দেশের কৃষি খাতে বাজেট বরাদ্দ ও ভর্তুকি ধারাবাহিকভাবে কমে যাওয়ায় খাদ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে সতর্ক করেছে একটি গবেষণা। গবেষকদের মতে, উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও কৃষকদের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা বৃদ্ধি না পেলে খাদ্য উৎপাদন প্রত্যাশিত হারে বাড়বে না। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে বাজারে খাদ্যপণ্যের দামে।
গতকাল শনিবার (৪ জুলাই) বাংলাদেশ ফুড সিকিউরিটি নেটওয়ার্ক (খানি বাংলাদেশ) প্রকাশিত ‘এগ্রিকালচারাল বাজেটিং ইন বাংলাদেশ: ট্রেন্ডস, প্রায়োরিটিস অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক আউটলুক’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক খাদ্য নিরাপত্তা ও মূল্যস্ফীতি বিশ্লেষণে বাংলাদেশকে ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় রাখা হয়েছে। উচ্চ খাদ্যমূল্য ও ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির কারণে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা চাপের মুখে পড়েছে। গবেষণায় আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, খাদ্য মূল্যস্ফীতির কারণে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ভোগান্তি আরও বাড়বে। একই সঙ্গে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ে যেতে পারেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, খাদ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি। তবে এ ক্ষেত্রেও উদ্বেগজনক চিত্র সামনে এসেছে। একসময় কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫৫ শতাংশ থাকলেও বর্তমানে তা নেমে প্রায় ২ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছেছে। ভবিষ্যতে খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এই ধীরগতি বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, বন্যা, খরা, লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো জলবায়ুজনিত দুর্যোগ কৃষি উৎপাদনকে ক্রমেই অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিশেষ করে ২০২৬ সালে হাওর অঞ্চলের আগাম বন্যায় হাজার হাজার হেক্টর বোরো ধানের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া উচ্চ উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি সংকট, আগাম বন্যা এবং কৃষি ভর্তুকি কমে যাওয়ার বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ অদূর ভবিষ্যতে তীব্র খাদ্য নিরাপত্তা সংকট এবং উচ্চ খাদ্যমূল্যের মুখোমুখি হতে পারে বলেও সতর্ক করেছে গবেষণা।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১১-১২ অর্থবছরে জাতীয় বাজেটের ১০ দশমিক ৬৫ শতাংশ কৃষি খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সেই বরাদ্দ কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৫ দশমিক ৯৪ শতাংশে। একই সময়ে কৃষি ভর্তুকির অংশও ৬ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ২ দশমিক ১৬ শতাংশে নেমে এসেছে।
গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের প্রায় ৪৫ শতাংশ মানুষের কর্মসংস্থান কৃষির ওপর নির্ভরশীল। অথচ জাতীয় বাজেটের আকার বাড়লেও কৃষি খাতের বাজেট ও ভর্তুকি সেই অনুপাতে বৃদ্ধি পায়নি। ফলে কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা আরও কঠিন হয়ে পড়ছে।
এদিকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কৃষি বাজেট আগের বছরের তুলনায় আরও ২ দশমিক ২৫ শতাংশ কমানো হয়েছে। গবেষকদের মতে, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, কৃষকের লাভ কমে যাওয়া এবং জলবায়ুজনিত ঝুঁকির মধ্যে বাজেট সংকোচনের এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে খাদ্য উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সব দিক বিবেচনায় প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কৃষি খাতে ধারাবাহিক বাজেট সংকোচন ও ভর্তুকি হ্রাস দেশের কৃষির আধুনিকায়ন, খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টাকে দুর্বল করে দিতে পারে। তাই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষি খাতে বিনিয়োগ ও নীতিগত সহায়তা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

