আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বাংলাদেশের সম্পর্কের ইতিহাস প্রায় পাঁচ দশকের। স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে অর্থনৈতিক চাপ সামাল দিতে দেশটিকে অন্তত ১১ বার এই সংস্থার সহায়তা নিতে হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৩ সালে অনুমোদিত ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড়। পরে এর পরিমাণ বাড়িয়ে ৫৫০ কোটি ডলারে উন্নীত করা হয়।
তবে এত বড় ঋণ কর্মসূচিকে ঘিরে বিতর্কও কম নয়। অনেকেই জানতে চান, এই ঋণের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী হতে পারে এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের জন্য কী শিক্ষা রয়েছে।
আইএমএফের সহায়তা নিয়ে সফলভাবে অর্থনীতি পুনর্গঠনের অন্যতম আলোচিত উদাহরণ দক্ষিণ কোরিয়া। ১৯৯৭ সালের এশীয় আর্থিক সংকটের সূচনা হয় থাইল্যান্ডে। ডলার সংকটের কারণে দেশটি বাথ মুদ্রার অবমূল্যায়ন করলে এর প্রভাব দ্রুত ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন ও দক্ষিণ কোরিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় দক্ষিণ কোরিয়া আইএমএফের কাছ থেকে ৫৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ গ্রহণ করে।
তবে এই সহায়তার সঙ্গে ছিল কঠোর শর্ত। শ্রমবাজারে বড় ধরনের সংস্কার আনা হয়। এর ফলে হাজার হাজার মানুষ চাকরি হারান। দেশজুড়ে ধর্মঘট শুরু হয় এবং তীব্র জনঅসন্তোষ দেখা দেয়। এমন পরিস্থিতিতে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট কিম ইয়ং সাম জাতির উদ্দেশে প্রকাশ্যে ক্ষমা চান। অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি রাজনৈতিক মূল্যও দিতে হয় দেশটিকে।
কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আসে। নির্ধারিত সময়ের আগেই তারা আইএমএফের ঋণ পরিশোধ করে এবং প্রযুক্তি ও রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরের পথে এগিয়ে যায়। অনেক অর্থনীতিবিদের মতে, সংকট-পরবর্তী সেই সংস্কারের ফলেই স্যামসাং, হুন্দাই ও এলজির মতো বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানের বিকাশ আরও শক্ত ভিত্তি পায়।
একইভাবে আয়ারল্যান্ডও আইএমএফের সহায়তা নিয়ে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের উদাহরণ তৈরি করেছে। ২০১০ সালে ইউরোপের ঋণ সংকটের সময় দেশটির ব্যাংকিং খাত প্রায় ভেঙে পড়ে। সেই সময় বাজেট ঘাটতি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৩০ শতাংশে পৌঁছে যায়।
সংকট মোকাবিলায় আইএমএফের সহায়তায় আয়ারল্যান্ড ব্যাংক খাত পুনর্গঠন, করব্যবস্থার সংস্কার এবং সরকারি ব্যয় কমানোর মতো কঠিন পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এসব সিদ্ধান্তের ইতিবাচক প্রভাব দ্রুতই দৃশ্যমান হয়। ২০১২ সালের মধ্যেই দেশটিতে আবার বিনিয়োগ বাড়তে শুরু করে, বেকারত্ব কমে আসে এবং আন্তর্জাতিক ঋণবাজারে আয়ারল্যান্ডের ফিরে যাওয়ার পথও উন্মুক্ত হয়।
২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের সময় আইসল্যান্ডও বড় ধরনের বিপদের মুখে পড়ে। দেশটির ব্যাংকিং খাত কার্যত ভেঙে পড়ার উপক্রম হলে আইএমএফ দ্রুত সহায়তা প্যাকেজ দেয়। সেই সহায়তার ফলে সম্ভাব্য গভীর অর্থনৈতিক বিপর্যয় এড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম হয় দেশটি।
আফ্রিকার ঘানাও আইএমএফের সহায়তা নিয়ে অর্থনীতি পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ২০১৫ সালে ৯১ কোটি ডলারের ঋণ পাওয়ার পর দেশটি রাজস্ব আদায় ও ব্যাংক খাতে সংস্কার কার্যক্রম শুরু করে। ধাপে ধাপে সেই উদ্যোগ অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হয়।
তবে আইএমএফের ঋণ সব দেশের জন্য সমান ফল বয়ে আনেনি। এর বিপরীত চিত্র দেখা যায় গ্রিসে। ২০১০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে আইএমএফ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ নিয়েও দেশটি দ্রুত সংকট কাটিয়ে উঠতে পারেনি। কঠোর ব্যয়সংকোচন নীতির প্রভাবে দেশটির মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রায় এক-চতুর্থাংশ কমে যায়। একই সময়ে বেকারত্বের হার একপর্যায়ে ২৭ শতাংশেরও বেশি হয়ে দাঁড়ায়।
পাকিস্তানের অভিজ্ঞতাও ভিন্ন বার্তা দেয়। এখন পর্যন্ত দেশটি ২৩ বার আইএমএফের সহায়তা নিয়েছে। তবুও রাজস্ব ঘাটতি ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট থেকে পুরোপুরি বের হতে পারেনি। গত ডিসেম্বরে দেশটি আরও ১২০ কোটি ডলারের ঋণ পেয়েছে। এর শর্ত হিসেবে কর-জিডিপি অনুপাত দ্রুত বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে অনেকের আশঙ্কা, এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের চাপ দারিদ্র্য আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
