২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে করপোরেট করহার অপরিবর্তিত রাখার প্রস্তাব থাকলেও চূড়ান্ত বাজেটে ব্যবসা ও করব্যবস্থায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসতে পারে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে আগামী পাঁচ অর্থবছরের জন্য করপোরেট কর আড়াই শতাংশ পর্যন্ত কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারের লক্ষ্য হলো বিনিয়োগে গতি আনা, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, শিল্প উৎপাদন বাড়ানো, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং কর-জিডিপি অনুপাত উন্নত করা। এ লক্ষ্যেই করপোরেট করের ক্ষেত্রে এই সুবিধা দেওয়ার চিন্তা করা হচ্ছে।
এছাড়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সহ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের করহার কমানো, ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি, স্বর্ণ বিক্রিতে মূলধনি মুনাফার কর কমানো, ব্যাংক হিসাব খুলতে ই-টিআইএন বাধ্যতামূলক না রাখা এবং খুচরা ব্যবসায় ভ্যাট সংক্রান্ত প্রস্তাবে পরিবর্তনের মতো বেশ কয়েকটি সংশোধনী চূড়ান্ত বাজেটে যুক্ত হতে পারে। জানা গেছে, এসব পরিবর্তনসহ ৩০ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট পাস হওয়ার কথা রয়েছে।
শর্তসাপেক্ষে কমবে করপোরেট কর:
এনবিআর সূত্র জানিয়েছে, চূড়ান্ত বাজেটে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য করপোরেট কর আড়াই শতাংশ কমানোর প্রস্তাব রাখা হতে পারে। যদিও প্রস্তাবিত বাজেটে এ বিষয়ে কোনো ছাড়ের কথা ছিল না। বর্তমানে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত যেসব প্রতিষ্ঠানের পরিশোধিত মূলধনের অন্তত ১০ শতাংশ শেয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে নেই, তাদের করহার সাড়ে ২২ শতাংশ। তবে নগদবিহীন বা ব্যাংকিং লেনদেনের শর্ত পূরণ করলে ২০ শতাংশ করহার বহাল থাকবে।
অন্যদিকে যেসব তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের সাধারণ শেয়ার ১০ শতাংশের কম, তাদের ক্ষেত্রে শর্ত পূরণ সাপেক্ষে করহার ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে সাড়ে ২২ শতাংশ করা হতে পারে। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান করহার অপরিবর্তিত থাকবে।
বর্তমানে তালিকাভুক্ত কোম্পানির করহার ২২ দশমিক ৫ শতাংশ। পরিশোধিত মূলধনের ১০ শতাংশের বেশি শেয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে থাকলে করহার ২০ শতাংশ। সাধারণ কোম্পানির কর ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ।
এছাড়া তালিকাভুক্ত ব্যাংক, বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের করহার ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ এবং তালিকাবহির্ভূত প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ৪০ শতাংশ। তামাক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের কর ৪৫ শতাংশ। তালিকাভুক্ত মোবাইল অপারেটরের করহার ৪০ শতাংশ এবং তালিকাবহির্ভূত অপারেটরের ক্ষেত্রে ৪৫ শতাংশ। ট্রাস্ট, ব্যক্তিসংঘ ও ফার্মের করহার ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ, সমবায় সমিতির ২০ শতাংশ এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের করহার বর্তমানে ১০ শতাংশ।
প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যাংক হিসাব খোলার সময় কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। যদিও শিক্ষার্থীসহ কয়েকটি বিশেষ শ্রেণির জন্য ছাড় রাখা হয়। তবে চূড়ান্ত বাজেটে সরকার এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে পারে। ফলে ব্যাংক হিসাব খুলতে ই-টিআইএন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক নাও থাকতে পারে।
