স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের নির্ধারিত সময় আগামী ২৬ নভেম্বর। এই উত্তরণ টেকসই ও ঝুঁকিমুক্ত করতে সরকার জাতিসংঘের কাছে আরও তিন বছর প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর আবেদন করেছে। জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) সেই আবেদনে ইতিবাচক সাড়া দিলেও স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—শুধু সময় বাড়ানো যথেষ্ট নয়, এই সময়ের মধ্যে অর্থনীতি ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় দৃশ্যমান সংস্কার নিশ্চিত করতে হবে।
ফলে আলোচনার কেন্দ্র এখন আর কত সময় পাওয়া যাবে তা নয়, বরং সেই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ কতটা বাস্তব সংস্কার বাস্তবায়ন করতে পারবে—সেটিই প্রধান প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
এই প্রেক্ষাপটে গত বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে উন্নয়ন সহযোগী, কূটনৈতিক মিশন ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের সামনে সরকারের পক্ষ থেকে প্রস্তুতি ও সংস্কার অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরা হয়। সেমিনারের বিষয় ছিল এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি এবং প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর যৌক্তিকতা।
সেমিনারে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, সরকারের লক্ষ্য উত্তরণ বিলম্বিত করা নয়। বরং প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পন্ন করে একটি স্থিতিশীল ও টেকসই অর্থনৈতিক রূপান্তর নিশ্চিত করাই মূল উদ্দেশ্য। তাই অতিরিক্ত প্রস্তুতিকালের আবেদন করা হয়েছে।
তিনি জানান, গত কয়েক বছরে কোভিড মহামারি, বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার সংকট, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈশ্বিক বাণিজ্যের অনিশ্চয়তা এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপের কারণে প্রস্তুতির বড় অংশ কার্যকরভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। ফলে এখন অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা এবং কাঠামোগত সংস্কার।
সংস্কার পরিকল্পনায় ২৫টি উদ্যোগ:
সরকারের তথ্য অনুযায়ী অতিরিক্ত সময় চাওয়ার পাশাপাশি ২৫টি অগ্রাধিকারভিত্তিক সংস্কার কর্মসূচি চূড়ান্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কর ব্যবস্থা সংস্কার, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, বিনিয়োগ ও বাণিজ্য পরিবেশ উন্নয়ন, ব্যবসা শুরু ও পরিচালনার জটিলতা কমানো, নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা উন্নয়ন, মানবসম্পদ উন্নয়ন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং ওষুধ শিল্পসহ মেধাস্বত্ব প্রস্তুতি জোরদার করা।
সরকার বলছে, বর্তমানে ব্যবসা শুরু করতে যেখানে প্রায় এক বছর সময় লাগে, সেটি কমিয়ে ১৪ দিনে নামিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে লাইসেন্স ও নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ করার কাজ চলছে। এ ছাড়া জাতীয় পর্যায়ের একটি মনিটরিং কমিটি এবং পাবলিক-প্রাইভেট টাস্কফোর্সের মাধ্যমে এসব সংস্কারের অগ্রগতি নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
সিডিপি তাদের মূল্যায়নে জানায়, প্রস্তুতিকাল বাড়ানো তখনই যৌক্তিক হবে, যখন বাংলাদেশ এই সময়কে কাজে লাগিয়ে অভ্যন্তরীণ সংস্কারে বাস্তব অগ্রগতি দেখাতে পারবে। কমিটি বিশেষভাবে পাঁচটি বিষয়ে জোর দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা, কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বৃদ্ধি, সরকারি ব্যয়ের অগ্রাধিকার পুনর্বিন্যাস এবং সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা শক্তিশালী করা। প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি ছাড়া অতিরিক্ত সময় দেওয়া কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়েই সিডিপি কিছুটা সময় বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, বৈশ্বিক বাণিজ্যের অনিশ্চয়তা, সরবরাহ ব্যবস্থার ঝুঁকি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, মূল্যস্ফীতি এবং কাঠামোগত দুর্বলতা—এসব বিষয় উত্তরণ প্রক্রিয়াকে জটিল করেছে বলে উল্লেখ করা হয়।
তবে একই সঙ্গে তারা মনে করিয়ে দিয়েছে, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে তিনটি প্রধান সূচক—মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা—সবকটিতেই উত্তরণের মানদণ্ড পূরণ করেছে। তাই দীর্ঘ সময় নয়, সীমিত অতিরিক্ত সময়ই যথেষ্ট বলে মত তাদের।
সেমিনারে অংশ নেওয়া বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরাও একই ধরনের মত দেন। তাদের মতে, বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিস্থিতি দ্রুত বদলাচ্ছে, তাই সংস্কারের গতি কমে গেলে ঝুঁকি বাড়বে। তারা বিশেষভাবে রপ্তানি বহুমুখীকরণ, কর ব্যবস্থা সম্প্রসারণ, আর্থিক খাত সংস্কার, ব্যবসা সহজীকরণ এবং প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ভবিষ্যতে আরও গভীর বাণিজ্য সম্পর্কের সুযোগ রয়েছে। তবে এর জন্য বাজার আরও উন্মুক্ত করা এবং সমান প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
সিডিপি ইতোমধ্যে তাদের সুপারিশ জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদে জমা দিয়েছে। সেখান থেকে বিষয়টি যাবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে। সেখানেই চূড়ান্ত হবে বাংলাদেশ অতিরিক্ত প্রস্তুতিকাল পাবে কি না এবং পেলে কত দিনের জন্য। অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল চ্যালেঞ্জ এখন সময় পাওয়া নয়, বরং সেই সময় কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায় তা নিশ্চিত করা।
অর্থনীতিবিদ ড. সেলিম রায়হান বলেন, অতিরিক্ত সময় পাওয়া বাংলাদেশের জন্য সুযোগ হলেও এর সুফল নির্ভর করবে সংস্কার বাস্তবায়নের গতি, স্বচ্ছতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ওপর। তিনি বলেন, ব্যাংক খাত, রাজস্ব ব্যবস্থা, ব্যবসা পরিবেশ এবং রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তবায়নের গতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাই সময়কে সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করাই হবে আসল পরীক্ষা। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে উত্তরণের সব আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ করেছে। তাই বিষয়টি এখন আর যোগ্যতার নয়, প্রস্তুতির প্রশ্ন।
জাতিসংঘের বার্তাও একই—সময় বাড়তে পারে, কিন্তু তার বিনিময়ে অর্থনীতি, কর ব্যবস্থা, সুশাসন, ব্যবসা পরিবেশ ও রপ্তানি সক্ষমতায় বাস্তব পরিবর্তন আনতে হবে। ফলে শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি দাঁড়ায়, বাংলাদেশ কত সময় পাচ্ছে তা নয়, বরং সেই সময়কে কতটা কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারছে—সেটিই নির্ধারণ করবে উত্তরণের সফলতা।