শ্রীলঙ্কার পরিস্থিতি ছিল আরও জটিল। ২০২২ সালে স্বাধীনতার পর সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে দেশটি। তখন জ্বালানি, খাদ্য ও ওষুধের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিও কঠিন হয়ে পড়ে। ২০২৩ সালে ৩০০ কোটি ডলারের আইএমএফ ঋণ পেলেও অর্থনীতি এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারেনি। তবে অর্থনৈতিক সংকোচনের গতি কিছুটা কমেছে।
গ্রিক অর্থনীতিবিদ মাইকেল ক্লেৎসোস ও আন্দ্রেয়াস সিন্তোসের এক গবেষণায় দেখা গেছে, কঠোর শর্তযুক্ত আইএমএফ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া অনেক দেশেই বেকারত্ব বেড়েছে এবং শ্রমবাজারে অনিশ্চয়তা আরও গভীর হয়েছে। পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও কেনিয়ার অভিজ্ঞতাও সেই পর্যবেক্ষণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তাহলে সফলতা ও ব্যর্থতার পার্থক্য কোথায়? যেসব দেশ আইএমএফের সহায়তা নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছে, সেখানে অর্থনৈতিক সংস্কারের পাশাপাশি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং রপ্তানিমুখী শিল্পের ভিত্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। অন্যদিকে যেসব দেশ বারবার সংকটে পড়েছে, সেখানে রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্বল করব্যবস্থা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা সংস্কারের গতি বাধাগ্রস্ত করেছে। সেই বিবেচনায় বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত কোন পথে এগোবে, তার উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়।
বাংলাদেশের বর্তমান ঋণ কর্মসূচির আওতায় মোট ৫৫০ কোটি ডলার সাত কিস্তিতে পাওয়ার কথা। এখন পর্যন্ত পাঁচ কিস্তিতে দেশটি পেয়েছে ৩৬৪ কোটি ডলার। বাকি রয়েছে ১৮৬ কোটি ডলার। পরিকল্পনা অনুযায়ী ষষ্ঠ কিস্তির অর্থ গত বছরের ডিসেম্বরে ছাড় হওয়ার কথা থাকলেও, সংস্কার কর্মসূচি নিয়ে নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে আলোচনা শেষ না হওয়ায় সেই অর্থ এখনও অবমুক্ত হয়নি।
চলতি বছরের মার্চে আইএমএফ আর্থিক খাতের সংস্কারের জন্য সময়সীমাসহ একটি নতুন রোডম্যাপ চেয়েছে। সেই পরিকল্পনার অগ্রগতির ভিত্তিতেই অবশিষ্ট অর্থ ছাড়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এর মধ্যেই মে মাসে জানা যায়, বর্তমান সরকার আগের কর্মসূচির পরিবর্তে তিন থেকে চার বছর মেয়াদি নতুন একটি ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে। সম্ভাব্য এই কর্মসূচির আকার হতে পারে সর্বোচ্চ ৫০০ কোটি ডলার। কারণ, বিদ্যমান কর্মসূচির কয়েকটি শর্ত সরকারের বর্তমান নীতির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মনে করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ আইএমএফের কাছ থেকে যে বিপুল অঙ্কের ঋণ নিয়েছে, তা কোথায় ব্যয় হচ্ছে—এ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা ধারণা রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, এই অর্থ বড় কোনো সেতু, মহাসড়ক বা অবকাঠামো নির্মাণে ব্যবহার করা হচ্ছে। বাস্তব চিত্র অবশ্য ভিন্ন।
৪৭০ কোটি ডলারের মূল ঋণ কর্মসূচির মধ্যে প্রায় ৩৩০ কোটি ডলার এসেছে বাজেট সহায়তা হিসেবে। এই অর্থ সরকারের নিয়মিত ব্যয় নির্বাহ, ভর্তুকি সমন্বয় এবং রাজস্ব ঘাটতি সামাল দিতে ব্যবহার করা হচ্ছে। অন্যদিকে প্রায় ১৪০ কোটি ডলার এসেছে ‘রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি ফ্যাসিলিটি’ কর্মসূচির আওতায়। এই অর্থ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগে ব্যয় করার কথা। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশই প্রথম এই তহবিলের সুবিধা পেয়েছে।
বিশ্বব্যাংক বা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ঋণের মতো এই অর্থ কোনো নির্দিষ্ট সড়ক, সেতু বা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য বরাদ্দ নয়। বরং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখা এবং সরকারের সাধারণ ব্যয় পরিচালনায় এটি সহায়তা করছে।
এই ঋণের বিপরীতে বাংলাদেশকে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রাজস্ব প্রশাসন ও রাজস্ব নীতিকে আলাদা করা, খেলাপি ঋণ কমানো, ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন, বাজারভিত্তিক বিনিময় হার চালু করা, জ্বালানির মূল্য সমন্বয় এবং প্রান্তিকভিত্তিক মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) হিসাব প্রকাশ। এসবের মধ্যে প্রান্তিকভিত্তিক জিডিপির হিসাব প্রকাশের শর্ত ইতোমধ্যে বাস্তবায়ন হয়েছে।