প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের স্বর্ণ বিক্রির মূলধনি মুনাফার ওপর ১৫ শতাংশ কর আরোপের প্রস্তাব ছিল। তবে চূড়ান্ত বাজেটে তা কমিয়ে ৫ শতাংশ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে করদাতার আয়কর নথিতে উল্লেখ থাকা স্বর্ণ বা স্বর্ণালংকার বিক্রি করে যে মুনাফা হবে, তার ওপর ৫ শতাংশ হারে কর দিতে হবে।
এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কর ফাইলে অঘোষিত সম্পদ বৈধ করার উদ্দেশ্যে অতিরিক্ত স্বর্ণ দেখানোর প্রবণতা ঠেকাতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অনেক করদাতা বাস্তবে না থাকা স্বর্ণও সম্পদ হিসেবে দেখান। পরে সেই সম্পদ বিক্রির আয় দেখিয়ে অর্থ বৈধ করার চেষ্টা করেন। তিনি আরও বলেন, একজন করদাতার আয়কর নথি খোলার সময় স্বর্ণের যে মূল্য ছিল এবং বিক্রির সময় যে মূল্য হবে, এই দুইয়ের পার্থক্য থেকে যে মুনাফা হবে, তার ওপর ৫ শতাংশ কর প্রযোজ্য হবে।
প্রস্তাবিত অর্থবিলে করদাতার রিটার্নে ঘোষিত স্বর্ণ, রুপা, গহনা, মূল্যবান পাথর, হীরা, মুদ্রা, ডিজিটাল মুদ্রা, শিল্পকর্ম, পুরাকীর্তি ও ক্লাবের সদস্যপদ বিক্রি বা হস্তান্তরের মুনাফার ওপর ১৫ শতাংশ কর আরোপের প্রস্তাব ছিল।
আগামী অর্থবছরে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, ডেন্টাল কলেজ, প্রকৌশল কলেজ এবং তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের করহার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের মতে, এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা পরিবেশ ও মানোন্নয়নে সহায়তা করতেই করহার কমানো হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আপাতত কোনো শর্ত রাখা হচ্ছে না। তবে ভবিষ্যতে এই করসুবিধা বহাল রাখতে শর্ত আরোপ করা হতে পারে।
বর্তমানে দেশে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের অনুমোদিত বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে ১১৬টি। এর মধ্যে চালু রয়েছে ১০৩টি। পাশাপাশি ৬৬টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ, ২৬টি ডেন্টাল কলেজ এবং ২০টি বেসরকারি প্রকৌশল কলেজ রয়েছে।
বর্তমানে ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। চূড়ান্ত বাজেটে এটি বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করা হতে পারে। অর্থাৎ করমুক্ত আয়ের সীমা ২৫ হাজার টাকা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরের জন্য করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা রাখার প্রস্তাব ছিল। এরপর ২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ অর্থবছরে ৪ লাখ এবং ২০৩০-৩১ অর্থবছরে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা করার পরিকল্পনা দেওয়া হয়েছিল।
তবে এনবিআর সূত্র বলছে, সংশোধিত প্রস্তাবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ, ২০২৭-২৮ ও ২০২৮-২৯ অর্থবছরে সাড়ে ৪ লাখ এবং ২০৩০-৩১ অর্থবছরে ৫ লাখ টাকা করার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। তবে একই সঙ্গে কর রেয়াতের সীমা কমানো এবং সঞ্চয়পত্র, সরকারি সিকিউরিটিজ ও স্থায়ী আমানতের সুদ থেকে কেটে রাখা উৎসে করকে চূড়ান্ত করের পরিবর্তে অগ্রিম কর হিসেবে গণ্য করার কারণে করদাতাদের মোট করের চাপ খুব বেশি কমবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শেয়ারবাজারের স্বার্থ বিবেচনায় লভ্যাংশ আয়ের ওপর ২০ শতাংশ করহার বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থবিল সংশোধনের মাধ্যমে এই করহার বিলুপ্ত করে লভ্যাংশ আয়ের ওপর নিয়মিত করপোরেট করহার প্রযোজ্য করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তবে চূড়ান্ত বাজেটে সেই অবস্থান থেকে সরে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

