দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থার ওপর করা সরকারের সর্বশেষ মূল্যায়নে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। অর্থ মন্ত্রণালয় ১৯টি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানকে ‘অত্যন্ত উচ্চ আর্থিক ঝুঁকিতে’ থাকা প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত দায় দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ২২ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের আর্থিক দুর্বলতা দ্রুত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার ইঙ্গিত দিচ্ছে। একই সময়ে জাতীয় বাজেটের অর্থায়ন নিয়ে সরকারের ওপর চাপ বাড়তে থাকায় এই পরিস্থিতি আরও উদ্বেগ তৈরি করছে। অর্থ বিভাগের মূল্যায়নে দেখা গেছে, দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকা সত্ত্বেও অনেক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান আর্থিকভাবে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে।
বর্তমানে জ্বালানি, পরিবহন, উৎপাদন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উন্নয়ন এবং জনসেবাসহ বিভিন্ন খাতে মোট ১২২টি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ঋণের বোঝা বহন করছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড। প্রতিষ্ঠানটির দায়ের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৭৮ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। একই খাতের গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেডের দায় রয়েছে ১৪ হাজার ১৩১ কোটি টাকা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা ধারাবাহিকভাবে কমছে। পরিচালন আয় দিয়ে পরিচালন ব্যয় মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। পাশাপাশি সম্পদ ও মূলধনের বিপরীতে আয়ও দীর্ঘদিন ধরে খুবই কম, যা পরিচালন দক্ষতা ও আর্থিক সক্ষমতার দুর্বলতার প্রতিফলন।
এ ছাড়া ৩৪ হাজার ৫৪২ কোটি টাকার সম্ভাব্য দায়ের বিষয়টিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলো এমন ঋণ, যার বিপরীতে সরকার দেশি ও বিদেশি ঋণদাতাদের কাছে সার্বভৌম গ্যারান্টি দিয়েছে। প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো নির্ধারিত সময়ে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে সেই দায় সরকারের ওপর বর্তাবে। এতে সরকারি অর্থ ব্যবস্থার ঝুঁকি আরও বেড়ে যাবে।
শুধু ঋণের গ্যারান্টিই নয়, অনেক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান এখনো পরিচালন ব্যয় নির্বাহের জন্য নিয়মিত সরকারি ভর্তুকির ওপর নির্ভরশীল। ফলে জাতীয় বাজেটের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
অর্থ বিভাগ মনে করে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, প্রয়োজনীয় জনসেবা নিশ্চিত করা এবং জাতীয় কৌশলগত লক্ষ্য বাস্তবায়নে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে জ্বালানি নিরাপত্তা, খাদ্য নিরাপত্তা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বাণিজ্য সহজীকরণে এসব প্রতিষ্ঠানের অবদান উল্লেখযোগ্য। তবে মন্ত্রণালয়ের মতে, অনেক প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘস্থায়ী আর্থিক দুর্বলতা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং কার্যকর নীতিগত পদক্ষেপ ছাড়া কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে না।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কার না হলে লোকসানি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা আরও খারাপ হবে। এতে সরকারের আর্থিক ঝুঁকি বাড়বে এবং অন্যান্য উন্নয়ন খাতে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দেওয়ার সক্ষমতাও কমে যেতে পারে।
এ কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সুশাসন জোরদার, পরিচালন দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আর্থিক টেকসইতা নিশ্চিত করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি উন্নত আর্থিক ব্যবস্থাপনা, জবাবদিহি বৃদ্ধি এবং বাণিজ্যিক কার্যকারিতা বাড়ানোর মাধ্যমে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা বাড়ানো এবং সরকারের আর্থিক দায় কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অর্থ বিভাগের মতে, স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও আর্থিকভাবে টেকসই রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান খাত গড়ে তোলা দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য অপরিহার্য। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শক্তিশালী রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান খাত দেশের অর্থনীতিকে আরও সহনশীল করবে, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিকে এগিয়ে নেবে এবং দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে জাতীয় বাজেটের ওপর চাপও কমাবে।

