দেশের খুচরা বাজারে লবণের দাম তুলনামূলক বেশি থাকলেও সেই দামের সুফল পৌঁছাচ্ছে না উৎপাদকের হাতে। উপকূলীয় অঞ্চলের লবণচাষিদের অভিযোগ, উৎপাদন ব্যয় ক্রমেই বাড়ছে, কিন্তু মাঠপর্যায়ে তারা খরচও তুলতে পারছেন না। অন্যদিকে উৎপাদক থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর পথে একাধিক ধাপে মধ্যস্বত্বভোগী ও মিলমালিকদের মুনাফা বাড়তে থাকায় চাষির বিক্রয়মূল্য এবং ভোক্তার ক্রয়মূল্যের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
চাষিদের ভাষ্য, পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সুবিধা এবং সহজ অর্থায়নের অভাবে উৎপাদনের মৌসুমেই কম দামে লবণ বিক্রি করতে বাধ্য হন তারা। পরে সেই একই লবণ বিভিন্ন ব্যবসায়ীর হাত ঘুরে মিল, পাইকারি ও খুচরা বাজারে পৌঁছে কয়েক গুণ বেশি দামে বিক্রি হয়।
কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের উপকূলীয় এলাকার লবণচাষিদের মতে, মৌসুমে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ লবণ উৎপাদিত হওয়ায় বাজারদর দ্রুত কমে যায়। এ সময় পর্যাপ্ত গুদাম না থাকায় এবং নতুন মৌসুমের খরচ মেটাতে অনেকেই দ্রুত লবণ বিক্রি করে দেন। এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ব্যবসায়ীরা কম দামে লবণ কিনে মজুত করেন। পরে বাজারে সরবরাহ কমে গেলে সেই লবণ অনেক বেশি দামে বিক্রি করা হয়।
চকরিয়ার লবণচাষি মো. কামাল জানান, প্রতি মণ লবণ উৎপাদনে তার ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। কিন্তু বিক্রির সময় অনেক ক্ষেত্রেই প্রতি মণে ২৫০ টাকার বেশি পাওয়া যায় না। ফলে প্রায় প্রতি মণেই লোকসান গুনতে হয় এবং প্রতিবছর অনিশ্চয়তার মধ্যেই চাষ করতে হয়।
তার অভিযোগ, চাষিদের কাছ থেকে অপরিশোধিত লবণ কম দামে কিনে মধ্যস্বত্বভোগীরা মিলমালিকদের কাছে বেশি দামে বিক্রি করেন। পরে মিলে পরিশোধন, আয়োডিন সংযোজন ও প্যাকেটজাত করার পর সেই লবণ বাজারে কয়েক গুণ বেশি দামে বিক্রি হয়। এতে সবচেয়ে বেশি লাভ করেন ব্যবসায়ী ও মিলমালিকরা, আর ক্ষতিগ্রস্ত হন উৎপাদক ও ভোক্তা—উভয় পক্ষই।
মাঠে ৪-৫ টাকা, বাজারে ৪০-৫০ টাকা:
বাজার ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন ব্র্যান্ডের প্যাকেটজাত লবণ প্রতি কেজি ৪০ থেকে ৫০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। ফ্রেশ, এসিআই, প্রাণ, তীর ও মৌচাকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের লবণের দাম সাধারণত ৪০ থেকে ৪২ টাকার মধ্যে রয়েছে।
বাঁশখালীর সরল ইউনিয়নের মিনজিরিতলা গ্রামের লবণচাষি মোহাম্মদ ছগির বলেন, বর্তমানে উৎপাদনের মৌসুম না থাকায় কেজিপ্রতি প্রায় ১০ টাকা দরে লবণ বিক্রি হচ্ছে। তবে মৌসুমে দাম নেমে আসে ৪ থেকে ৫ টাকায়। সে হিসাবে প্রতি মণের দাম দাঁড়ায় মাত্র ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। এতে উৎপাদন ব্যয় মিটিয়েও উল্লেখযোগ্য লাভ থাকে না, বরং অনেক সময় লোকসান হয়।
ছানুয়া ইউনিয়নের লবণচাষি বোরহান উদ্দিন মিজানও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান। তিনি বলেন, কয়েক বছর আগে প্রতি মণ লবণ ৪০০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি করা গেলেও এখন উৎপাদন খরচ ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায় পৌঁছেছে। অথচ মিলমালিকদের কাছ থেকে অনেক সময় ২০০ থেকে ২৫০ টাকার বেশি দাম পাওয়া যায় না। বিপরীতে সেই লবণই বাজারে ৪৫ থেকে ৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতে দেখা যায়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত লবণ পৌঁছাতে একাধিক স্তর অতিক্রম করতে হয়। প্রতিটি ধাপেই মূল্য সংযোজনের পাশাপাশি মুনাফা যোগ হয়। তবে কোথায় কত মুনাফা হচ্ছে, তার কার্যকর নজরদারি না থাকায় বাজারে অস্বচ্ছতা তৈরি হয়। এর সুযোগ নিয়ে কিছু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকটের ধারণাও সৃষ্টি করেন, যা পাইকারি ও খুচরা বাজারে মূল্য বৃদ্ধির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে ভোক্তা বেশি দাম পরিশোধ করলেও সেই অতিরিক্ত অর্থের কোনো অংশই প্রায় উৎপাদক পর্যায়ে পৌঁছায় না।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি ও সাবেক সচিব এ এইচ এম সফিকুজ্জামানের মতে, কৃষিপণ্যের মতো লবণের বাজারও আরও প্রতিযোগিতামূলক ও স্বচ্ছ করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, চাষিদের সমবায়ের মাধ্যমে বিপণনব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে উৎপাদকরা ন্যায্যমূল্য পাবেন এবং ভোক্তারাও তুলনামূলক কম দামে লবণ কিনতে পারবেন। তার ভাষায়, বর্তমানে লবণচাষিরা যেমন ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, তেমনি ভোক্তাদেরও বেশি দাম গুনতে হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাচ্ছেন মধ্যস্বত্বভোগী ও মিলমালিকরা।
দেশে লবণের চাহিদা কত:
শিল্প মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ২৫ লাখ ৩০ হাজার টন লবণের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৬ লাখ টন ব্যবহৃত হয় ভোজ্য ও অন্যান্য সাধারণ কাজে এবং প্রায় ৯ লাখ টন ব্যবহৃত হয় টেক্সটাইল, ডাইং, চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণসহ বিভিন্ন শিল্পখাতে।
খাদ্যোপযোগী লবণের জন্য মিলগুলোতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অপরিশোধিত লবণ সংরক্ষণ করা হয়। তবে ধোয়া, পরিশোধন, আয়োডিন সংযোজন ও প্যাকেটজাত করার বিভিন্ন ধাপে ওজন প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। ফলে দেশের মানুষের প্রকৃত বার্ষিক ভোজ্য লবণের ব্যবহার প্রায় ৬ থেকে ৭ লাখ মেট্রিক টন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য বলছে।
এ ছাড়া ভারী শিল্প, মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ, শুঁটকি উৎপাদন, গবাদিপশুর খাদ্য এবং বিশেষ করে কোরবানির ঈদের সময় পশুর চামড়া সংরক্ষণেও প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ লবণ ব্যবহার করা হয়। শুধু কাঁচা চামড়া সংরক্ষণের জন্যই বছরে প্রায় ১ লাখ টন লবণের প্রয়োজন হয়।

