বর্তমান সময়ের অর্থনৈতিক আলোচনায় সামষ্টিক অর্থনীতির বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এটি বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট হোক বা দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি—সব জায়গাতেই সামষ্টিক বিশ্লেষণই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক আলোচনায় এখন প্রাধান্য পাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান উত্তেজনা, মধ্যপ্রাচ্য সংকট এবং তার প্রভাব। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক বাণিজ্যের গতি কমে যাওয়া, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির শ্লথতা এবং আঞ্চলিক জোটগুলোর ভবিষ্যৎ করণীয়। এসব বড় আলোচনার আড়ালে প্রায়ই চাপা পড়ে যাচ্ছে মানুষের বাস্তব জীবন। যেমন কর্মহীনতা বেড়ে যাওয়া, বিভিন্ন অঞ্চলে দুর্ভিক্ষ, খাদ্য সংকট এবং জীবিকার খোঁজে সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে প্রাণ হারানো মানুষের করুণ বাস্তবতা।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চিত্রও এই প্রবণতার বাইরে নয়। এখানেও সামষ্টিক অর্থনীতি জাতীয় আলোচনার বড় অংশ দখল করে আছে। সম্প্রতি ঘোষিত বাজেট নিয়ে এখনো আলোচনা ও সমালোচনা চলছে। পাশাপাশি সংবাদমাধ্যমে উঠে আসছে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ, বাণিজ্য ঘাটতি, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ঋণ কিস্তি এবং স্বল্পোন্নত দেশের কাতার থেকে উত্তরণ বিষয়ক নানা আলোচনা। অর্থনীতিবিদ, বিশেষজ্ঞ এবং ব্যবসায়ী মহল এসব বিষয়ে মতামত দিচ্ছেন। উন্নয়ন সহযোগীরাও এ আলোচনায় যুক্ত।
দেশের ভেতরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও দ্রুত গতিতে এগোচ্ছে। বিনিয়োগ নিয়ে বিভিন্ন সভা হচ্ছে, তরুণ উদ্যোক্তাদের উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। একই সঙ্গে ব্যাংক খাতের সংস্কার, খেলাপি ঋণ, বেসরকারি খাতের অবস্থা—এসব নিয়েও গোলটেবিল ও আলোচনা সভা চলছে। ফলে অর্থনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে এক ধরনের ধারাবাহিক আলোচনা প্রবাহ তৈরি হয়েছে।
এসব আলোচনা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, অর্থনীতির বড় চিত্রটি ঘুরছে সামষ্টিক স্তরে। এখানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বাণিজ্য ঘাটতি, বিদেশি বিনিয়োগের মতো বড় বড় সংখ্যা ও সূচকই প্রধান হয়ে উঠেছে। নীতিনির্ধারণ, সম্পদ ব্যবস্থাপনা, পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়নের জন্য এসব তথ্য নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই বড় ছবির মধ্যে সাধারণ মানুষের অবস্থান কোথায়?
সামষ্টিক অর্থনীতির এই বিশ্লেষণ কি সেই বাস্তবতা তুলে ধরে, যেখানে নিম্ন আয়ের একটি বড় অংশ দিনে দুই বেলা খাবারও নিশ্চিত করতে পারে না? কিংবা যেখানে লাখ লাখ মানুষ কর্মহীন অবস্থায় জীবনযাপন করছে? অথবা নতুন করে দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে থাকা মানুষের দৈনন্দিন সংগ্রামের চিত্র কি এতে উঠে আসে? বাস্তবতা হলো, সামষ্টিক বিশ্লেষণ অনেক সময় ব্যষ্টিক জীবনের বাস্তবতা আড়াল করে ফেলে। ফলে বড় চিত্রের সঙ্গে মানুষের জীবনের সরাসরি সম্পর্কটি অস্পষ্ট থেকে যায়।
উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়, খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমার কথা বলা হলেও সাধারণ মানুষের কাছে খাদ্যের দাম কমে না। ধানের ভালো ফলন, চাল আমদানি কিংবা খোলা বাজারে সরকারি বিক্রি সত্ত্বেও বাজারে দামের প্রভাব খুব কমই পড়ে। এতে সাধারণ মানুষের খাদ্যাভ্যাস সংকুচিত হয় এবং পুষ্টির ওপরও প্রভাব পড়ে।
শ্রমবাজার ও বেকারত্ব নিয়ে সামষ্টিক তথ্য বলছে কর্মহীন মানুষের সংখ্যা বেশি। কিন্তু গ্রামীণ অর্থনীতির বাস্তব চিত্র ভিন্ন কথা বলে। অনেক জায়গায় অভিযোগ রয়েছে, কৃষিকাজে শ্রমিক পাওয়া যায় না। দৈনিক মজুরি, খাবার ও অন্যান্য সুবিধা মিলিয়ে খরচও বাড়ছে, তবুও শ্রম সংকট রয়ে যাচ্ছে। এই অবস্থায় সামষ্টিক তথ্য ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে একটি বড় ফারাক স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
দেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী আয়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই আয় এখন তিন হাজার কোটি ডলারের বেশি। তবে এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে এক গভীর মানবিক বাস্তবতা। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৫ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর মধ্যপ্রাচ্য থেকে সাড়ে তিন হাজারের বেশি প্রবাসী শ্রমিকের মরদেহ দেশে এসেছে। গত দশকে এই মৃত্যুর সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে এবং মোট প্রায় আটত্রিশ হাজার মরদেহ দেশে ফিরেছে। এই বাস্তবতা সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন রেখে যায়—অর্থনৈতিক অগ্রগতির মূল্য কি মানুষের জীবন হতে পারে?
