যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক নীতিকে ঘিরে গত অর্থবছরজুড়ে অনিশ্চয়তার মুখে ছিল বাংলাদেশের রপ্তানি খাত। কয়েক দফায় শুল্কহার পরিবর্তন হওয়ায় দেশটির বাজারে রপ্তানি টিকিয়ে রাখা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। বাণিজ্য চুক্তি নিয়েও দেশে-বিদেশে নানা আলোচনা ও সমালোচনা হয়েছে। তবে সব অনিশ্চয়তা কাটিয়ে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ৯ বিলিয়ন ডলারের বেশি পণ্য রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯০৫ কোটি মার্কিন ডলার। আগের অর্থবছরে এ পরিমাণ ছিল ৮৬৯ কোটি ডলার। ফলে এক বছরে রপ্তানি বেড়েছে ৩৬ কোটি ডলার বা ৪ শতাংশের বেশি।
দেশের সামগ্রিক রপ্তানি আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১ শতাংশ কমলেও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বিপরীত চিত্র দেখা গেছে। শুধু ২০২৬ সালের জুন মাসেই দেশটিতে বাংলাদেশের রপ্তানি বেড়েছে ৪১ শতাংশ, যা প্রধান রপ্তানি গন্তব্যগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি।
রপ্তানিকারকদের মতে, এ সময় চীন ও ভারতের পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্র তুলনামূলক বেশি পাল্টা শুল্ক আরোপ করায় বাংলাদেশ প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা পেয়েছিল। ফলে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো বাংলাদেশ থেকে বেশি পরিমাণে পণ্য সংগ্রহে আগ্রহ দেখায়। যদিও পরে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট বৈশ্বিক পাল্টা শুল্কনীতিকে অবৈধ ঘোষণা করলে প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে শুল্ক ব্যবধান কমে আসে। তারপরও কম শুল্কের সময় পাওয়া রপ্তানি আদেশের উৎপাদন অব্যাহত থাকায় বাংলাদেশের রপ্তানিতে ইতিবাচক প্রভাব বজায় থাকে।
ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল ৭৬০ কোটি ডলার। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এ পরিমাণ ছিল ৮৫২ কোটি ডলার। এর আগে ২০২১-২২ অর্থবছরে ১ হাজার ৪২ কোটি ডলার রপ্তানির তথ্য প্রকাশিত হলেও পরে বাংলাদেশ ব্যাংক ও ইপিবির যৌথ তদন্তে ওই অর্থবছরসহ কয়েকটি সময়ের রপ্তানি পরিসংখ্যানে অসঙ্গতি ধরা পড়ে।
শিল্প উদ্যোক্তাদের অভিজ্ঞতাও বলছে, শুল্ক পরিবর্তনের প্রভাব সরাসরি রপ্তানি আদেশে পড়েছিল। নারায়ণগঞ্জভিত্তিক প্যাসিফিক সোয়েটার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রাশেদ জানান, গত বছরের ৯ জুলাই ৩৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক ঘোষণার পর একটি বড় মার্কিন ব্র্যান্ড তাদের ৬০ হাজার পিস টি-শার্টের উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে বলে। পরে ১ আগস্ট শুল্ক ২০ শতাংশে নামিয়ে আনার ঘোষণা এলে একই ক্রেতা পুনরায় উৎপাদন শুরু করার নির্দেশ দেয়।
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছে ঢাকাভিত্তিক মার্কিন বায়িং হাউস লিয়াং ফ্যাশন। প্রতিষ্ঠানটির এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, তাদের মোট রপ্তানি আদেশের প্রায় ৯৯ শতাংশই যুক্তরাষ্ট্রের বাজারনির্ভর। শুল্ক কমানোর ঘোষণা দেওয়ার দিনই একটি মার্কিন ক্রেতা ৭৬ হাজার ৬০০ পিস লং প্যান্ট ও শর্টসের স্থগিত আদেশ পুনরায় কার্যকর করতে বলে। এরপর ধারাবাহিকভাবে আরও নতুন আদেশ আসতে থাকে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেল (ওটেক্সা)-এর সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশ এখন দ্বিতীয় বৃহত্তম সরবরাহকারী দেশ। এ তালিকায় প্রথম অবস্থানে রয়েছে ভিয়েতনাম, আর চীন নেমে গেছে তৃতীয় স্থানে।
গত বছরের ২ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশসহ ৬০টি দেশের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেয়। সে সময় বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ৩৭ শতাংশ পাল্টা শুল্ক নির্ধারণ করা হয়, যা কার্যকর হলে মোট শুল্কের বোঝা ৫২ শতাংশে পৌঁছানোর আশঙ্কা ছিল। তবে কার্যকর হওয়ার দিনই দেশভিত্তিক অতিরিক্ত শুল্ক তিন মাসের জন্য স্থগিত করা হয়।
পরবর্তীতে তিন মাসের বিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ৯ জুলাই নতুন ঘোষণা দিয়ে বাংলাদেশের শুল্কহার ৩৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩৫ শতাংশ করা হয়, যা ১ আগস্ট থেকে কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। পরে দুই দেশের মধ্যে ধারাবাহিক আলোচনার পর একই দিন শুল্ক আরও কমিয়ে ২০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয় এবং সেটিই কার্যকর হয়।
এরপর গত ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্কসংক্রান্ত একটি চুক্তি করে। সেই চুক্তি অনুযায়ী শুল্কহার ১৯ শতাংশে নামার কথা ছিল। তবে ২০ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈশ্বিক শুল্কনীতিকে অবৈধ ঘোষণা করে। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর (ইউএসটিআর) বাংলাদেশসহ ১৫টি দেশ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যে প্রভাব ফেলার অভিযোগ খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু করে। সেই তদন্ত এখনও চলমান।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে পণ্য শনাক্ত ও শুল্ক নির্ধারণে হারমোনাইজড সিস্টেম (এইচএস) কোড ব্যবহার করা হয়। এই শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী বাংলাদেশ বর্তমানে ৯৮ ধরনের পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করে। এর মধ্যে তৈরি পোশাকের অংশই সবচেয়ে বেশি, যা মোট রপ্তানির প্রায় ৮৮ শতাংশ। এছাড়া হোম টেক্সটাইল, ক্যাপ, প্লাস্টিকপণ্য, আসবাবপত্র, ওষুধ এবং সিরামিকও উল্লেখযোগ্য রপ্তানি পণ্যের তালিকায় রয়েছে।

