দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ কিংবা লোকসানে থাকা ৪৪টি সরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে নতুন করে উৎপাদনে ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এসব কারখানার বিদ্যমান অবকাঠামো ও জমি ব্যবহার করে দেশি-বিদেশি বেসরকারি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হবে। সরকারের আশা, এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শিল্পে গতি ফিরবে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, উদ্যোগটি সম্ভাবনাময় হলেও এর সফলতা নির্ভর করবে সঠিক বিনিয়োগকারী নির্বাচন, স্বচ্ছ চুক্তি এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বাস্তবায়নের ওপর। অন্যথায় রাষ্ট্রীয় সম্পদের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন ও বিতর্ক সৃষ্টি হতে পারে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক মহাপরিচালক ও অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরীর মতে, অর্থনীতির জন্য এটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে নীতিমালার ভিত্তিতে প্রকৃত উদ্যোক্তাদেরই বিনিয়োগের সুযোগ দিতে হবে এবং পুরো প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে।
অর্থনীতিতে গতি ফিরিয়ে আনা এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি বর্তমান সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। সেই লক্ষ্যেই প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ইতোমধ্যে উচ্চপর্যায়ের দুটি বিশেষ সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তত্ত্বাবধানে শিল্প, বাণিজ্য, বস্ত্র ও পাট, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে এ কর্মসূচি বাস্তবায়নের কাজ করছে।
সর্বশেষ বৈঠকে সম্ভাব্য বিনিয়োগের জন্য চিহ্নিত ৪৪টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অবস্থান, জমির পরিমাণ, বিদ্যমান অবকাঠামো, বন্দর ও মহাসড়কের সঙ্গে যোগাযোগ এবং বিনিয়োগ সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত উপস্থাপনা দেওয়া হয়।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, পাঁচটি রাষ্ট্রায়ত্ত করপোরেশনের আওতাধীন ৪৪টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান নিয়ে একটি রাষ্ট্রীয় শিল্প বিনিয়োগ পোর্টফোলিও তৈরি করা হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে অবস্থিত এসব প্রতিষ্ঠানের অধীনে রয়েছে ১০ হাজার একরেরও বেশি জমি। সেখানে গ্যাস, বিদ্যুৎ, সড়ক যোগাযোগসহ প্রয়োজনীয় শিল্প অবকাঠামো ইতোমধ্যে বিদ্যমান। বিদেশি একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এসব সম্পদের বাণিজ্যিক সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজও শেষ হয়েছে।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের খান বলেন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি সরকারের প্রধান লক্ষ্য। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই ৪৪টি কারখানাকে বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, বিভিন্ন উদ্যোক্তা ইতোমধ্যে আগ্রহ দেখিয়ে বিনিয়োগ পরিকল্পনা জমা দিচ্ছেন। কারখানাগুলো চালু হলে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন করে জমি অধিগ্রহণ বা অবকাঠামো নির্মাণের পরিবর্তে বিদ্যমান শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবহার করেই দ্রুত উৎপাদন শুরু করা হবে। এ জন্য যৌথ উদ্যোগ, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব, দীর্ঘমেয়াদি ইজারা এবং কৌশলগত অংশীদারত্বের মাধ্যমে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ আহ্বান করা হচ্ছে।
এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তারাও। বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ব্যবসা পরিচালনা সরকারের কাজ নয়। তাঁর মতে, সরকার নীতিগত সহায়তা দেবে আর ব্যবসা পরিচালনা করবেন উদ্যোক্তারা। অতীতে সরকারি ব্যবস্থাপনায় অনেক কারখানা লাভজনক হতে না পারাই তার প্রমাণ।
সরকারি হিসেবে, বিনিয়োগের জন্য চিহ্নিত ৪৪টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশনের ১২টি, বাংলাদেশ স্টিল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশনের ৪টি, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের ১০টি, বাংলাদেশ সুগার অ্যান্ড ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের ১৩টি এবং বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের ৫টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অধিকাংশ কারখানাই দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্প করিডরে অবস্থিত। অনেক প্রতিষ্ঠানে এখনো কারখানার ভবন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ, অভ্যন্তরীণ সড়ক এবং দক্ষ জনবল ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। ফলে নতুন বিনিয়োগকারীরা দ্রুত উৎপাদনে যেতে পারবেন।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় বেসরকারি খাতই সবচেয়ে উপযুক্ত। সরকারের দায়িত্ব ব্যবসা পরিচালনা নয়, বরং এমন পরিবেশ তৈরি করা যাতে বেসরকারি বিনিয়োগ সহজে এগিয়ে আসে।
সরকারি উপস্থাপনায় কয়েকটি প্রকল্পকে বিশেষ সম্ভাবনাময় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের কারখানায় ২৪ দশমিক ৭৫ একর জমির মধ্যে প্রায় ১০ একর অব্যবহৃত রয়েছে। বর্তমানে সেখানে সীমিত পরিসরে গাড়ি সংযোজন করা হলেও ভবিষ্যতে পূর্ণাঙ্গ মোটরগাড়ি উৎপাদন কারখানা, আধুনিক বডি ও রং করার ইউনিট এবং বৈদ্যুতিক যানবাহন সংযোজন লাইন স্থাপনের সুযোগ রয়েছে।
চট্টগ্রামের উত্তর পতেঙ্গায় জেনারেল ইলেকট্রিক ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানির ১২২ দশমিক ৯৬ একর জমির বড় একটি অংশও এখনো অব্যবহৃত। সেখানে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব ট্রান্সফরমার উৎপাদন কারখানা গড়ে তোলার সম্ভাবনা দেখছে সরকার। বর্তমানে দেশের চাহিদার উল্লেখযোগ্য অংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়।
গাজীপুরের টঙ্গীতে অবস্থিত এটলাস বাংলাদেশ লিমিটেডের ৯ দশমিক ৬২ একর জমির প্রায় ৬৪ শতাংশ খালি রয়েছে। দেশে বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেলের বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হওয়ায় সেখানে উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছে সরকার।
এ ছাড়া বগুড়ার ছয়পুকুরিয়ায় বছরে তিন লাখ টন উৎপাদনক্ষমতাসম্পন্ন একটি আধুনিক গ্রিন স্টিল মিল স্থাপনেরও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সরকারি সম্ভাব্যতা সমীক্ষা অনুযায়ী, এ প্রকল্পের অভ্যন্তরীণ মুনাফার হার ১৫ দশমিক ২৬ শতাংশ হতে পারে।

