কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দৌড় এখন শুধু সফটওয়্যার বা চিপের বাজারে সীমাবদ্ধ নেই; এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ডেটা সেন্টার, বিদ্যুৎ ও ডিজিটাল অবকাঠামোর চাহিদা। এই সুযোগ ও প্রয়োজনকে সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রে আগামী ২০২৭ সালের জুলাইয়ের মধ্যে ২৫০ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন করার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে ব্যাংক অব আমেরিকা। তবে এটিকে সরাসরি ২৫০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ না বলে অর্থায়ন উদ্যোগ বলা বেশি যথাযথ। কারণ এর আওতায় ঋণ, বিনিয়োগ, মূলধন বাজারসেবা, ব্যাংকিং ও আর্থিক পরামর্শ, বিভিন্ন ধরনের সেবা থাকবে।
‘ক্রিটিক্যাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফাইন্যান্স ইনিশিয়েটিভ নামে এই কর্মসূচির আওতায় ব্যাংকটি মূলত তিন ধরনের অবকাঠামোকে গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রথমটি ডিজিটাল অবকাঠামো, যার মধ্যে এআই ডেটা সেন্টার ও কম্পিউটিং সক্ষমতা রয়েছে। দ্বিতীয়টি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামো, যেখানে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন ও জ্বালানি সংরক্ষণ প্রকল্পও থাকবে। তৃতীয়টি পরিবহন ও প্রাকৃতিক গ্যাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। ব্যাংক অব আমেরিকার মতে, এসব খাতে বড় আকারের অর্থায়ন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থান তৈরিতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
এই উদ্যোগের পেছনে সবচেয়ে বড় চালিকা শক্তি হচ্ছে এআই। এআই মডেল চালাতে বিপুল পরিমাণ কম্পিউটিং ক্ষমতা প্রয়োজন, আর সেই কম্পিউটিং ক্ষমতা দিতে তৈরি করতে হয় বড় বড় ডেটা সেন্টার। শুধু সার্ভার বসালেই কাজ শেষ হয় না; এসব স্থাপনার জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, শীতলীকরণ ব্যবস্থা, পানি, যোগাযোগ নেটওয়ার্ক এবং দ্রুতগতির ডিজিটাল সংযোগ প্রয়োজন। ফলে এআইয়ের বিস্তার যত বাড়ছে, ততই প্রযুক্তি খাতের বাইরে বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো খাতেও নতুন বিনিয়োগের প্রয়োজন তৈরি হচ্ছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে ডেটা সেন্টার নির্মাণ ঘিরে বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবহার নিয়েও স্থানীয় পর্যায়ে উদ্বেগ বাড়ছে, যা দেখাচ্ছে এআই অবকাঠামো এখন একটি বড় অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।
ব্যাংক অব আমেরিকার এই অর্থায়নের লক্ষ্য ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৭ সালের ৪ জুলাই পর্যন্ত প্রায় ১৮ মাসের সময়কে ধরে নির্ধারণ করা হয়েছে। ব্যাংকটির অবকাঠামো ও টেকসই অর্থায়ন বিভাগের বৈশ্বিক প্রধান কারেন ফ্যাং জানিয়েছেন, বড় অবকাঠামো প্রকল্প সাধারণত নির্মাণ পর্যায়ে ঋণের মাধ্যমে অর্থায়ন করা হয়। প্রকল্প চালু হওয়ার পর দীর্ঘমেয়াদি ঋণের মাধ্যমে সেই অর্থ পুনঃঅর্থায়ন করা হতে পারে। অর্থাৎ ২৫০ বিলিয়ন ডলারের পুরো অর্থ একবারে কোনো একটি খাতে ঢেলে দেওয়া হবে না; বিভিন্ন প্রকল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী ঋণ ও অন্যান্য আর্থিক সেবার মাধ্যমে এই অর্থায়ন করা হবে।
ব্যাংক অব আমেরিকার সিদ্ধান্তটি যুক্তরাষ্ট্রের বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এআই ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ঘিরে বাড়তে থাকা প্রতিযোগিতারও ইঙ্গিত দিচ্ছে। জেপিমরগ্যান চেজ ২০২৫ সালে ১০ বছরের জন্য ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের ‘সিকিউরিটি অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স ইনিশিয়েটিভ’ ঘোষণা করেছিল। এর আওতায় এআই, সাইবার নিরাপত্তা, জ্বালানি, উন্নত উৎপাদন, প্রতিরক্ষা ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজসহ কৌশলগত খাতে অর্থায়ন ও বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।
অন্যদিকে, এআই অবকাঠামোয় অর্থের চাহিদা যে কত দ্রুত বাড়ছে, তার আরেকটি উদাহরণ পাওয়া যাচ্ছে প্রযুক্তি ও আর্থিক খাতের সাম্প্রতিক উদ্যোগে। এনভিডিয়া চলতি সপ্তাহে ছয়টি বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদার হয়ে এআই অবকাঠামোর জন্য ৫০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি তৃতীয় পক্ষের মূলধন সংগ্রহের প্ল্যাটফর্ম তৈরির পরিকল্পনা জানিয়েছে। এতে বোঝা যায়, এআইয়ের পরবর্তী পর্যায়ের প্রতিযোগিতা শুধু উন্নত চিপ বা সফটওয়্যার তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; কে দ্রুত ডেটা সেন্টার, বিদ্যুৎ ও কম্পিউটিং অবকাঠামো তৈরি করতে পারছে, সেটিও বড় প্রতিযোগিতার বিষয় হয়ে উঠছে।
তবে এত বড় অর্থায়নের সঙ্গে ঝুঁকিও রয়েছে। ডেটা সেন্টার নির্মাণের খরচ যেমন বিশাল, তেমনি এসব প্রকল্প চালাতে দীর্ঘমেয়াদে বিপুল বিদ্যুৎ প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন এলাকায় ডেটা সেন্টার নির্মাণ নিয়ে স্থানীয় জনগণের আপত্তি, বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবহার এবং অনুমোদন পাওয়ার জটিলতা ইতোমধ্যে অর্থায়নকারীদের ঝুঁকি মূল্যায়নের অংশ হয়ে উঠেছে। ফলে ব্যাংকগুলো শুধু এআইয়ের সম্ভাব্য চাহিদা দেখেই অর্থ দেবে না; প্রকল্পের অনুমোদন, বিদ্যুৎ সরবরাহ, স্থানীয় গ্রহণযোগ্যতা এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সব মিলিয়ে ব্যাংক অব আমেরিকার ২৫০ বিলিয়ন ডলারের উদ্যোগটি এআই অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনকে সামনে আনছে। এআইয়ের প্রসার যত বাড়ছে, ততই এর পেছনের ‘ভৌত অবকাঠামো’—ডেটা সেন্টার, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, পরিবহন ও যোগাযোগ, নতুন বিনিয়োগের বড় ক্ষেত্র হয়ে উঠছে। ফলে আগামী কয়েক বছরে এআই খাতে কার প্রযুক্তি সবচেয়ে উন্নত, তার পাশাপাশি কার হাতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরির জন্য পর্যাপ্ত মূলধন রয়েছে, সেটিও বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিযোগিতার ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

