দেশে গত দুই বছরে পাঁচ শতাধিক শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার তথ্য সম্প্রতি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গত ৩ জুলাই প্রকাশিত এক সংবাদে এই চিত্র সামনে আসে। যদিও বিষয়টি উদ্বেগের, তবে এটি হঠাৎ করে তৈরি হওয়া কোনো সংকট নয়। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার প্রভাব শিল্প খাতে ধীরে ধীরে জমা হয়ে আজ বড় সংকটে রূপ নিয়েছে।
তবে শুধু রাজনৈতিক বা সামাজিক অস্থিরতাকেই এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী করলে পুরো বাস্তবতা তুলে ধরা হবে না। শিল্প খাতের সঙ্গে সম্পর্কিত রাষ্ট্রীয় নীতিতে দীর্ঘদিন ধরে থাকা নানা সীমাবদ্ধতাও বর্তমান অবস্থার অন্যতম কারণ। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নীতিগত দৃষ্টিভঙ্গিতে যে ঘাটতি রয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে প্রয়োজনীয় নীতি ও দলিল সংশোধনের ক্ষেত্রেও দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। একই সঙ্গে নতুন শিল্প স্থাপন এবং বিদ্যমান শিল্পকারখানাগুলোকে পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালনার জন্য যে ধরনের রাষ্ট্রীয় সেবা ও অবকাঠামোগত সহায়তা প্রয়োজন, সেখানেও ধীরগতি ও অদক্ষতা স্পষ্ট।
ফলে রাজনৈতিক-সামাজিক অস্থিরতা, নীতিগত দুর্বলতা এবং প্রয়োজনীয় সেবা ও অবকাঠামো প্রদানে ব্যর্থতা—এই তিনটি কারণ মিলেই দেশের শিল্প খাতকে ক্রমেই কঠিন পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিয়েছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে আসা উদ্বেগজনক তথ্যগুলো মূলত এই দীর্ঘমেয়াদি সমস্যারই প্রতিফলন।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে দেশে স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে প্রায় ৫০০ শিল্পকারখানা। তবে ইন্ডাস্ট্রিঅল গ্লোবালের হিসাবে এই সংখ্যা আরও দ্বিগুণ হতে পারে। একই সময়ে শুধু তৈরি পোশাক খাতেই দেড় লাখের বেশি মানুষ চাকরি হারিয়েছেন। পাশাপাশি এই খাতে প্রায় ২০০ কোটি ডলারের রপ্তানি আদেশও কমে গেছে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ২ দশমিক ৮৬ শতাংশে। অথচ একই সময়ে জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। সাধারণভাবে বিকাশমান অর্থনীতিতে শিল্প খাতই সবচেয়ে দ্রুত সম্প্রসারণের চালিকাশক্তি হয়ে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এখন সেই চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো।
বিপুলসংখ্যক শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া, ব্যাপক কর্মসংস্থান হারানো এবং উৎপাদন প্রবৃদ্ধির হার গত দেড় দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসা শুধু শিল্প খাতের জন্যই নয়, সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও বড় সতর্কবার্তা। কারণ শিল্প খাতের অগ্রগতি থেমে গেলে অর্থনীতির অন্যান্য খাতের টেকসই উন্নয়নও কঠিন হয়ে পড়ে।
১৯৯১ সালের আগে বিশ্বের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও শিল্প বলতে মূলত উৎপাদনভিত্তিক কার্যক্রমকেই বোঝানো হতো। কিন্তু ওই বছর বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) পরামর্শে সরকার শিল্পনীতিতে পরিবর্তন এনে সেবা খাতকেও শিল্পের অন্তর্ভুক্ত করে এবং দুই খাতের জন্য সমান ধরনের নীতিগত সুবিধা চালু করে। এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সেই নীতিতে আর কোনো পরিবর্তন আসেনি। এ সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল রাষ্ট্র পরিচালনা করলেও কেউ এই কাঠামো পুনর্বিবেচনা করেনি।
এর ফল হিসেবে সেবা খাত উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত হলেও উৎপাদনভিত্তিক শিল্প খাত ক্রমেই পিছিয়ে পড়েছে। বর্তমানে এ খাতের প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ২ দশমিক ৮৬ শতাংশে। একই সঙ্গে দেশের বাজার ধীরে ধীরে বিদেশি পণ্যের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ দ্রুত একটি শক্তিশালী উৎপাদক রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার সুযোগ হারাতে পারে।
তবে সেবা খাতের গুরুত্ব অক্ষুণ্ন রেখেও উৎপাদন শিল্প ও বাণিজ্য খাতের জন্য পৃথক প্রণোদনা নীতির ব্যবস্থা করা সম্ভব ছিল কিন্তু গত সাড়ে তিন দশকে ক্ষমতায় থাকা কোনো সরকারই সেই উদ্যোগ নেয়নি। এর ফলে অধিকাংশ উদ্যোক্তা তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ ও সহজ ব্যবসার দিকে ঝুঁকেছেন, উৎপাদনমুখী শিল্পে বিনিয়োগের পরিবর্তে।
