে আসতে পারে সরকার। একই সঙ্গে শেয়ারবাজার, তৈরি পোশাক শিল্প, কাঁচামাল আমদানি শুল্ক এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের কর সুবিধাসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিবর্তনের আলোচনা চলছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বৈঠকে এসব বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বিদেশ সফর শেষে প্রধানমন্ত্রীর দেশে ফেরার পর এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
চলতি বছরের ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করা হয়। সেখানে করজাল সম্প্রসারণ এবং আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতা বাড়াতে ব্যাংক হিসাব খোলার সময় টিআইএন সনদ জমা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব রাখা হয়। সরকারের যুক্তি ছিল, ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকা ব্যক্তিদের কর কাঠামোর আওতায় আনা গেলে রাজস্ব আহরণ বাড়বে। পাশাপাশি কর ফাঁকি রোধ এবং অস্বাভাবিক লেনদেন নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে।
তবে বাজেট ঘোষণার পর থেকেই এ প্রস্তাব নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের বড় একটি অংশ এখনো আনুষ্ঠানিক কর ব্যবস্থার বাইরে। তাদের অনেকের আয় করযোগ্য নয়, কিন্তু প্রয়োজনের কারণে ব্যাংক হিসাব খুলতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে টিআইএন বাধ্যতামূলক হলে অতিরিক্ত জটিলতা তৈরি হতে পারে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, এতে ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকার প্রবণতা বাড়তে পারে, যা আর্থিক অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্যকে বাধাগ্রস্ত করবে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বিভিন্ন পক্ষের প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করে সরকার এই বিধান শিথিল করার বিষয়টি বিবেচনা করছে। বিশেষ করে শিক্ষার্থী, সামাজিক নিরাপত্তা ভাতাভোগী এবং বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জন্য ছাড়ের বিষয়ও আলোচনায় রয়েছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ১৭ কোটি ব্যাংক হিসাব রয়েছে, যার একটি বড় অংশের কোনো টিআইএন নেই।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ক্রেডিট কার্ডধারীদের জন্য টিআইএন বাধ্যতামূলক করার পর কার্ড গ্রহণের হার কমেছিল। একইভাবে ব্যাংক হিসাবের ক্ষেত্রেও এমন বাধ্যবাধকতা আরোপ হলে লেনদেন কমে যেতে পারে। অন্যদিকে কর বিশেষজ্ঞ স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, টিআইএন বাধ্যতামূলক করার ধারণা সাধারণ মানুষের মধ্যে অযথা উদ্বেগ তৈরি করেছে। এতে ব্যাংক ব্যবস্থার প্রতি অনাগ্রহ বাড়তে পারে।
শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির লভ্যাংশ আয়ের ওপর কর আরোপ সংক্রান্ত প্রস্তাবও পরিবর্তন হতে পারে। প্রস্তাবিত বাজেটে বলা হয়েছিল, কোম্পানির লভ্যাংশ আয়ের ওপর বিদ্যমান ২০ শতাংশ কর বাতিল করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সাধারণ করহার অনুযায়ী কর আরোপ করা হবে।
অর্থাৎ কোনো প্রতিষ্ঠানের করহার সাড়ে ২৭ শতাংশ হলে সেই হারেই কর দিতে হতো। আবার করহার সাড়ে ১২ শতাংশ হলে সেটাই প্রযোজ্য হতো। তবে শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্টদের আপত্তির পর সরকার এখন আগের ২০ শতাংশ কর কাঠামোই বহাল রাখার বিষয়ে চিন্তা করছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, নতুন পদ্ধতি চালু হলে কর জটিলতা বাড়তে পারে এবং বিনিয়োগকারীদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্পে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। উদ্যোক্তাদের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে পোশাক রপ্তানি আয়ের বিপরীতে উৎসে কর ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে দশমিক ৬৫ শতাংশ নির্ধারণের বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে বলে জানা গেছে। পাশাপাশি সাব-কন্ট্রাক্ট মূল্যের ওপর আরোপিত ১ শতাংশ দ্বৈত উৎসে কর প্রত্যাহারের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
শিল্প খাতের কাঁচামাল আমদানির ওপর প্রস্তাবিত কর ও শুল্ক কাঠামো নিয়েও আলোচনা চলছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কিছু কাঁচামালে অতিরিক্ত শুল্ক উৎপাদন ব্যয় বাড়াবে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। বিশেষ করে প্লাস্টিক শিল্পের কাঁচামাল নিয়ে উদ্বেগ বেশি। বাজেটে প্লাস্টিক শিল্পের প্রধান কাঁচামাল পিভিসি ও পিইটি রেজিনের আমদানি শুল্ক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছিল।
বাংলাদেশ প্লাস্টিক পণ্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কারণে কাঁচামালের দাম ইতোমধ্যে বেড়েছে এবং সরবরাহও কমেছে। এ অবস্থায় শুল্ক বৃদ্ধি শিল্পকে আরও সংকটে ফেলতে পারে বলে উদ্যোক্তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তামাক শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতেও প্রস্তাবিত সম্পূরক শুল্ক নিয়ে পুনর্বিবেচনার আলোচনা চলছে। কিছু ক্ষেত্রে ৩৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের প্রস্তাব ছিল।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বাজেট প্রণয়নের আগে বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। ফলে এখন বড় ধরনের পরিবর্তনের সুযোগ সীমিত। তবে অর্থবিলের মাধ্যমে কিছু বিষয়ে আংশিক সংশোধনের চেষ্টা চলছে।
আগামী ২৯ জুন জাতীয় সংসদে অর্থবিল পাসের মাধ্যমে কর ও শুল্ক প্রস্তাবগুলো চূড়ান্ত হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর ৩০ জুন কণ্ঠভোটে বাজেট পাস হবে। নতুন অর্থবছর শুরু হবে ১ জুলাই থেকে।
বাজেট কর্মকর্তাদের মতে, কিছু প্রস্তাবে পরিবর্তন আসলেও বাজেটের মূল কাঠামো অপরিবর্তিত থাকবে। প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই বাজেটে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বেসরকারি খাতের প্রবৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজেটের সফলতা নির্ভর করবে এর বাস্তবায়নের ওপর।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে আরও সুস্পষ্ট ও ধারাবাহিক নীতিগত পদক্ষেপ প্রয়োজন। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংক খাত সংস্কার, স্বচ্ছ প্রণোদনা বিতরণ এবং জবাবদিহিমূলক বাস্তবায়ন ছাড়া কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।

