দেশের অন্যতম বৃহৎ ভোগ্যপণ্য আমদানিকারক সিটি গ্রুপ প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার ঋণের চাপে আর্থিক সংকটে পড়েছে। তবে প্রতিষ্ঠানটিকে খেলাপির তালিকায় না ঠেলে ব্যবসা সচল রেখে ঋণ পরিশোধের সুযোগ দিতে চায় ব্যাংকগুলো। এ লক্ষ্যেই ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন এবিবি ঋণ পুনর্গঠনের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে সময় চেয়ে আবেদন করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকও মনে করছে, ব্যবসা চালু থাকলে সিটি গ্রুপের পক্ষে ধীরে ধীরে ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব হবে। এ কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গ্রুপটির ঋণ বর্তমান অবস্থায় বহাল রাখার সুযোগ দিয়েছে। একই সঙ্গে পাওনাদার ব্যাংকগুলো যৌথভাবে প্রতিষ্ঠানটিকে আর্থিক সংকট থেকে উত্তরণের পথ খুঁজছে।
শুধু ভোগ্যপণ্য নয়, সিটি গ্রুপ ইস্পাত, শিপিং, চা এবং গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করেছে। প্রতিষ্ঠানটি তীর, বেঙ্গল, ন্যাচারাল, জীবন, কুইক বাইট ও জেলফি ব্র্যান্ডের বিভিন্ন পণ্য বাজারজাত করে। ১৯৭২ সালে যাত্রা শুরু করা এই শিল্পগোষ্ঠীর সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে সিটি এডিবল অয়েল, সিটি সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ, সিটি অয়েল মিলস, সিটি সিড ক্রুজিং ইন্ডাস্ট্রি, সিটি সিড ক্রুজিং ইন্ডাস্ট্রি (ইউনিট-২), সিটি অর্থনৈতিক অঞ্চল, সিটি অটো রাইস অ্যান্ড ডাল মিলস, সিটি টি এস্টেট, সিটি পলিমার, সিএসআই পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি, ভোট অয়েল রিফাইনারিজ, শম্পা ফ্লাওয়ার মিলস, পূর্বগাঁও অর্থনৈতিক অঞ্চল, রূপসী ফিড মিলস লিমিটেড, রূপসী ফুডস, রূপসী ফ্লাওয়ার মিলস, রূপসী সিড ক্রাশিং লিমিটেড, সিটি এলপিজি, ঢাকা সুগার মিল, ইউকে বাংলা পেপার মিল, হোসেন্দী শিপ বিল্ডিং, ঢাকা সল্ট অ্যান্ড কেমিক্যালস এবং খান ব্রাদার্স শিপ বিল্ডিং লিমিটেড।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সিটি গ্রুপের কাছে দেশি-বিদেশি মোট ৪৭টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পাওনা দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার ৯১১ কোটি টাকা। এই ঋণের অর্ধেকেরও বেশি রয়েছে মাত্র ১০টি ব্যাংকের কাছে। সবচেয়ে বেশি প্রায় দুই হাজার ৩০০ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে এইচএসবিসির। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক, যার পাওনা প্রায় দুই হাজার ১০০ কোটি টাকা। এরপর পাওনাদার হিসেবে রয়েছে সিটি ব্যাংক, ইউসিবি, ইস্টার্ন ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক এবং ডাচ্-বাংলা ব্যাংক। এছাড়া বৈদেশিক মুদ্রায় সিটি গ্রুপের ঋণের পরিমাণ তিন হাজার ২৫৭ কোটি টাকা। এই ঋণ মূলত এডিবি, আইএফসি, আইসিডি, প্রাইম ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড এবং এইচএসবিসির মাধ্যমে নেওয়া হয়েছে।
আর্থিক চাপ কমাতে সিটি গ্রুপ ইতোমধ্যে নিজেদের বড় সম্পদ বিক্রির পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। জানা গেছে, হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চলের কয়েকটি কারখানা বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ২০২২ সালে এসব কারখানায় উৎপাদন শুরু হওয়ার কথা থাকলেও গ্যাস সংযোগ না পাওয়ায় তা সম্ভব হয়নি। পুরো অর্থনৈতিক অঞ্চল অথবা এর একটি অংশ বিক্রির মাধ্যমে পাওয়া অর্থ দিয়ে ঋণের বোঝা কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
এছাড়া গ্রুপটির মালিকানায় মোট ১৮ হাজার ৮৭৫ একর জমিতে বিস্তৃত আটটি চা বাগান রয়েছে, যেখানে ‘বেঙ্গল’ ব্র্যান্ডের চা উৎপাদন করা হয়। প্রয়োজন হলে এসবের মধ্যে কয়েকটি চা বাগানও বিক্রি করা হতে পারে। পুরো পুনর্গঠন প্রক্রিয়াকে সুশৃঙ্খলভাবে এগিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক অডিট প্রতিষ্ঠান ‘আর্নেস্ট অ্যান্ড ইয়ং’-এর মাধ্যমে একটি ব্যবসায়িক পুনর্গঠন পরিকল্পনা প্রস্তুত করা হয়েছে। সেই পরিকল্পনা অনুসারেই পরবর্তী কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে।
