গত ডিসেম্বরে দেশে ফিরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’। সেই বক্তব্য অনেক নাগরিকের মধ্যেই নতুন আশার সঞ্চার করেছিল। লেখক নিজেও মনে করেছিলেন, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকট কাটিয়ে দেশকে নতুন পথে এগিয়ে নেওয়ার জন্য একটি সুপরিকল্পিত রূপরেখা প্রস্তুত রয়েছে।
তার প্রত্যাশা ছিল, শেখ হাসিনার শাসনামলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়নের যে বিস্তার ঘটেছে, আইন, বিধি ও সংবিধান লঙ্ঘনের যে নজির তৈরি হয়েছে, মানবাধিকার লঙ্ঘন, নির্যাতন-নিপীড়ন এবং সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার যে বাস্তবতা সৃষ্টি হয়েছিল, সেসব থেকে উত্তরণের একটি স্পষ্ট পরিকল্পনা নতুন সরকারের নীতিতে প্রতিফলিত হবে।
বিশেষ করে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারের প্রথম বাজেটে সেই পরিকল্পনার বাস্তব রূপ দেখা যাবে বলেই আশা করা হয়েছিল। তবে লেখকের মূল্যায়ন অনুযায়ী, বাস্তবে উপস্থাপিত বাজেট অতীতের প্রচলিত ধারার বাইরে যেতে পারেনি। বরং এটি আগের মতোই একটি ছকবাঁধা বাজেট বলেই মনে হয়েছে। লেখকের মতে, বাংলাদেশে গত কয়েক দশক ধরে সরকার পরিবর্তন হলেও বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে কয়েকটি প্রবণতা প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে।
প্রথমত, দেশের প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় না নিয়েই প্রায় প্রতি বছর বাজেটের আকার বাড়ানো হয়েছে। দ্বিতীয়ত, বাজেট বাস্তবায়নের অর্থ জোগাড় করতে করনির্ভর রাজস্ব আহরণের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তৃতীয়ত, বাজেটের মূল কাঠামো ও অগ্রাধিকার প্রায় একই রেখে কেবল বিভিন্ন ব্যয় খাতে বরাদ্দে সামান্য পরিবর্তন আনা হয়েছে। তবে ২০১৪ সালের একপক্ষীয় নির্বাচনের পর একটি ব্যতিক্রম দেখা যায়। সে সময় শেখ হাসিনার সরকার দৃশ্যমান অবকাঠামো নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয় করে। লেখকের মতে, উন্নয়নের তুলনায় সেই ব্যয় পরে লুটপাটের মাধ্যম হিসেবেই বেশি কার্যকর হয়েছে বলে প্রমাণিত হয়েছে।
চতুর্থত, অর্থনৈতিক সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিবর্তে বিভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীকে সন্তুষ্ট রাখার প্রবণতা বজায় রাখা হয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি খাতের ভর্তুকির সুবিধাভোগী সংগঠিত গোষ্ঠীগুলোর স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি এ প্রবণতার অন্যতম উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটেও পুরোনো ধারা বহাল:
লেখকের মতে, সম্প্রতি সংসদে উপস্থাপিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটেও আগের বাজেটগুলোর মতো একই প্রবণতা স্পষ্টভাবে দেখা গেছে।
প্রথমত, গত কয়েক বছরে ধারাবাহিকভাবে বাজেটের আকার বেড়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাজেটের পরিমাণ ছিল প্রায় ৫ লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকা। পরের অর্থবছরে তা বেড়ে হয় ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা। এরপর ২০২১-২২, ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাজেটের আকার দাঁড়ায় যথাক্রমে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি, ৬ লাখ ৭৮ হাজার কোটি এবং ৭ লাখ ৬২ হাজার কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাজেট ছিল ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা।
চলতি অর্থবছরে সংশোধিত বাজেটের আকার নেমে আসে ৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকায়। আর নতুন বাজেটে সেই পরিমাণ এক লাফে বেড়ে হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। বিদায়ী সংশোধিত বাজেটের তুলনায় এটি ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি, যা সাম্প্রতিক সময়ে এক অর্থবছরে বাজেট বৃদ্ধির সর্বোচ্চ হার বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, লেখকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, গত প্রায় এক দশক ধরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) নির্ধারিত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য পূরণ করতে পারেনি। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসেই রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৮১ হাজার ৪৪২ কোটি টাকায়। বছরের শেষে এ ঘাটতি প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে ২০২৬ সালের ২২ জুন প্রকাশিত বণিক বার্তা–এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে কর-জিডিপি অনুপাত কমে প্রায় ৬ দশমিক ৮ শতাংশে নেমে এসেছে, যা বিশ্বের সর্বনিম্ন হারগুলোর একটি। এমন পরিস্থিতিতেও আগামী অর্থবছরের জন্য এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। এটি সংশোধিত লক্ষ্যের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ বেশি। লেখকের মতে, এতে এক বছরেই প্রায় ৪০ শতাংশ রাজস্ব প্রবৃদ্ধির হিসাব ধরা হয়েছে, যা এনবিআরের বর্তমান সক্ষমতার আলোকে পুরোপুরি অবাস্তব।
