একসময় বাংলাদেশের প্রধান উন্নয়ন ও বিনিয়োগ অংশীদার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান কিংবা ইউরোপীয় দেশগুলোর নামই বেশি উচ্চারিত হতো। কিন্তু গত এক দশকে সেই চিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। অবকাঠামো, জ্বালানি, শিল্প এবং বেসরকারি খাতে অর্থায়নের ধারাবাহিক বৃদ্ধির মাধ্যমে চীন এখন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক অংশীদারে পরিণত হয়েছে। শুধু বিনিয়োগেই নয়, বেসরকারি খাতের সবচেয়ে বড় বৈদেশিক ঋণদাতার অবস্থানও এখন চীনের দখলে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তন কেবল অর্থনৈতিক নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি, বাণিজ্য এবং কৌশলগত সম্পর্কের নতুন বাস্তবতারও প্রতিফলন। একই সঙ্গে এটি বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা, বৈদেশিক অর্থায়ন এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক কৌশলকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে।
২০১৬ সালের পরই বদলে যায় পরিস্থিতি
২০১৬ সালের আগে বাংলাদেশের শীর্ষ বিনিয়োগকারী দেশগুলোর তালিকায় চীনের অবস্থান ছিল অনেক নিচে। সে সময় মোট প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগে চীনের অংশ ছিল মাত্র ১ দশমিক ৬ শতাংশ এবং দেশটির অবস্থান ছিল ১৬তম।
কিন্তু একই বছর চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ঢাকা সফর দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কে নতুন মোড় এনে দেয়। ওই সফরে বাংলাদেশে প্রায় ৪ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ ও অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। যদিও সেই প্রতিশ্রুত অর্থ একসঙ্গে বাস্তবায়ন হয়নি, তবে পরবর্তী কয়েক বছরে বড় বড় প্রকল্পে ধারাবাহিক অর্থায়নের মাধ্যমে চীন বাংলাদেশের অর্থনীতিতে শক্ত অবস্থান তৈরি করে।
বিনিয়োগে দ্রুত এগিয়ে চীন
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে বাংলাদেশে চীনের মোট প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল মাত্র ২৪ কোটি ১০ লাখ ডলার। কিন্তু ২০২৫ সালের শেষে সেটি বেড়ে প্রায় ২০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। অর্থাৎ প্রায় এক দশকে চীনের বিনিয়োগ ৭০০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
শুধু ২০২৫ সালেই চীন বাংলাদেশে ৩২ কোটি ১১ লাখ ৫০ হাজার ডলার নতুন নিট বিনিয়োগ করেছে, যার ফলে দেশটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগকারী হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করেছে। বর্তমানে দেশের মোট বৈদেশিক বিনিয়োগের প্রায় ১০ শতাংশ এসেছে চীন থেকে।
কমেছে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ
অন্যদিকে একসময় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বৈদেশিক বিনিয়োগকারী দেশ ছিল যুক্তরাষ্ট্র। ২০১৬ সালে দেশের মোট প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগের ২২ শতাংশ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের দখলে।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই অংশ কমতে কমতে ২০২৫ সালে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৫ দশমিক ৩৬ শতাংশে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মোট বিনিয়োগ ৩৩০ কোটি ডলার থেকে কমে ১০০ কোটি ডলারে নেমে এসেছে। ফলে বর্তমানে দেশটির অবস্থান নেমে গেছে সপ্তম স্থানে।
ভারতের প্রবৃদ্ধিও সীমিত
প্রতিবেশী ভারতও এই সময়ে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে, তবে সেই বৃদ্ধি ছিল তুলনামূলক ধীর। ২০১৬ সালে ভারতের মোট বিনিয়োগ ছিল ৩৪ কোটি ১০ লাখ ডলার, যা ২০২৫ সালের শেষে বেড়ে ৯২ কোটি ২৯ লাখ ২০ হাজার ডলারে পৌঁছেছে।
তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ভারত-সমর্থিত কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়নে জটিলতা তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবন্ধকতার কারণে কিছু প্রকল্প স্থগিত কিংবা বাতিল হওয়ায় ভারতের বিনিয়োগের গতি আগের তুলনায় মন্থর হয়েছে।
বড় প্রকল্পগুলোতে চীনের আধিপত্য
গত এক দশকে বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্পে চীনের বড় ভূমিকা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পদ্মা সেতুর রেল সংযোগ, কর্ণফুলী টানেল, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ, পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, চট্টগ্রাম উড়াল সড়ক এবং দাশেরকান্দি পয়ঃশোধনাগার প্রকল্প।
এই প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ বিদেশি অর্থায়ন এসেছে, যা দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
বেসরকারি খাতের সবচেয়ে বড় ঋণদাতা এখন চীন
শুধু বিনিয়োগ নয়, বৈদেশিক ঋণের ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশের বেসরকারি খাতের দীর্ঘমেয়াদি বৈদেশিক ঋণের ৩৪ দশমিক ২০ শতাংশ এসেছে চীন থেকে। অথচ ২০২০ সালে এই অংশ ছিল মাত্র ৭ দশমিক ৫ শতাংশ।
সংখ্যার হিসেবে, ২০২০ সালে চীনের কাছ থেকে নেওয়া দীর্ঘমেয়াদি বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ছিল ৪২ কোটি ২০ লাখ ডলার। মাত্র পাঁচ বছরে সেটি বেড়ে ৩৩৭ কোটি ডলারে পৌঁছেছে।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ কমে ৭ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে এসেছে এবং দেশটি শীর্ষ ঋণদাতার তালিকায় চতুর্থ স্থানে চলে গেছে।
কেন বাড়ছে চীনা বিনিয়োগ?
অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকারদের মতে, এর পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে।
বাংলাদেশের শিল্প খাতে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল ও প্রযুক্তির বড় অংশ এখন চীন থেকে আসছে। আগের তুলনায় চীনা যন্ত্রপাতির মান বেড়েছে, আবার দামও তুলনামূলক কম। ফলে অনেক উদ্যোক্তা ইউরোপীয় সরবরাহকারীদের পরিবর্তে চীনের দিকে ঝুঁকছেন।
এর পাশাপাশি চীনা অর্থায়ন তুলনামূলক সহজলভ্য। আন্তর্জাতিক অনেক সংস্থার মতো কঠোর নীতিগত শর্ত ছাড়াই বড় অঙ্কের অর্থায়নের সুযোগ থাকায় উদ্যোক্তারা চীনা ঋণের প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় অবকাঠামো প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নে চীনের এই নমনীয় অর্থায়ন বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ উদ্যোগের প্রভাব
বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৬ সালে বাংলাদেশের চীনের বৈশ্বিক অবকাঠামো উদ্যোগে যুক্ত হওয়ার পর থেকেই দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর হতে শুরু করে।
পরিবহন, বিদ্যুৎ, বন্দর, শিল্পাঞ্চল ও সংযোগ ব্যবস্থায় ব্যাপক বিনিয়োগের ফলে বাংলাদেশ শুধু অবকাঠামো উন্নয়নেই এগোয়নি, বরং আঞ্চলিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
বর্তমানে চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদারও।
তবে উদ্বেগও রয়েছে
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, চীনা বিনিয়োগ বাংলাদেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ হলেও অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা ভবিষ্যতে ঝুঁকির কারণ হতে পারে।
বিশেষ করে বড় অঙ্কের বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রকল্পের আর্থিক সক্ষমতা, স্বচ্ছতা এবং দীর্ঘমেয়াদি লাভজনকতা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের চাপ অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এ কারণে তারা সম্ভাব্যতা যাচাই, স্বচ্ছ ঋণচুক্তি, বহুমুখী উন্নয়ন অংশীদার এবং কার্যকর তদারকির ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
বাংলাদেশের সামনে নতুন সুযোগ, তবে ভারসাম্যই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
চীনের বিনিয়োগ বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি এসেছে। একই সঙ্গে বৈদেশিক অর্থায়নের নতুন উৎস তৈরি হওয়ায় বড় প্রকল্প বাস্তবায়নও সহজ হয়েছে।
তবে অর্থনৈতিক সম্পর্ক যত গভীর হবে, ততই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখা। কারণ বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—একদিকে চীনের বিনিয়োগের সুযোগ কাজে লাগানো, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, ভারতসহ অন্যান্য উন্নয়ন অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ভবিষ্যতে টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হলে শুধু বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ালেই হবে না; সেই বিনিয়োগ যেন দেশের উৎপাদনশীলতা, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ায়, সেদিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশের আগামী অর্থনৈতিক যাত্রাপথ অনেকটাই নির্ভর করবে এই ভারসাম্য রক্ষার সক্ষমতার ওপর।

