দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে আবারও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দিয়েছে। এক দিনের ব্যবধানে মোট রিজার্ভ আরও বেড়ে ৩৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বুধবার (১২ আগস্ট) দেশের মোট বা স্থূল রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৭ দশমিক ০৬৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
একই সময়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের নির্ধারিত বিপিএম-৬ হিসাবপদ্ধতিতে দেশের রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ২৬০ বিলিয়ন ডলার। আন্তর্জাতিকভাবে কোনো দেশের ব্যবহারযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রার সক্ষমতা তুলনা করার ক্ষেত্রে এই হিসাবপদ্ধতিকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে শুধু মোট রিজার্ভের পরিমাণ নয়, বিপিএম-৬ অনুযায়ী রিজার্ভ কতটা রয়েছে, সেটিও দেশের বৈদেশিক খাতের শক্তি বোঝার জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
সাম্প্রতিক কয়েক দিনের তথ্য বিশ্লেষণ করলে রিজার্ভ বৃদ্ধির ধারাটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গত সোমবার (১০ আগস্ট) দেশের মোট রিজার্ভ ছিল ৩৬ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ওই সময় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বিপিএম-৬ হিসাবপদ্ধতিতে রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩২ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলার। এর আগে রবিবার (৯ আগস্ট) মোট রিজার্ভ ছিল ৩৬ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলার।
অর্থাৎ সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। বিশেষ করে ৩৬ বিলিয়ন ডলারের ঘর থেকে ৩৭ বিলিয়ন ডলারের সীমা অতিক্রম করা বৈদেশিক লেনদেনের সক্ষমতা ও সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে মোট রিজার্ভ এবং বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে হিসাব করা রিজার্ভের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। মোট রিজার্ভের হিসাবের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের সম্পদ ও দায়ের উপাদান অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। অন্যদিকে বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে আন্তর্জাতিকভাবে তুলনাযোগ্য ও ব্যবহারযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রার মজুতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ কারণে অর্থনীতির প্রকৃত বৈদেশিক সক্ষমতা মূল্যায়নে বিপিএম-৬ হিসাবটি বেশি গুরুত্ব পায়।
বাংলাদেশের জন্য রিজার্ভের এই বৃদ্ধি কয়েকটি দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ সময় ধরে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে চাপ, আমদানি ব্যয়, ডলারের চাহিদা এবং আন্তর্জাতিক লেনদেনের ভারসাম্য নিয়ে উদ্বেগ ছিল। এমন পরিস্থিতিতে রিজার্ভ বাড়ার অর্থ হলো দেশের হাতে আমদানি ব্যয় ও আন্তর্জাতিক দায় পরিশোধের জন্য তুলনামূলকভাবে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা থাকছে।
বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে রিজার্ভের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। রিজার্ভ শক্তিশালী থাকলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের চাপ সামাল দেওয়া তুলনামূলক সহজ হয়। একই সঙ্গে আমদানি পরিশোধ, বৈদেশিক ঋণের দায় এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক লেনদেন পরিচালনার ক্ষেত্রেও এটি একটি নিরাপত্তাবলয় হিসেবে কাজ করে।
সাম্প্রতিক সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহও দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অবস্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রার জোগান বাড়ায়। এর পাশাপাশি রপ্তানি আয়, আমদানি ব্যয়ের গতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিও রিজার্ভের ওপর প্রভাব ফেলে। ফলে রিজার্ভের বর্তমান ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা কতটা টেকসই হবে, তা নির্ভর করবে এসব সূচকের ওপর।
এর আগে মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বিপিএম-৬ হিসাবেও দেশের রিজার্ভ ৩২ বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করেছিল। মাত্র এক দিনের ব্যবধানে মোট রিজার্ভ ৩৭ বিলিয়ন ডলারের সীমা পেরিয়ে যাওয়ায় বৈদেশিক খাতে সাম্প্রতিক পরিবর্তন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
তবে রিজার্ভের পরিমাণ বাড়াকে এককভাবে অর্থনীতির সব সমস্যার সমাধান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। রিজার্ভের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার বাজারের স্থিতিশীলতা, আমদানি ব্যয়ের চাপ, রপ্তানি আয়, রেমিট্যান্স এবং দেশের সামগ্রিক বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যও নজরে রাখতে হবে। কারণ কোনো নির্দিষ্ট সময়ে রিজার্ভ বাড়লেও যদি একই সঙ্গে আমদানি ব্যয় দ্রুত বাড়ে বা বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হয়, তাহলে ভবিষ্যতে সেই প্রবণতায় পরিবর্তন আসতে পারে।
তবু বর্তমান পরিস্থিতিতে রিজার্ভের এই বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে কিছুটা স্বস্তির বার্তা দিচ্ছে। বিশেষ করে ৩৭ দশমিক ০৬৬ বিলিয়ন ডলারের মোট রিজার্ভ এবং ৩২ দশমিক ২৬০ বিলিয়ন ডলারের বিপিএম-৬ রিজার্ভ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অবস্থানে সাম্প্রতিক উন্নতির চিত্র তুলে ধরছে।
এখন মূল বিষয় হলো, এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা কতটা ধরে রাখা যায়। রেমিট্যান্স প্রবাহ শক্তিশালী রাখা, রপ্তানি আয় বাড়ানো, অপ্রয়োজনীয় আমদানি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সম্ভব হলে রিজার্ভ আরও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ রয়েছে। আর সেটি হলে দেশের অর্থনীতিতে বৈদেশিক লেনদেনের চাপ কমানোর পাশাপাশি সামগ্রিক আস্থাও বাড়তে পারে।

