সরকার প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক মূলধন বাজারে সার্বভৌম বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। সরকারি অর্থায়নের নতুন উৎস খুঁজতে এ উদ্যোগের সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এ লক্ষ্যে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, সার্বভৌম বন্ড ইস্যুর বিষয়টি পর্যালোচনার জন্য একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করা হবে। কোন ধরনের বন্ড ইস্যু করা হবে, কত অর্থ সংগ্রহ করা হবে এবং কোন আন্তর্জাতিক বাজারকে লক্ষ্য করা হবে—এসব বিষয়ে সুপারিশ দেবে কমিটি।
পরিকল্পনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরকার অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে চায়। একই সময়ে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত অর্থায়ন পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এ বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক বাজারে সার্বভৌম বন্ড ইস্যুর বিকল্পটি গুরুত্ব পাচ্ছে। আগে ২০২৯ সালের দিকে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কথা ভাবা হলেও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে ঋণের কিস্তি ছাড়ে বিলম্বসহ বিভিন্ন কারণে চলতি অর্থবছরেই বিষয়টি এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
কর্মকর্তারা আরও জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে বন্ড ইস্যুর আগে নতুন করে অন্তত দুটি আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারণকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলাদেশের ক্রেডিট রেটিং করাতে হবে। বর্তমানে স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড পুওরস, মুডিস ও ফিচ নিয়মিত বাংলাদেশের ঋণমান মূল্যায়ন করে। গত মে মাসে ফিচ বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি বৈদেশিক ঋণের পূর্বাভাস ‘স্থিতিশীল’ থেকে ‘ঋণাত্মক’ করলেও দীর্ঘমেয়াদি বৈদেশিক ঋণমান ‘বি প্লাস’ অপরিবর্তিত রেখেছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে অর্থ বিভাগের উপস্থাপনায় বিকল্প অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তা, আন্তর্জাতিক বাজারে সার্বভৌম বন্ড ইস্যুর পটভূমি, সম্ভাব্য সুবিধা এবং সংশ্লিষ্ট ঝুঁকি তুলে ধরা হয়। সেখানে বলা হয়, বন্ড থেকে সংগৃহীত অর্থের মাধ্যমে অর্জিত অর্থনৈতিক সুফল অবশ্যই বন্ডের কুপন, স্প্রেড, ফি এবং অন্যান্য ব্যয়ের চেয়ে বেশি হতে হবে। টেকসই অর্থায়নের জন্য এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব শাহরিয়ার ছিদ্দিকী বলেন, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানসহ কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক সার্বভৌম বন্ড ইস্যু করেছে। তাই বাংলাদেশও আন্তর্জাতিক মূলধন বাজারে প্রবেশের সুযোগ বিবেচনা করতে পারে। তবে এ বিষয়ে আইএমএফের কিছু উদ্বেগ থাকতে পারে, বিশেষ করে রেয়াতি ঋণ পাওয়ার যোগ্যতা নিয়ে। তিনি জানান, বাংলাদেশ যদি চীনা মুদ্রায় ‘পান্ডা বন্ড’ ইস্যুর সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে চীন সহযোগিতা করতে আগ্রহী।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার বলেন, অতীতে ঝুঁকির বিষয়টি বিবেচনায় রেখে অর্থ বিভাগ সার্বভৌম বন্ড ইস্যুর পক্ষে ছিল না। তবে বর্তমান বাস্তবতায় বিষয়টি নতুন করে মূল্যায়নের সুযোগ রয়েছে। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে অনুকূল সুদে বন্ড ছাড়তে হলে আগে দেশের সার্বভৌম ঋণমান আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। পাশাপাশি এটি যেহেতু বাংলাদেশের প্রথম আন্তর্জাতিক সার্বভৌম বন্ড হবে, তাই এর কাঠামো, সময়, মুদ্রা, পরিমাণ এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি যাচাইয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন জরুরি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বৈঠকে বলেন, প্রচলিত ডলারভিত্তিক ইউরো বন্ডের পাশাপাশি চীনা মুদ্রা রেনমিনবিতে ‘পান্ডা বন্ড’ ইস্যুর সম্ভাবনাও বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। তাঁর মতে, প্রথম ধাপে তুলনামূলক ছোট আকারের বন্ড ইস্যু করা উচিত। প্রায় পাঁচ কোটি বা ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ বন্ড ছাড়লে বাজারের প্রতিক্রিয়া বোঝা যাবে এবং ঝুঁকিও সীমিত থাকবে।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিশেষ সহকারী তানভীর গনি বলেন, আন্তর্জাতিক মূলধন বাজারে বাংলাদেশের উপস্থিতি জানান দেওয়ার জন্য এখন সময় উপযুক্ত। তাঁর মতে, বাংলাদেশকে উচ্চ ঝুঁকির দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। ফলে বন্ড ইস্যুর ক্ষেত্রে অতিরিক্ত স্প্রেড গুনতে হবে না। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করলে রেটিং সংস্থাগুলোর কাছেও ইতিবাচক বার্তা যাবে এবং এতে দেশের সার্বভৌম ঋণমান উন্নয়নে সহায়তা মিলতে পারে। তিনি আরও মত দেন, প্রথম বন্ডটি ডলারে ইস্যু করাই বেশি উপযুক্ত হবে। কারণ, অন্যান্য মুদ্রাভিত্তিক বন্ডে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ তুলনামূলক কম।