তাহলে কি বাংলাদেশও গ্রিস বা পাকিস্তানের মতো সংকটের পথে এগোচ্ছে? এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো এখনই ঠিক হবে না। কারণ, বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা বা পাকিস্তানের মতো দেউলিয়া হওয়ার পর জরুরি সহায়তা চায়নি। বরং সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় আগাম স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এই ঋণ কর্মসূচিতে যুক্ত হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলেও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও ঋণের কিস্তি পরিশোধসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ। তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে শুল্ক ও কর আদায়ে ঘাটতি ৬০ হাজার কোটি টাকার বেশি ছিল। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণের হার এখনও নির্ধারিত সীমার তুলনায় অনেক বেশি।
আইএমএফের ঋণকে তাই ভালো বা খারাপ—এই দুই ভাগে সহজে বিভক্ত করা যায় না। সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর সংস্কার থাকলে এই ঋণ অর্থনীতির জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে। আবার দুর্বল বাস্তবায়ন ও ভুল নীতির কারণে একই ঋণ নতুন ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। দক্ষিণ কোরিয়া ও আয়ারল্যান্ডের সাফল্য যেমন সংস্কারের কার্যকর বাস্তবায়নের উদাহরণ, তেমনি গ্রিস ও পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা দেখায়, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা থাকলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
মূল প্রশ্ন ঋণ নেওয়া নয়, বরং সেই ঋণের শর্ত কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে। বাংলাদেশের সামনে এখন দুটি সম্ভাব্য পথ রয়েছে। একটি হলো বিদ্যমান কর্মসূচির শর্তগুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করে অবশিষ্ট ১৮৬ কোটি ডলারের অর্থ নিশ্চিত করা। অন্যটি হলো নতুন ঋণ কর্মসূচির আওতায় দেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ শর্ত নিয়ে আইএমএফের সঙ্গে নতুন সমঝোতায় পৌঁছানো।
তবে সম্ভাব্য নতুন ঋণ কর্মসূচিকে পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত বলা যাচ্ছে না। আইএমএফের সর্বশেষ মূল্যায়ন অনুযায়ী, বাংলাদেশ আর কম ঝুঁকির দেশের তালিকায় নেই। টানা দুই অর্থবছর ধরে দেশটি মধ্যম ঝুঁকির শ্রেণিতে অবস্থান করছে। এর ফলে বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রেও আগের তুলনায় কিছু সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে।
নতুন কর্মসূচির আলোচনায় ব্যাংক খাতের সুশাসনকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সে কারণেই দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠন কিংবা প্রয়োজনে বন্ধ করার ক্ষমতা সংক্রান্ত ব্যাংক রেজুলেশন আইনের বিতর্কিত ধারাটি আবারও আলোচনায় এসেছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, দুর্বল ব্যাংকের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হলে স্বল্পমেয়াদে আর্থিক বাজারে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে আমানতকারীদের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
এদিকে আগের ঋণ কর্মসূচি বাস্তবায়নে যেসব বিষয়ে সরকার ও আইএমএফের মধ্যে মতপার্থক্য ছিল, সেগুলোও নতুন আলোচনায় ফিরে আসতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে অভিন্ন ভ্যাট হার চালু করা, কর অব্যাহতি কমানো এবং জ্বালানি ভর্তুকি হ্রাসের মতো বিষয়।
রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতা এখনও কাটিয়ে ওঠা সম্ভব না হওয়ায় নতুন কর্মসূচি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। এটি কি আগের অচলাবস্থার পুনরাবৃত্তি ঘটাবে, নাকি উভয় পক্ষের জন্য গ্রহণযোগ্য ও বাস্তবসম্মত সমঝোতার পথ তৈরি করবে—সেটিই এখন দেখার বিষয়। সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এমন শর্তে সমঝোতায় পৌঁছানো, যা একদিকে অর্থনৈতিক সংস্কারকে এগিয়ে নেবে, অন্যদিকে দেশের বাস্তবতার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। এর চূড়ান্ত ফলাফল সময়ই বলে দেবে।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—শুধু বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা সম্ভব নয়। টেকসই উন্নয়নের জন্য রাজস্ব আদায় বাড়ানো, রপ্তানি খাতকে আরও বহুমুখী করা, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি—এসব ক্ষেত্রেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা বলছে, সংকট নিজেই সাফল্য বা ব্যর্থতা নির্ধারণ করে না। দক্ষিণ কোরিয়া কঠিন সময়কে কাজে লাগিয়ে অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পেরেছিল। বাংলাদেশও যদি প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করে, তাহলে বর্তমান ঋণ কর্মসূচি ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে। আর তা না হলে, গ্রিস বা পাকিস্তানের মতো ঋণনির্ভরতার দীর্ঘ চক্রে আটকে পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাবে না।

