বৈশ্বিক পোশাক বাণিজ্যে চীনের আধিপত্য ধীরে ধীরে কমলেও সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যাওয়ার দৌড়ে বাংলাদেশ আগের অবস্থানে নেই। বরং গত চার বছরে চীনের বাজার থেকে সরে আসা নতুন ক্রয়াদেশের বড় অংশ নিজেদের ঝুলিতে তুলছে ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া। একই সঙ্গে এলডিসি থেকে উত্তরণের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে শুল্ক সুবিধা হারানোর ঝুঁকি বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্য বড় উদ্বেগ হয়ে উঠতে পারে বলে সতর্ক করেছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (র্যাপিড)।
গত রোববার ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক কর্মশালায় প্রতিষ্ঠানটি তাদের সর্বশেষ গবেষণার ফলাফল তুলে ধরে। গবেষণায় বলা হয়, ২০২২ সালে বৈশ্বিক পোশাক রপ্তানিতে চীনের অংশীদারিত্ব ছিল ২৬ দশমিক ৩৩ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২৩ দশমিক ৫৬ শতাংশে। কিন্তু এই পরিবর্তনের ফলে তৈরি হওয়া বাজারের সুযোগ বাংলাদেশ প্রত্যাশিতভাবে কাজে লাগাতে পারেনি। ২০২২ সালে বাংলাদেশের বাজার অংশীদারিত্ব ছিল ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশ, যা ২০২৫ সালেও প্রায় একই অবস্থানে রয়েছে।
অন্যদিকে একই সময়ে কম্বোডিয়ার বাজার অংশীদারিত্ব ৩ দশমিক ৩৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪ দশমিক ২৬ শতাংশে পৌঁছেছে। ভিয়েতনামের অংশীদারিত্বও ৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ৯ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন র্যাপিডের চেয়ারম্যান ড. এম এ রাজ্জাক। তিনি বলেন, আগে চীন থেকে সরে আসা রপ্তানি আদেশের প্রধান সুবিধাভোগী ছিল বাংলাদেশ। কিন্তু এখন সেই অবস্থান আর নেই। এটি আন্তর্জাতিক পোশাক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজনীয়তার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়, ২০১৫ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। ওই সময় চীনের বৈশ্বিক বাজার অংশীদারিত্ব প্রায় ১০ শতাংশ পয়েন্ট কমে গেলে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছিল বাংলাদেশ। সেই সময়ে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব বেড়েছিল ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ পয়েন্ট। একই সময়ে ভিয়েতনামের অংশীদারিত্ব বাড়ে ২ দশমিক ৪৬ শতাংশ পয়েন্ট এবং কম্বোডিয়ার বাড়ে শূন্য দশমিক ৯০ শতাংশ পয়েন্ট।
তবে ২০২২ সালের পর চিত্র পাল্টে যায়। ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে চীনের অংশীদারিত্ব আরও ২ দশমিক ৭৭ শতাংশ পয়েন্ট কমলেও বাংলাদেশ প্রায় স্থির অবস্থায় থাকে। বিপরীতে কম্বোডিয়া বাজার অংশীদারিত্ব বাড়ায় শূন্য দশমিক ৯০ শতাংশ পয়েন্ট এবং ভিয়েতনাম বাড়ায় শূন্য দশমিক ৪০ শতাংশ পয়েন্ট।
ড. এম এ রাজ্জাকের মতে, নীতিগত অসামঞ্জস্য, বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশের অভাব, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ায় চীনা বিনিয়োগের বিস্তার এবং কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক ও উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদনে বাংলাদেশের সীমিত সক্ষমতা—এসব কারণে দেশটি নতুন বাজারের সুযোগ যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারেনি।
শিল্প উদ্যোক্তারাও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। প্লামি ফ্যাশনস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুল হক বলেন, চীনের রপ্তানি কমলেও সেই শূন্যস্থান পূরণে বাংলাদেশ প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর সঙ্গে কার্যকর প্রতিযোগিতা গড়ে তুলতে পারেনি। তার ভাষ্য, গত আড়াই বছরে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও চীন আন্তর্জাতিক বাজারে আক্রমণাত্মক বিপণন কৌশল অনুসরণ করেছে। কিন্তু বাংলাদেশ সে ধরনের উদ্যোগ নিতে পারেনি।
তিনি আরও বলেন, দেশে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বেড়ে যাওয়া, দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি সংকট এবং ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদের হার শিল্প খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে দুর্বল করেছে। ফলে নতুন বিনিয়োগও নিরুৎসাহিত হচ্ছে। তার মতে, স্বল্পমেয়াদে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতির লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না।
গবেষণায় এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশের রপ্তানি নিয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে যদি নতুন কোনো অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য ব্যবস্থা নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে দেশের রপ্তানিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এলডিসি-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ যদি ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘সর্বাধিক সুবিধাপ্রাপ্ত দেশ’ (এমএফএন) শুল্ক কাঠামোর আওতায় চলে যায় এবং প্রতিযোগী দেশগুলো মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে শুল্কমুক্ত সুবিধা পেতে থাকে, তাহলে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি ৩৬ শতাংশের বেশি এবং তৈরি পোশাক রপ্তানি ৪৩ শতাংশেরও বেশি কমে যেতে পারে।
বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় ৪ হাজার ৮০০ কোটি মার্কিন ডলারের বার্ষিক রপ্তানির প্রায় অর্ধেকই ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে যায়। এখন বাংলাদেশ ‘এভরিথিং বাট আর্মস’ (ইবিএ) সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত রপ্তানি করতে পারছে। তবে এলডিসি থেকে উত্তরণের পর নির্ধারিত রূপান্তরকাল শেষ হলে নতুন কোনো বাণিজ্য ব্যবস্থা না হলে এই সুবিধা আর বহাল থাকবে না।
গবেষণায় আরও বলা হয়, ভিয়েতনাম ও ভারতের মতো প্রতিযোগী দেশগুলো ইতোমধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করেছে। ফলে তারা অনেক ধরনের পোশাক শূন্য বা অগ্রাধিকারমূলক শুল্কে রপ্তানির সুযোগ পাচ্ছে। বাংলাদেশ একই ধরনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে তৈরি পোশাকের ওপর সর্বোচ্চ ১২ শতাংশ পর্যন্ত এমএফএন শুল্ক আরোপ হতে পারে, যা দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজারে মূল্য প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
কর্মশালায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন র্যাপিডের নির্বাহী পরিচালক ড. এম আবু ইউসুফ। এছাড়া ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি দৌলত আক্তার মালাও বক্তব্য দেন।

