উত্তরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের একটি বড় প্রত্যাশা ছিল আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন একটি পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়। সেই লক্ষ্য সামনে রেখে ২০২২ সালে শুরু হয় রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (আরএমইউ) প্রকল্প। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৬ সালের মধ্যেই চালু হওয়ার কথা ছিল ১ হাজার ২০০ শয্যার একটি আধুনিক হাসপাতাল। পাশাপাশি নির্মাণের কথা ছিল একাডেমিক ভবন, গবেষণা কেন্দ্র, শিক্ষার্থী আবাসনসহ প্রয়োজনীয় সব অবকাঠামো।
তবে প্রকল্প শুরুর প্রায় চার বছর পরও হাসপাতাল বা একাডেমিক ভবনের মতো প্রধান স্থাপনাগুলোর নির্মাণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়নি। ইতোমধ্যে সম্পন্ন হওয়া কিছু কাজেও প্রকৌশলগত ত্রুটির অভিযোগ উঠে এসেছে। ফলে প্রকল্পের বাস্তবায়ন গতি এবং নির্মাণমান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সম্প্রতি বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) প্রকাশিত এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়েকশ কোটি টাকা ব্যয় এবং দীর্ঘ সময় পার হলেও প্রকল্পটি এখনো মূলত প্রস্তুতিমূলক কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
প্রকল্প কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ৩৮ দশমিক ৬০ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ৩৪ দশমিক ৪২ শতাংশ। তবে আইএমইডির মূল্যায়নে বলা হয়েছে, এই অগ্রগতির বড় অংশই জমি অধিগ্রহণ, ভূমি ভরাট, সীমানাপ্রাচীর এবং প্রবেশদ্বার নির্মাণের মতো প্রাথমিক কাজ। অথচ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হিসেবে থাকা ১ হাজার ২০০ শয্যার হাসপাতাল, একাডেমিক ভবন, গবেষণা অবকাঠামো, আবাসিক হল, ইউটিলিটি ব্যবস্থা এবং আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম সংগ্রহের কাজ এখনো বাস্তব নির্মাণপর্যায়ে পৌঁছায়নি।
২০২২ সালের জুনে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদন পাওয়া এ প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল ১ হাজার ৮৬৭ কোটি ৯ লাখ টাকা। কাজ শেষ হওয়ার লক্ষ্য ছিল ২০২৬ সালের জুন। কিন্তু নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আগেই প্রকল্প ব্যয় বেড়ে হয়েছে ২ হাজার ২৫৭ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ অতিরিক্ত প্রায় ৩৯১ কোটি টাকা যোগ হয়েছে। একই সঙ্গে দুই দফায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছে।
আইএমইডির প্রতিবেদনে নির্মাণকাজের মান নিয়েও একাধিক পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ইটের গাঁথুনিতে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি পুরু মর্টার ব্যবহার, মর্টারের মিশ্রণে অসামঞ্জস্য, যথাযথ কিউরিং না করা, ইট বসানোর ত্রুটি এবং দেয়ালের সরলরেখা ঠিকভাবে বজায় না রাখার মতো সমস্যা পাওয়া গেছে। এছাড়া কয়েকটি স্থানে নিম্নমানের বালু ব্যবহারেরও প্রমাণ মিলেছে। রড-সিমেন্টের কংক্রিটের কিছু অংশ নির্ধারিত চাপ-সহনশীলতার মান অর্জন করতে পারেনি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতির আরেকটি বড় কারণ হিসেবে অর্থ ব্যয়ের নিম্নহারকে চিহ্নিত করেছে আইএমইডি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪০৬ কোটি ৯২ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও ব্যয় হয়েছে মাত্র ৩৬ কোটি ৭ লাখ টাকা, যা মোট বরাদ্দের প্রায় ৮ শতাংশ। পরবর্তী অর্থবছরেও ব্যয় হয়েছে বরাদ্দের মাত্র ২২ শতাংশ। অর্থাৎ প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ থাকলেও তা যথাযথভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি।
কেনাকাটা কার্যক্রমেও বড় ধরনের স্থবিরতার তথ্য উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুযায়ী মোট ৬১টি ক্রয় প্যাকেজের মধ্যে রয়েছে ৪১টি পণ্য, ১৩টি নির্মাণ, পাঁচটি সেবা এবং দুটি ভৌত সেবা প্যাকেজ। কিন্তু এখন পর্যন্ত মাত্র একটি পণ্য প্যাকেজের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি ৪০টি পণ্য প্যাকেজের ক্রয় প্রক্রিয়াই শুরু হয়নি। সেবা প্যাকেজগুলোর কোনো অগ্রগতিও নেই। আটটি নির্মাণ প্যাকেজের দরপত্র প্রক্রিয়া শুরু হলেও হাসপাতাল, একাডেমিক ভবনসহ প্রকল্পের প্রধান অবকাঠামোর নির্মাণকাজ এখনো শুরু করা যায়নি।
আইএমইডি তাদের প্রতিবেদনে ধীরগতির পেছনে জমি অধিগ্রহণের জটিলতা, সীমানা বিরোধ, বন বিভাগের অনুমোদনে বিলম্ব, বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা, নকশা পরিবর্তন, নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি এবং বালু সংকটের মতো কারণ উল্লেখ করেছে। তবে সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এসব সমস্যার অনেকটাই আগাম পরিকল্পনার ঘাটতি, ঝুঁকি মূল্যায়নের অভাব এবং কার্যকর তদারকির দুর্বলতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
পরিস্থিতি উন্নয়নে দ্রুত দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন, বাস্তবসম্মত বাস্তবায়ন পরিকল্পনা গ্রহণ, নির্মাণকাজে কঠোর প্রকৌশল তদারকি এবং নিয়মিত স্বাধীন মান পরীক্ষা নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে আইএমইডি।
এ বিষয়ে রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. জাওয়াদুল হক বলেন, আইএমইডির প্রতিবেদনের বিষয়গুলো বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নজরে এসেছে। প্রতিবেদনে দেওয়া সুপারিশ বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।