বিশেষ নীতিগত সহায়তা চেয়ে গত ৩১ মার্চ বাংলাদেশ ব্যাংকে আবেদন করে সিটি গ্রুপ। আবেদনে জনস্বার্থ বিবেচনায় প্রতিষ্ঠানটিকে ঋণখেলাপি না করা, সুদের হার কমানো এবং মাত্র ১ শতাংশ ডাউনপেমেন্টের মাধ্যমে ঋণ পুনর্গঠনের সুযোগ দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে গ্রুপটির নীতিনির্ধারকদের বৈঠক হয়েছে। পাশাপাশি পাওনাদার ব্যাংকগুলো নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে একটি কমিটিও গঠন করেছে।
পরবর্তীতে গত ২২ জুন এবিবি আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে সিটি গ্রুপের ঋণ পুনর্গঠনের আবেদন জানায়। এর পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংকগুলোকে চিঠি দিয়ে জানায়, ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সিটি গ্রুপের ঋণ বর্তমান শ্রেণিতে বহাল রাখা যাবে। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হবে এবং প্রকৃত আদায় ছাড়া কোনো সুদ আয় হিসেবে দেখানো যাবে না।
গত ৩০ জুন মুদ্রানীতি ঘোষণা অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান বলেন, সিটি গ্রুপের বর্তমান সংকটের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। শুধু বিনিয়োগ-সংকটকে দায়ী করলে পুরো চিত্র বোঝা যাবে না। সমস্যার সমাধানে ব্যাংকগুলো কাজ করছে এবং আগামী তিন মাসের মধ্যে ইতিবাচক অগ্রগতি আসতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঋণ খেলাপি না করার বিষয়ে ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা ব্যাংকগুলোকে দেওয়া হয়েছে। এর বাইরে নতুন কোনো নির্দেশনা দেওয়ার পরিকল্পনা নেই। তবে কোনো ব্যাংক চাইলে সুদের হার কমানোর সুযোগ রয়েছে। এছাড়া গত ২৯ জুন জারি করা এক্সিট নীতিমালার আওতায় গ্রুপটির কোনো প্রতিষ্ঠান এককালীন পুরো দায় পরিশোধ করলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক সুদ মওকুফের সুবিধাও দিতে পারবে।
সম্পদ বিক্রির পথে সিটি গ্রুপ, সংকট মোকাবিলায় ব্যাংকগুলোর যৌথ উদ্যোগ:
সিটি গ্রুপের ঋণসংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে ঋণদাতা ব্যাংকগুলোর সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি ইতোমধ্যে গ্রুপটির বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছে। আলোচনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চলে থাকা কয়েকটি কারখানা বিক্রির বিষয়টি, যেখানে গ্রুপটির সবচেয়ে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ আটকে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, এ বিষয়ে একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সিটি গ্রুপ ইতোমধ্যে সমঝোতা স্মারক সই করেছে। পাশাপাশি গ্রুপটির মালিকানাধীন একটি টেলিভিশন চ্যানেল বিক্রির বিষয়েও আলোচনা চলছে।
বেসরকারি মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেছেন, অতীতে সিটি গ্রুপ কখনও ঋণ পরিশোধে সমস্যায় পড়েনি। তাদের বিরুদ্ধে অর্থ পাচার বা জালিয়াতির অভিযোগও ওঠেনি। তবে অর্থনৈতিক অঞ্চলে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ আটকে যাওয়া এবং করোনার পর বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারজনিত লোকসানসহ কয়েকটি কারণে বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে। তাঁর মতে, হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চলের কারখানাগুলো চালু করা সম্ভব হলে ঋণের বড় একটি অংশ সমন্বয় করা যাবে।
সংকট কাটাতে ব্যাংকগুলোর সমন্বিত পরিকল্পনা:
বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো এবিবির চিঠিতে সিটি গ্রুপকে দেশের অন্যতম শীর্ষ ও সুপরিচিত শিল্পগোষ্ঠী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে ব্যবসায়িক নেতৃত্ব ধরে রেখেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথাও চিঠিতে তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষ করে ‘তীর’ ব্র্যান্ডকে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, দেশের খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক খাতে সিটি গ্রুপের উল্লেখযোগ্য বাজার অংশীদারিত্ব রয়েছে। প্রায় ৪০টি সহযোগী প্রতিষ্ঠান নিয়ে গড়ে ওঠা এই শিল্পগোষ্ঠীতে সরাসরি প্রায় ২৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। বর্তমানে ৩৬টি ব্যাংকের শীর্ষ গ্রাহকদের অন্যতম হিসেবেও প্রতিষ্ঠানটির সুনাম রয়েছে। তবে করোনা মহামারির পর পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়া এবং টাকার প্রায় ৪০ শতাংশ অবমূল্যায়নের কারণে বড় ধরনের বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় লোকসানের মুখে পড়ে গ্রুপটি।