তৃতীয়ত, লেখকের ভাষ্য অনুযায়ী, বাজেটের মৌলিক কাঠামো অপরিবর্তিত রেখে দৃশ্যমান অবকাঠামো প্রকল্পে পুনরায় অর্থায়নের ধারা অব্যাহত রয়েছে, যার মাধ্যমে প্রভাবশালী মহলকে সুবিধা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। যদিও বহু প্রকল্পের আর্থিক দায়বদ্ধতা অনেক আগেই নির্ধারিত হওয়ায় সেগুলোতে পরিবর্তন আনা সহজ নয়।
উদাহরণ হিসেবে লেখক রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের কথা উল্লেখ করেছেন। শুরুতে যার ব্যয় ছিল প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা। পরে বিনিময় হার সমন্বয়ের ফলে সেই ব্যয় বেড়ে আনুমানিক ১ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা বা প্রায় ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। বর্তমানে এ প্রকল্পে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার আত্মসাতের অভিযোগ তদন্তাধীন রয়েছে।
লেখকের মূল্যায়নে, এ ধরনের প্রকল্পে অর্থায়ন বিচ্ছিন্ন কোনো ব্যর্থতার উদাহরণ নয়। বরং ২০১০ সালের পর থেকে ‘উন্নয়ন’ ধারণাকে কার্যকর অবকাঠামো নির্মাণের পরিবর্তে লুটপাটের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের একটি ধারাবাহিক প্রবণতা গড়ে উঠেছে। তার মতে, প্রস্তাবিত বাজেটে এসব দুর্নীতি ও অপচয় বন্ধে কঠোর উদ্যোগের পরিবর্তে অতীতের সেই ধারাই বহাল রাখা হয়েছে।
চতুর্থত, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে মোট ভর্তুকির পরিমাণ কিছুটা কমানো হয়েছে। ২০২৫ অর্থবছরে প্রকৃত ভর্তুকি ছিল ১ লাখ ৮ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা, যা নতুন বাজেটে কমিয়ে প্রায় ৮৯ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে লেখকের মতে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে এখনও প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি বহাল রয়েছে।
লেখকের ভাষ্য অনুযায়ী, এই খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো উৎপাদন না হওয়া বিদ্যুতের জন্যও বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে কেন্দ্র ভাড়া বা ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করা। ২০০৯ সাল থেকে এ বাবদ বাংলাদেশ ৯ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ পরিশোধ করেছে। শুধু ২০২৩-২৪ অর্থবছরেই এই খাতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা, যা ওই বছরের বিদ্যুৎ খাতের মোট ভর্তুকির ৮১ শতাংশ। লেখকের দাবি, রাজনৈতিকভাবে সুবিধাপ্রাপ্ত কিছু বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রতিষ্ঠানের জন্য এসব অর্থ কার্যত নিশ্চিত এবং প্রতিযোগিতাবিহীনভাবে পরিশোধ করা হয়েছে।
তার মতে, সরকারের উচিত ছিল প্রচলিত ধারা থেকে বেরিয়ে এসে এসব চুক্তি পুনর্গঠন বা নতুন করে দর-কষাকষির উদ্যোগ নেওয়া। কিন্তু তা না হওয়ায় নতুন বাজেটেও আগের ব্যবস্থাই বহাল রয়েছে।
লেখকের মতে, শুধু এসব পুরোনো প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসাই নয়, নতুন সরকারের বাজেটে আরও কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন ছিল। এর মধ্যে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি অন্যতম। একই সঙ্গে দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়নের বিস্তার রোধ করে ‘ফুটো কলস’-এর মতো অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার অবসান এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় ন্যায়পরায়ণতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া দরকার ছিল।
তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমানে দেশের বিনিয়োগ-জিডিপি অনুপাত সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। প্রাকৃতিক সম্পদে সীমিত হলেও সিঙ্গাপুরের মতো একটি সিটি-স্টেট আইনের শাসন এবং মেধাভিত্তিক নিয়োগব্যবস্থার মাধ্যমে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করে উন্নয়নের উচ্চতায় পৌঁছানোর উদাহরণ তৈরি করেছে।
একই সঙ্গে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’-এর সুযোগ কাজে লাগিয়ে তরুণদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণের ওপর জোর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোকে দুর্নীতিমুক্ত ও আরও দক্ষ করে গড়ে তোলা এবং সংকটে থাকা ব্যাংকিং খাতকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেছেন লেখক।
তার মূল্যায়নে, নতুন গন্তব্যে পৌঁছাতে হলে পুরোনো পথ থেকে সরে আসা জরুরি। কিন্তু এখন পর্যন্ত সরকারের কর্মকাণ্ডে সেই উপলব্ধির সুস্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়নি।
তবে লেখক আশাবাদী অবস্থানও তুলে ধরেছেন। তার প্রত্যাশা, অতীতের অনিয়ম, অপকর্ম ও দুর্নীতির অবসানে প্রধানমন্ত্রী দ্রুত তাঁর পরিকল্পনা প্রকাশ করবেন এবং তা বাস্তবায়নে বিচক্ষণ ও সাহসী পদক্ষেপ নেবেন। একই সঙ্গে অর্থনীতি ও বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনার পাশাপাশি গণতান্ত্রিক ঘাটতি দূর করা, সুশাসনের সংকট মোকাবিলা, জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংস্কার এগিয়ে নেওয়া এবং ভেঙে পড়া সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্গঠনের বিষয়েও সরকার অগ্রাধিকার দেবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন।
- ড. বদিউল আলম মজুমদার: সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)

