বাংলাদেশের চা–শিল্প নিয়ে দীর্ঘদিনের একটি প্রশ্ন ঘুরে ফিরে আসে। যদি চা–বাগান খুব বেশি লাভজনক না হয়, তাহলে কেন এত ব্যবসায়ী এই খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী? আবার চায়ের বাজার যদি এত বড় হয়, তাহলে এই পুরো মূল্যশৃঙ্খলে আসল লাভটা কার হাতে যাচ্ছে?
প্রায় দেড় শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে চা চাষ চলছে। বর্তমানে সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, পঞ্চগড় ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে ১৬৮টি বাণিজ্যিক চা–বাগান রয়েছে। এসব বাগান প্রায় আড়াই লাখ একরের বেশি জমিতে বিস্তৃত। ২০২৩ সালে দেশে রেকর্ড ১০ কোটি ২৯ লাখ কেজি চা উৎপাদিত হয়, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৭ শতাংশ বেশি। উৎপাদনের দিক থেকে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের নবম বৃহত্তম চা উৎপাদক দেশ এবং বৈশ্বিক উৎপাদনের প্রায় ৩ শতাংশ আসে বাংলাদেশ থেকে।
তবে এত বড় উৎপাদন সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের চা এখনো শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারেনি। দেশে উৎপাদিত চায়ের প্রায় পুরোটাই অভ্যন্তরীণ বাজারে ব্যবহার হয়। বছরে প্রায় ৯ থেকে সাড়ে ৯ কোটি কেজি চা দেশেই ভোগ করা হয়। মানসম্মত মিশ্রণ তৈরির প্রয়োজনে কিছু চা আবার আমদানি করতে হয়। অথচ ২০০২ সালে যেখানে ১ কোটি ৩৬ লাখ কেজির বেশি চা রপ্তানি হয়েছিল, বর্তমানে তা নেমে এসেছে মাত্র ২২ লাখ কেজিতে। উৎপাদন বাড়লেও রপ্তানিতে পিছিয়ে পড়ার এই প্রবণতার জন্য অনেকেই তুলনামূলক বেশি দামের কাঠামোকে দায়ী করেন।
বাংলাদেশের চা–শিল্প মূলত বেসরকারি উদ্যোক্তা ও সরকারি নিয়ন্ত্রণের একটি মিশ্র কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ইস্পাহানি, জেমস ফিনলে, আবুল খায়ের গ্রুপ, কাজী অ্যান্ড কাজী, ডানকান ব্রাদার্স, ট্রান্সকম, হালদা ভ্যালি ও ওরিয়নের মতো প্রতিষ্ঠান এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অন্যদিকে সরকারি মালিকানাধীন অধিকাংশ বাগান পরিচালিত হয় পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ন্যাশনাল টি কোম্পানির মাধ্যমে। বাংলাদেশ চা বোর্ড নিলাম ব্যবস্থা, কারখানা লাইসেন্স এবং রপ্তানি তদারকির দায়িত্ব পালন করে। তবে বর্তমান কাঠামো অনেক ক্ষেত্রেই পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারছে না।
চা–শিল্পের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো বিপণন ব্যবস্থা। অধিকাংশ চা এখনো চট্টগ্রামের নিলাম ব্যবস্থার মাধ্যমে বিক্রি হয়। ফলে উৎপাদকরা বিদেশি ক্রেতা বা বড় আন্তর্জাতিক বিপণন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারেন না। একই সঙ্গে ব্র্যান্ডিং, আধুনিক প্যাকেজিং এবং মূল্য সংযোজনের ঘাটতির কারণে বাংলাদেশের চা এখনো মূলত কাঁচামাল বা বাল্ক পণ্য হিসেবেই বিক্রি হচ্ছে।
অর্থায়ন সংকটও এই খাতের বড় বাধা। চা–শিল্পকে এখনো শিল্প খাত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে উদ্যোক্তাদের ১২ থেকে ১৪ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে হয়। এটিকে কৃষিভিত্তিক শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি দিলে সুদের হার অনেক কমে আসতে পারে। এতে পুনঃরোপণ, আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ সহজ হবে। পরিবেশবান্ধব হলেও এই শিল্প পর্যাপ্ত সবুজ অর্থায়নের সুবিধা পাচ্ছে না।
