দেশে গত ১৫ বছরে নতুন উদ্যোক্তা তৈরির হার ছিল খুবই কম বলে মন্তব্য করেছেন শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের গ্যাসসংকটের কারণে অনেক শিল্পকারখানা পূর্ণ উৎপাদন সক্ষমতা কাজে লাগাতে পারেনি। এর নেতিবাচক প্রভাব দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে পড়েছে এবং আয়বৈষম্যও বেড়েছে। তবে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে এবং অর্থনীতির স্থবিরতা কাটাতে সরকার গ্যাসসংকট নিরসনে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে।
গতকাল রোববার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মিলনায়তনে আন্তর্জাতিক ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে এসএমই ফাউন্ডেশন। এতে সভাপতিত্ব করেন শিল্প সচিব আব্দুন নাসের খান।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উইমেন এন্টারপ্রেনিউর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি নাসরিন ফাতেমা আউয়াল এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার বাংলাদেশ কার্যালয়ের প্রধান ম্যাক্স টুনন। অনুষ্ঠানে এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার হোসেন চৌধুরীসহ দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা, বিভিন্ন চেম্বার ও ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধি এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে দুটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এসএমই ফাউন্ডেশনের নাজিম আহমেদ সাত্তার এবং বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্টের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফেরদৌস আরা বেগম।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে দেশের অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প খাতের অবদান প্রায় ৩৪ শতাংশ। অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত এই খাত যত বেশি শক্তিশালী হবে, তত দ্রুত জাতীয় উৎপাদন প্রবৃদ্ধি বাড়বে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের বিদ্যমান শিল্পনগরীগুলোর পাশাপাশি নতুন আধুনিক শিল্প পার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
নতুন উদ্যোক্তা তৈরির বিষয়ে তিনি জানান, সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। উদ্যোক্তাদের জন্য মেন্টরশিপ কর্মসূচি চালু করা হচ্ছে। বিসিকের উদ্যোগে পাবনা, সিলেট ও সৈয়দপুরে নতুন শিল্প পার্ক স্থাপনের কাজ শুরু হবে। পাশাপাশি যেসব শিল্প পার্কে আর প্লট নেই, সেখানে সম্ভাব্যতা যাচাই করে নতুন শিল্প পার্ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
নাসরিন ফাতেমা আউয়াল বলেন, বর্তমান সময়ে উদ্যোক্তাদের প্রযুক্তিনির্ভর হতে হবে। দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যবসায়িক কার্যক্রমে এসএমই খাতের অবদান রয়েছে এবং এই খাত থেকেই প্রায় ৭০ শতাংশ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। দেশের মোট শিল্প প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৯৮ শতাংশই ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প।
তিনি আরও জানান, অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪ অনুযায়ী দেশে প্রায় ১ কোটি ১৮ লাখ উদ্যোক্তা রয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ১ কোটি ১০ লাখই এসএমই উদ্যোক্তা। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৫০ শতাংশ সৃষ্টি করছেন এবং এসএমই খাতের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৭ শতাংশ তাদের মাধ্যমে তৈরি হচ্ছে। অর্থনীতিতে এই খাতের গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
শিল্প সচিব আব্দুন নাসের খান বলেন, দেশের ফ্যাশন ও হস্তশিল্প খাতে বিপুলসংখ্যক নারী উদ্যোক্তা ও নারী কর্মী কাজ করছেন। তারা শুধু পণ্য উৎপাদন করছেন না, বরং বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরছেন। বর্তমানে সৃজনশীল অর্থনীতি বিশ্বজুড়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাত হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে এবং এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সম্ভাবনাও অনেক।
তিনি বলেন, জামদানি, টাঙ্গাইলের শাড়ি, রাজশাহীর সিল্ক, নকশি পাখা, শীতলপাটি, বাঁশ ও বেতের তৈরি পণ্যসহ বিভিন্ন দেশীয় শিল্পপণ্য বাংলাদেশের পরিচয় বহন করে। সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী ‘এক গ্রাম এক পণ্য’ কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশীয় শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা, নারী উদ্যোক্তা এবং দেশীয় ব্র্যান্ডকে আন্তর্জাতিক বাজারে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বলেন, প্রতিষ্ঠার পর থেকে সংস্থাটি প্রায় ২২ লাখ উদ্যোক্তাকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিভিন্ন ধরনের সেবা দিয়েছে। এর মধ্যে আড়াই লাখের বেশি উদ্যোক্তা সরাসরি সুবিধা পেয়েছেন এবং তাদের প্রায় ৬০ শতাংশই নারী।
তিনি জানান, ২০০৯ সাল থেকে ঋণ পাইকারি বিতরণ কর্মসূচির আওতায় প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা প্রায় ১৫ হাজার উদ্যোক্তার মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। এদের অন্তত ২৫ শতাংশ নারী উদ্যোক্তা। নতুন উদ্যোক্তা তৈরি, দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসা পরিচালনা, পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ, নীতিগত সহায়তা এবং সরকারের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে সমন্বয় করে কাজ করছে এসএমই ফাউন্ডেশন। তবে আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার কারণে সারা দেশে কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করা সম্ভব হচ্ছে না। এজন্য সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, জামানতবিহীন ঋণের নীতিমালা থাকলেও ব্যাংকের জটিল প্রক্রিয়ার কারণে অধিকাংশ নারী উদ্যোক্তা প্রয়োজনীয় অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণের বরাদ্দ থাকলেও প্রশাসনিক ও কাগজপত্রের জটিলতায় সেই সুবিধা অনেকের কাছে পৌঁছায় না।
তারা নতুন উদ্যোক্তা তৈরির স্বার্থে সহজ শর্তে ও স্বল্প সুদে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ নিশ্চিত করার দাবি জানান। একই সঙ্গে উদ্যোক্তাদের দক্ষতা উন্নয়ন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং ই-কমার্সের মাধ্যমে দেশীয় পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। বক্তারা আরও বলেন, এসএমই খাতের রপ্তানি বাড়াতে সরকার শুল্কসুবিধা এবং নতুন বাজার অনুসন্ধানে কাজ করছে। প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই খাতও ভবিষ্যতে তৈরি পোশাক শিল্পের মতো বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম বড় খাতে পরিণত হতে পারে বলে তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