অন্যদিকে শিল্প খাতের নীতিগত সহায়তা ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব বর্তমানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিভক্ত। এর মধ্যে রয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয়, পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। এছাড়া একসময় ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তায় ইইএফ তহবিলের আওতায় বাংলাদেশ ব্যাংকও শিল্প খাতে ঋণ বিতরণ করেছে, যাকে প্রতিবেদনে একটি ভ্রান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দায়িত্ব ছড়িয়ে থাকায় স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও শিল্প খাতের নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের জন্য সমন্বিত কোনো কাঠামো গড়ে ওঠেনি। ফলে নীতিনির্ধারণ, উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নের কাজ এখনো বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে উদ্যোক্তাদের ওপরও। প্রয়োজনীয় সেবা নিতে তাদের এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে ঘুরতে হচ্ছে। তবে এই প্রক্রিয়াটি এতটা সমস্যার হতো না, যদি সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে হয়রানিমুক্ত ও জটিলতাহীন পরিবেশে প্রয়োজনীয় সেবা সহজেই পাওয়া যেত।
আলোচনার তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শিল্প খাতের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সহায়তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের ধীরগতি ও অদক্ষতা। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উদ্যোক্তাদের বক্তব্য ও প্রতিক্রিয়ায়ও এই সমস্যার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। শিল্প স্থাপন এবং বিদ্যমান কারখানাগুলো সচল রাখতে প্লট, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সুবিধা সময়মতো না পাওয়ায় দেশের অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান এখন কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন সক্ষমতা অর্জন করতে পারছে না।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত দুই বছরে প্রায় ৫০০ বা তারও বেশি শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া, দেড় লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হারানো এবং প্রায় ২০০ কোটি ডলারের রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়ার পেছনে অন্যতম বড় কারণ হলো প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সহায়তা দিতে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ধীরগতি, হয়রানি ও অদক্ষতা। এমনকি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনৈতিক লেনদেনকে সমর্থন না করেও অনেক উদ্যোক্তা মনে করেন, অন্তত দ্রুত ও কার্যকরভাবে সেবা পাওয়া গেলে তারা সেই বাস্তবতাও মেনে নিতে বাধ্য হতেন।
সব মিলিয়ে শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া, উৎপাদন সক্ষমতা কমে আসা, নতুন বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়া এবং কার্যাদেশ হ্রাস পাওয়ার মতো সমস্যার পেছনে এই কারণগুলোই প্রধান ভূমিকা রাখছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই সংকট কাটিয়ে উঠতে কয়েকটি সুপারিশও তুলে ধরা হয়েছে।
প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে— রাজনৈতিক পক্ষপাতের ঊর্ধ্বে উঠে মব ও উগ্রপন্থাপ্রভাবিত কর্মকাণ্ড কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা, দ্রুত শিল্পনীতি সংশোধন করে উৎপাদনভিত্তিক শিল্পকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া, শিল্প খাতের প্রয়োজন অনুযায়ী অবকাঠামোগত সহায়তা দ্রুত ও দক্ষতার সঙ্গে নিশ্চিত করা, দেশের সব নৌ, স্থল ও বিমানবন্দরকে কাঁচামাল আমদানি ও পণ্য রপ্তানির জন্য আরও উদ্যোক্তাবান্ধব করে গড়ে তোলা, রাষ্ট্রীয় পুঁজি সহায়তা ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও গতিশীল করা এবং জাতীয় অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন পরিকল্পনায় শিল্প খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাত হিসেবে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া।
তবে প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, আমলাতান্ত্রিক কাঠামোনির্ভর রাষ্ট্রব্যবস্থায় এসব প্রস্তাব কতটা গুরুত্ব পাবে, তা নিয়ে যথেষ্ট অনিশ্চয়তা রয়েছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলা হয়েছে, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে শিল্প খাতের অবস্থা মোটেও স্বস্তিদায়ক নয়। তাই দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে অদূর ভবিষ্যতে সামগ্রিক অর্থনীতি আরও নাজুক অবস্থায় পড়তে পারে। প্রতিবেদনের মতে, এমন ঝুঁকি নেওয়া কোনো দায়িত্বশীল সরকারের জন্য কাম্য হতে পারে না।

