কয়েক মাস ধরে টানা মন্দা ও ঋণাত্মক অবস্থার পর আবারও ইতিবাচক ধারায় ফিরেছে জাতীয় সঞ্চয়পত্রের বিক্রি। সদ্য শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এপ্রিল মাসে সঞ্চয়পত্রে সরকারের নিট সংগ্রহ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২৬০ কোটি ৫৭ লাখ টাকা, যা ওই অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।
নিট বিক্রি বলতে নতুন বিক্রি থেকে আগে ইস্যু করা সঞ্চয়পত্রের আসল ও মুনাফা পরিশোধের পর সরকারের হাতে যে অর্থ অবশিষ্ট থাকে, তাকে বোঝায়। এই অর্থ উন্নয়ন ব্যয়সহ বিভিন্ন সরকারি খাতে ব্যবহৃত হয়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যাংকে আমানতের সুদ কিছুটা বাড়লেও ব্যাংকিং খাতের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা পুরোপুরি ফিরে আসেনি। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে শেয়ারবাজারের অস্থিরতা এবং সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমতে পারে—এমন আশঙ্কাও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ছিল। এসব কারণে কয়েক মাস ধরে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি নেতিবাচক অবস্থায় চলে যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরীর মতে, ব্যাংকিং খাত এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীল নয়। ফলে অনেক আমানতকারী নিরাপদ বিনিয়োগের বিকল্প হিসেবে আবারও সঞ্চয়পত্রের দিকে ঝুঁকছেন। তিনি বলেন, সঞ্চয়পত্রে মূলধন হারানোর ঝুঁকি নেই, প্রয়োজন হলে সহজে নগদায়ন করা যায় এবং তুলনামূলক ভালো মুনাফাও পাওয়া যায়। তাই মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যেও যাদের কিছু সঞ্চয় রয়েছে, তারা এই খাতকে বেশি নিরাপদ মনে করছেন।
জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মার্চ—এই তিন মাসেই সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি ছিল ঋণাত্মক। জানুয়ারিতে নিট বিক্রি ঋণাত্মক ছিল ১ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা, ফেব্রুয়ারিতে ১ হাজার ১৬৫ কোটি টাকা এবং মার্চে ২ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা। এর আগে ডিসেম্বরে নিট বিক্রি ইতিবাচক হয়ে ৩৮৫ কোটি টাকায় পৌঁছালেও নভেম্বরে তা ছিল ঋণাত্মক ২৯৩ কোটি টাকা। অবশ্য অর্থবছরের প্রথম চার মাস—জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে ইতিবাচক ছিল সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি।
প্রতি বছর বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকার অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বিভিন্ন উৎস থেকে ঋণ নেয়। অভ্যন্তরীণ ঋণের অন্যতম উৎস হলো ব্যাংক ব্যবস্থা ও সঞ্চয়পত্র। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটে সঞ্চয়পত্র থেকে ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরে সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ১১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা করা হয়। তবে জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী, সরকার নতুন করে যত অর্থ সংগ্রহ করেছে, তার চেয়ে ৪২৯ কোটি টাকা বেশি পরিশোধ করতে হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা আরও কমিয়ে ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এদিকে সম্প্রতি সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমানো হতে পারে—এমন আলোচনা থাকলেও সরকার আগামী ছয় মাসের জন্য বিদ্যমান সুদের হার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকারের মতে, বিপুলসংখ্যক মধ্যবিত্ত পরিবার সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় আপাতত সুদের হার পরিবর্তন করা হচ্ছে না।
তবে নতুন বাজেটে সঞ্চয়পত্রের কর সুবিধায় পরিবর্তনের প্রস্তাব এসেছে। বর্তমানে মুনাফার ওপর ১০ শতাংশ উৎসে কর কেটে রাখা হয় এবং সেটিই চূড়ান্ত কর হিসেবে গণ্য হয়। নতুন ব্যবস্থায় এই কর চূড়ান্ত কর হিসেবে বিবেচিত হবে না। বরং আয়কর রিটার্নে তা সমন্বয় করতে হবে। অতিরিক্ত কর কেটে রাখা হলে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় তা ফেরত পাওয়া যাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তনে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়তে পারেন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা। কারণ যাদের করযোগ্য আয় নেই এবং টিআইএনও নেই, তাদের অতিরিক্ত কাটা কর ফেরত পেতে টিআইএন নিতে হবে এবং আয়কর রিটার্ন জমা দিতে হবে।
অন্যদিকে নিয়মিত করদাতারা রিটার্নে প্রয়োজনীয় তথ্য ও ব্যাংক হিসাব উল্লেখ করে অতিরিক্ত কাটা কর ফেরতের আবেদন করতে পারবেন। যাচাই শেষে ১২০ দিনের মধ্যে তাঁদের হিসাবে অর্থ ফেরত দেওয়ার কথা রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের ভাষ্য, সঞ্চয়পত্র দীর্ঘদিন ধরে শুধু নিরাপদ বিনিয়োগ নয়, বরং অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি, চাকরিজীবী, শিক্ষক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও গৃহিণীদের নিয়মিত আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। তাই কর সুবিধা সীমিত করা হলে সঞ্চয়ের প্রবণতা কমতে পারে এবং মধ্যবিত্তের ওপর আর্থিক চাপ বাড়তে পারে।
ড. মুস্তফা কে মুজেরীর মতে, রাজস্ব বাড়ানোর প্রয়োজন থাকলেও নিয়মিত করদাতা ও সঞ্চয়কারীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না করে কর প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধি, কর ফাঁকি রোধ এবং করের আওতা সম্প্রসারণের দিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

