অর্থবছরের শেষ দুই মাসে রাজস্ব আদায়ে উল্লেখযোগ্য গতি ফিরলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সামগ্রিক চিত্রে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে রাজস্ব আদায় হয়েছে প্রায় ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকা। তবে আগের অর্থবছরের তুলনায় রাজস্ব আদায়ে ১২ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
রাজস্ব ঘাটতির বড় অংশ এসেছে দেশের প্রধান শুল্ক আদায় কেন্দ্র চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজ থেকে। প্রতিষ্ঠানটি লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ২০ হাজার ৮২৪ কোটি টাকা কম রাজস্ব সংগ্রহ করেছে। এনবিআরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এটি এখনো প্রাথমিক হিসাব। চূড়ান্ত হিসাব সম্পন্ন হলে মোট রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। এতে প্রবৃদ্ধির হারও কিছুটা বাড়বে এবং লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে ব্যবধান কিছুটা কমে আসবে।
এনবিআর সূত্র জানায়, গতকাল বুধবার (১ জুলাই) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতিবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের সঙ্গে এনবিআর কর্মকর্তাদের বৈঠকে সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরের রাজস্ব আদায়ের এই প্রাথমিক তথ্য উপস্থাপন করা হয়। বৈঠকে সংস্থাটির নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব, সদ্য বিদায়ী চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান এবং জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
আবদুর রহমান খান বলেন, চূড়ান্ত হিসাব সম্পন্ন হলে আদায়ের পরিমাণ আরও বাড়বে। তার ভাষ্য, অর্থবছরের শেষ মাসে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি এবং বকেয়া রাজস্ব আদায়ের কারণে মোট রাজস্ব সংগ্রহে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এতে লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে ব্যবধান আরও বড় হওয়ার যে আশঙ্কা ছিল, তা অনেকটাই কমেছে।
এনবিআরের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে রাজস্ব আদায়ের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বাস্তবায়ন উল্লেখযোগ্যভাবে কম থাকায় সেই খাত থেকেও প্রত্যাশিত রাজস্ব পাওয়া যায়নি।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত ১১ মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ৪৮ শতাংশ। গত ১৬ বছরের মধ্যে এটি সর্বনিম্ন বাস্তবায়নের হার।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, বিভিন্ন কারণে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি ছিল। ফলে নিয়মিত কাজের বাইরে বড় ধরনের অভিযান বা বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণের প্রবণতা কম ছিল। তার মতে, এমন উদ্যোগ নেওয়া গেলে রাজস্ব আদায় আরও কিছুটা বাড়ানো সম্ভব হতে পারত।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির রাজস্ব আদায়ে আগের বছরের তুলনায় ১২ দশমিক ৩৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তবুও লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হয়নি। মূলত রাষ্ট্রায়ত্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি শুল্ক বকেয়া থাকায় এই ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ১ লাখ ২ হাজার ২৯৫ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজ রাজস্ব আদায় করেছে ৮১ হাজার ৪৭১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। ফলে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ৮২৩ কোটি ৬৩ লাখ টাকা।
এদিকে নতুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সরকার আরও উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। সেই লক্ষ্য পূরণ করতে হলে সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৪৫ শতাংশ বেশি রাজস্ব আদায় করতে হবে, যা বাস্তবায়ন বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বর্তমান রাজস্ব আদায়ের ভিত্তিতে আগামী অর্থবছরে ৪০ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন হবে, যা অতীতে কখনো অর্জিত হয়নি। তাই বাস্তবে এত উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনের সম্ভাবনা খুবই কম।
তার মতে, এ পরিস্থিতিতে সরকারকে হয় রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পুনর্বিবেচনা করতে হবে, নয়তো অতিরিক্ত ব্যয় মেটাতে বিকল্প অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে হবে, যা সহজ হবে না।
তিনি আরও বলেন, ব্যয় নির্বাহে সরকার যদি স্থানীয় উৎস থেকে বেশি ঋণ নেয়, তাহলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রাপ্তি আরও কঠিন হয়ে যেতে পারে এবং এর নেতিবাচক প্রভাব অর্থনীতিতে পড়তে পারে।
মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, নতুন অর্থবছরে করের আওতায় উল্লেখযোগ্য নতুন খাত যুক্ত হয়নি। ফলে রাজস্ব বাড়াতে কর ফাঁকি ও রাজস্ব অপচয় রোধের পাশাপাশি আদায় ব্যবস্থাকে আরও ডিজিটাল ও কার্যকর করতে হবে। তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলেও বড় ধরনের রাজস্ব ঘাটতির ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হবে না।