এবিবি আরও জানিয়েছে, কর অবকাশ ও সরকারি প্রণোদনার সুবিধা কাজে লাগাতে মুন্সীগঞ্জের হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চলে একটি শিল্প পার্ক গড়ে তুলতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করেছে সিটি গ্রুপ। কিন্তু গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগে দীর্ঘ বিলম্ব হওয়ায় সেখানে স্থাপিত ছয়টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান এখনও উৎপাদন শুরু করতে পারেনি। অন্যদিকে যন্ত্রপাতি আমদানির ঋণের কিস্তি পরিশোধ ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। এর পাশাপাশি বকেয়া ঋণের কারণে কয়েকটি ব্যাংক বিদ্যমান ঋণসীমার সুবিধা বন্ধ করে দিয়েছে এবং সংকটে থাকা কিছু ব্যাংক ঋণসীমাও কমিয়ে দিয়েছে। এতে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক চাপ আরও বেড়েছে।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ব্যাংক ও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সিটি গ্রুপের মোট ঋণের পরিমাণ প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা, যার বড় অংশ ইতোমধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে। ফলে ব্যবসা পরিচালনা এবং নতুন করে কাঁচামাল আমদানির সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। বাজারে প্রতিষ্ঠানটির পণ্যের চাহিদা শক্তিশালী থাকলেও ঋণসীমা সংকুচিত হওয়ায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে।
একই সঙ্গে ঋণখেলাপি হলে নতুন এলসি খোলার সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, দেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের এক-তৃতীয়াংশের বেশি সরবরাহ করে সিটি গ্রুপ। ফলে তাদের কার্যক্রম ব্যাহত হলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তাও নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হতে পারে। এ কারণে ব্যবসা সচল রাখা এবং ধাপে ধাপে ঋণ পরিশোধের জন্য অতিরিক্ত চলতি মূলধন সহায়তার আবেদন জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে সিটি গ্রুপ কয়েকটি নির্দিষ্ট পদক্ষেপ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানিয়েছে এবিবি। এর মধ্যে রয়েছে হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রকল্পের একটি অংশ বিক্রি, নতুন মূলধন সহযোগী যুক্ত করতে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা, স্বাধীন অডিট দল নিয়োগ, ব্যয় সংকোচন এবং বিভিন্ন সম্পদ বিক্রির পরিকল্পনা। তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে সময় প্রয়োজন হবে বলে সম্প্রতি ৩৫টি ব্যাংকের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে জানানো হয়েছে।
ওই বৈঠকে অংশ নেওয়া ব্যাংকগুলো একমত হয়েছে যে, দীর্ঘদিনের এই বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীকে পুনরায় পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা দেশের অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং ব্যাংকিং খাত—সব ক্ষেত্রের স্বার্থেই গুরুত্বপূর্ণ। এ লক্ষ্যে বিষয়টি বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হবে। প্রয়োজন হলে একটি স্বাধীন অডিট প্রতিষ্ঠানও নিয়োগ দেওয়া হবে। কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকেরা আবার বৈঠকে বসবেন এবং সেখান থেকে একটি যৌথ প্রস্তাব বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে উপস্থাপন করা হবে।
সংকটের কারণ ও উত্তরণের পরিকল্পনা নিয়ে যা বলছে সিটি গ্রুপ:
গত মার্চে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে সিটি গ্রুপ জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠার পর পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে তারা কখনও ঋণখেলাপি হয়নি। এ কারণে অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়িক অংশীজনদের কাছে তারা দীর্ঘদিন ধরে একটি নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠানের পরিচয় বহন করে আসছে। তবে গত চার বছরে একাধিক প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে গ্রুপটি গভীর আর্থিক ও পরিচালনগত সংকটে পড়েছে, যা তাদের তারল্য ও ঋণ পরিশোধের সক্ষমতার ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে।
চিঠিতে বলা হয়, দীর্ঘ সময় ধরে উৎপাদন ইউনিটগুলোতে নিয়মিত ও পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ না থাকায় উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যাহত হয়েছে। সরকার অনুমোদিত গ্যাস বরাদ্দের ভিত্তিতে হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চলে ছয়টি বড় শিল্প ইউনিট নির্মাণ করা হলেও বছরের পর বছর অপেক্ষার পরও গ্যাস সংযোগ পাওয়া যায়নি। এর মধ্যে কয়েকটি কারখানা সম্পূর্ণ প্রস্তুত এবং বাকিগুলোও উৎপাদন শুরুর কাছাকাছি অবস্থায় রয়েছে। কিন্তু বিপুল অঙ্কের মূলধন বিনিয়োগের পরও এসব প্রকল্প থেকে কোনো আয় আসছে না। অন্যদিকে পরিচালন ব্যয় এবং ঋণের কিস্তি নিয়মিত পরিশোধ করতে হওয়ায় পুরো গ্রুপের নগদ প্রবাহ ও ঋণ পরিশোধ সক্ষমতার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
সিটি গ্রুপ আরও জানিয়েছে, তারা স্বল্পমেয়াদি ডলার ঋণের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানি করে থাকে। কিন্তু টাকার অবমূল্যায়নের কারণে বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়ে বড় ধরনের লোকসান হয়েছে। একই সময়ে আমদানি ডলারে হলেও ব্যাংকিং সুবিধা টাকায় নির্ধারিত থাকায় প্রকৃত আমদানি সক্ষমতা প্রায় ৪২ শতাংশ কমে গেছে। অর্থমূল্যে যার পরিমাণ ৯০ কোটি ডলারের বেশি, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১১ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এর পাশাপাশি সুদের হার ৪ থেকে ৫ শতাংশীয় পয়েন্ট বৃদ্ধি পাওয়ায় ঋণের ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এসব বাস্তবতা তুলে ধরে সিটি গ্রুপ বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঋণখেলাপি হিসেবে শ্রেণিভুক্ত না করার অনুরোধ জানিয়েছে। পাশাপাশি জনস্বার্থ বিবেচনায় একক গ্রাহকের ঋণসীমা-সংক্রান্ত বিদ্যমান বিধানে সাময়িক ছাড় চাওয়া হয়েছে। এছাড়া ব্যাংকগুলোর তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের সঙ্গে সর্বোচ্চ ২ শতাংশ সুদে ঋণ সুবিধা, ব্যবসা সচল রাখতে নতুন চলতি মূলধন ঋণ এবং মাত্র ১ শতাংশ ডাউনপেমেন্টে ঋণ পুনঃতপশিলের সুযোগ দেওয়ার আবেদনও করা হয়েছে।
তিন বছরের পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা:
বাংলাদেশ ব্যাংকে দেওয়া একই চিঠিতে সিটি গ্রুপ জানিয়েছে, শুধু নীতিগত সহায়তার ওপর নির্ভর না করে তারা একটি নির্দিষ্ট মেয়াদি পুনরুদ্ধার পরিকল্পনাও গ্রহণ করেছে। আগামী তিন বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে বিভিন্ন পদক্ষেপ বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কিছু সম্পদ বিক্রি এবং শেয়ার বিক্রির সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। পাশাপাশি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির মাধ্যমে নতুন মূলধন সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি অলস পড়ে থাকা কারখানাগুলো চুক্তিভিত্তিক উৎপাদনের জন্য ভাড়া দিয়ে অতিরিক্ত আয় তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে।
এছাড়া হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চলের নতুন শিল্প ইউনিটগুলো চালু করতে কৃত্রিম গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতির পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন, বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে করণীয় নির্ধারণের জন্য আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়ংকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি সিটি গ্রুপের জন্য একটি বিস্তারিত ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ করছে।