সামষ্টিক অর্থনীতির আলোচনায় সাধারণত বিনিয়োগের পরিমাণ, বিদেশি সহায়তা বা সম্ভাব্য আয়-ব্যয়ের বড় অঙ্কই গুরুত্ব পায়। কিন্তু এর গুণগত দিক প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে। যেমন কোনো বিদেশি বিনিয়োগ পরিবেশ, কৃষি বা জনস্বাস্থ্যের ওপর কী প্রভাব ফেলবে, তা অনেক সময় বিশ্লেষণে আসে না। স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির কারণে কর্মসংস্থান কমবে কি না, সেটিও বিবেচনায় থাকে না। একইভাবে স্বাস্থ্যখাতে বিদেশি সহায়তা গ্রামীণ পর্যায়ে যাবে নাকি শহরমুখী হবে—এ প্রশ্নও অনেক সময় উপেক্ষিত থাকে। নারীর অংশগ্রহণ, সেবা প্রাপ্তির সুযোগ এবং স্থানীয় মানুষের মতামতের গুরুত্বও যথাযথভাবে মূল্যায়িত হয় না।
পরিমাণগত অগ্রগতি অনেক সময় উন্নয়নের পূর্ণ চিত্র তুলে ধরে না। কারণ উন্নয়ন শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়, বরং মানুষের জীবনে গুণগত পরিবর্তন। এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সাম্য ও সমতা। নারী-পুরুষ, অঞ্চলভিত্তিক বৈষম্য এবং বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যে সমান সুযোগ নিশ্চিত না হলে প্রকৃত উন্নয়ন অর্জন কঠিন হয়ে পড়ে।
সামষ্টিক অর্থনীতির সম্পদ যদি ব্যষ্টিক জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে হয়, তাহলে শুধু অর্থ নয়, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোও শক্তিশালী হতে হবে। দক্ষ, স্বচ্ছ এবং কার্যকর প্রতিষ্ঠান ছাড়া উন্নয়ন কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারে না। দুর্বল কাঠামোতে দুর্নীতি বাড়ে এবং সম্পদের সঠিক ব্যবহার ব্যাহত হয়। এজন্য প্রয়োজন আইনের শাসন, সমান অধিকার এবং সেবায় সাম্য নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে প্রয়োজন দায়বদ্ধতা, স্বচ্ছতা এবং নির্ভরযোগ্য তথ্য ব্যবস্থাপনা। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের কাজের জবাবদিহি নিশ্চিত করা উন্নয়নের অপরিহার্য অংশ।
বাংলাদেশ আজ নতুন সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো গঠনের পথে রয়েছে। এই পরিবর্তন শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকও। উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন সামষ্টিক অগ্রগতির পাশাপাশি ব্যষ্টিক জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আসে। শুধু সংখ্যার অগ্রগতি নয়, বরং মানুষের জীবনমানের উন্নয়নই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।
- সেলিম জাহান: অর্থনীতিবিদ ও ভূতপূর্ব পরিচালক, মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তর এবং দারিদ্র্য দূরীকরণ বিভাগ, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র।