উৎপাদনশীলতার দিক থেকেও বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে। এখানে প্রতি হেক্টরে গড়ে প্রায় ৯০০ কেজি চা উৎপাদিত হয়। অথচ কেনিয়ায় এই হার প্রায় ২ হাজার কেজি এবং মালাউইয়ে আড়াই হাজার কেজির বেশি। একইভাবে শ্রীলঙ্কার রপ্তানিকারকেরা প্রতি কেজি চায়ের যে মূল্য পান, বাংলাদেশের উৎপাদকেরা তার এক–তৃতীয়াংশেরও কম আয় করেন। ফলে সমস্যাটি শুধু উৎপাদনের নয়, বরং মূল্য সংযোজনের ক্ষেত্রেই বড় ঘাটতি রয়েছে।
চা–বাগানের অতিরিক্ত জমিতে বিকল্প চাষাবাদ, ফলের বাগান এবং সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের মতো উদ্যোগ নেওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। এতে অতিরিক্ত আয় সৃষ্টি হতে পারে।
শ্রম ব্যবস্থাপনাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বহু চা–বাগানে এখনো কয়েক দশক আগের জনবল কাঠামো বিদ্যমান। শ্রমিকদের মৌলিক মজুরি সীমিত হলেও উৎপাদনভিত্তিক প্রণোদনার মাধ্যমে অনেকে অতিরিক্ত আয় করেন। বাগানগুলোতে আবাসন, রেশন, স্বাস্থ্যসেবা ও প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা থাকলেও নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন এবং আধুনিক চিকিৎসা সুবিধায় ঘাটতি রয়ে গেছে। পাশাপাশি শ্রমিক উৎপাদনশীলতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তাই শ্রমিক কল্যাণ ও উৎপাদনশীলতা একসঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে নতুন পরিকল্পনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
চা–শিল্পের ভবিষ্যৎ মূলত নীতিগত সংস্কারের ওপর নির্ভর করছে। প্রথমত, কৃষি খাতের মতো স্বল্প সুদে অর্থায়নের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, নিলাম ব্যবস্থার পাশাপাশি সরাসরি রপ্তানির সুযোগ বাড়াতে হবে। পাকিস্তান, মিশর, মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়ার বাজারে বাংলাদেশের চায়ের সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি জৈব ও বিশেষায়িত চায়ের বাজার এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের লক্ষ্য করে ব্র্যান্ডভিত্তিক রপ্তানি সম্প্রসারণের সুযোগও কাজে লাগাতে হবে। বিদেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনাও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।
সুশাসন ও প্রযুক্তির ব্যবহারও জরুরি। ডিজিটাল বেতন ব্যবস্থা, উপগ্রহ নির্ভর অবস্থান ব্যবস্থাপনা, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থা চা–শিল্পকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করতে পারে। পাশাপাশি পরিবেশ, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও সুশাসন মানদণ্ড অনুসরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে কর সুবিধা ও সহজ অর্থায়নের আওতায় আনলে দেশি–বিদেশি বিনিয়োগ বাড়তে পারে।
বাংলাদেশের চা–শিল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো দীর্ঘ ঐতিহ্য, অনুকূল জলবায়ু এবং অভিজ্ঞ শ্রমশক্তি। দুর্বলতা মূলত নীতি, অর্থায়ন, বাজার ব্যবস্থা ও ব্যবস্থাপনায়। তাই বিচ্ছিন্ন সংস্কার নয়, প্রয়োজন একটি সমন্বিত রূপান্তর পরিকল্পনা। স্বল্প সুদে অর্থায়ন, বাজার উদারীকরণ, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা এবং মূল্য সংযোজনভিত্তিক রপ্তানি কৌশল বাস্তবায়ন করা গেলে চা–শিল্প আবারও দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাতে পরিণত হতে পারে। সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো এ বিষয়ে ভাবছে—এটি ইতিবাচক অগ্রগতি। এখন প্রয়োজন দ্রুত ও কার্যকর বাস্তবায়ন।
- মামুন রশীদ অর্থনীতি বিশ্লেষক