বৈঠকে আরও সিদ্ধান্ত হয়, মধ্যমেয়াদি ঋণ কৌশল, বার্ষিক ঋণ পরিকল্পনা এবং ঋণ ধারণক্ষমতা মূল্যায়নের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সার্বভৌম বন্ড ইস্যুর বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হবে। পাশাপাশি বাজার ও সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের ইতিবাচক বার্তা দিতে সরকারের বিভিন্ন প্রকাশনায়ও এ বিষয়ে ইঙ্গিত রাখার সুপারিশ করা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আন্তর্জাতিক মূলধন বাজারে বাংলাদেশের প্রবেশকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা উচিত। তিনি জানান, হংকংভিত্তিক বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড গঠনের উদ্যোগ চলছে। এটি বাস্তবায়িত হলে বেসরকারি খাত ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে ইক্যুইটি বিনিয়োগের নতুন সুযোগ তৈরি হবে। সেই উদ্যোগের পাশাপাশি সার্বভৌম বন্ড ইস্যুর সম্ভাবনাও অনুসন্ধান করা যেতে পারে। বৈঠকের শেষে সম্ভাব্যতা যাচাই ও প্রয়োজনীয় সুপারিশ দিতে আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়।
বাংলাদেশে সার্বভৌম বন্ড ইস্যুর আলোচনা প্রথম গুরুত্ব পায় ২০১২ সালের শুরুতে। তবে গ্রিসের ঋণ সংকট এবং পরে ২০২২ সালে অতিরিক্ত বৈদেশিক ঋণের চাপে শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক সংকটের কারণে সরকার সে সময় এ উদ্যোগ থেকে সরে আসে। এরপর ২০১৯ সালের নভেম্বরে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের সদস্য আন্তর্জাতিক ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি) লন্ডনের বাজারে বাংলাদেশি মুদ্রাভিত্তিক ‘বাংলা বন্ড’ ইস্যু করে। এটি ছিল বেসরকারি খাতের জন্য প্রথম বাংলাদেশি টাকাভিত্তিক আন্তর্জাতিক বন্ড।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সরকার যদি অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে চায়, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে বন্ড ইস্যুর বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে বিদেশি অর্থায়নের উৎস আরও বহুমুখী করার দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ঋণ নেওয়ার আগে ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের চাপ কতটা হবে, তার বাস্তবসম্মত মূল্যায়ন জরুরি। পাশাপাশি সুদের হার, বন্ডের শর্ত, বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশিত মুনাফা এবং অর্থায়নের মোট ব্যয়ও বিবেচনায় রাখতে হবে। তাঁর মতে, বিষয়টি এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন আইএমএফ বাংলাদেশের ঋণঝুঁকির মূল্যায়ন নিম্ন ঝুঁকি থেকে মধ্যম ঝুঁকিতে উন্নীত করেছে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থাগুলোও দেশের ঋণমান কমিয়েছে। তাই আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
অধ্যাপক মোস্তাফিজুর আরও বলেন, অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে অতিরিক্ত ঋণ নিলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণ সংকট তৈরি হতে পারে। তবে বিদেশি ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রেও ভবিষ্যৎ পরিশোধ সক্ষমতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি শ্রীলঙ্কার উদাহরণ উল্লেখ করে বলেন, অতিরিক্ত বৈদেশিক ঋণের চাপ দেশটিকে বড় অর্থনৈতিক সংকটে ফেলেছিল। বাংলাদেশকে এমন পরিস্থিতি এড়াতে বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. এ কে এনামুল হক বলেন, আন্তর্জাতিক বন্ডের সফলতা অনেকাংশে নির্ভর করবে এর কাঠামো এবং কার কাছে তা বিক্রি করা হচ্ছে, তার ওপর। তাঁর মতে, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে ডলারভিত্তিক বন্ড ইস্যু করলে বিনিময় হার ও সুদ পরিশোধের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তিনি ইন্দোনেশিয়া ও পূর্ব এশিয়ার আর্থিক সংকটের উদাহরণ দিয়ে বলেন, বৈদেশিক মুদ্রায় উচ্চ সুদের বন্ড অনেক সময় অর্থনীতির ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করে।
তিনি পরামর্শ দেন, বন্ডটি যদি প্রবাসী বাংলাদেশিদের লক্ষ্য করে ইস্যু করা হয়, তাহলে দেশের জন্য তা বেশি লাভজনক হবে। এতে প্রবাসীদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা দেশে থাকবে এবং রিজার্ভ আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে সুদ ও মূল অর্থ টাকায় পরিশোধ করা গেলে বিনিময় হারজনিত ঝুঁকিও কমবে। তাঁর মতে, এ ধরনের বন্ড সবার জন্য উন্মুক্ত না রেখে প্রবাসীদের জন্য বিশেষভাবে চালু করাই অধিক কার্যকর হবে।
সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার ব্যাংক খাত থেকে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা বেশি ঋণ নিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে সরকারের ব্যাংক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে এ খাতে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ছিল এক লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব ঘাটতি ও পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে সরকারকে নির্ধারিত লক্ষ্যের চেয়ে বেশি ঋণ নিতে হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ ঋণ বুলেটিন অনুযায়ী, গত ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎস মিলিয়ে সরকারের মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ২২ লাখ ছয় হাজার ৪৬২ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের জুন শেষে এই পরিমাণ ছিল ২১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৪ কোটি টাকা এবং একই বছরের ডিসেম্বর শেষে ছিল ১৯ লাখ ৪৪ হাজার ১৭১ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে সরকারের মোট ঋণ বেড়েছে দুই লাখ ৬২ হাজার ২৯১ কোটি টাকা।

