সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ মাস জুনে দেশের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে গতি আরও কমেছে। সামগ্রিকভাবে অর্থনীতি সম্প্রসারণের ধারায় থাকলেও সেই প্রবৃদ্ধি আগের মাসের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে শ্লথ হয়েছে। বিশেষ করে উৎপাদন ও নির্মাণ খাত আবারও সংকোচনের মুখে পড়েছে।
বাংলাদেশ পারচেজিং ম্যানেজারস ইনডেক্স (পিএমআই) অনুযায়ী, জুনে দেশের ব্যবসায়িক সূচক নেমে এসেছে ৫২ দশমিক ৯ পয়েন্টে। মে মাসে এ সূচক ছিল ৬২ দশমিক ৮ পয়েন্ট। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে ৯ দশমিক ৯ পয়েন্ট।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) এবং পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ (পিইবি) যৌথভাবে প্রতি মাসে এই সূচক প্রকাশ করে। কৃষি, উৎপাদন, নির্মাণ ও সেবা—অর্থনীতির চারটি প্রধান খাতের ওপর জরিপের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়। ১০০ পয়েন্টের এই সূচকে ৫০-এর বেশি মান সম্প্রসারণ এবং ৫০-এর নিচে মান সংকোচন নির্দেশ করে।
সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশের সামগ্রিক ব্যবসায়িক পরিবেশ এখনো সম্প্রসারণের পর্যায়ে থাকলেও গতি অনেকটাই কমে এসেছে। বিভিন্ন খাতের পারফরম্যান্সে বৈচিত্র্যও স্পষ্ট হয়েছে। কৃষি ও সেবা খাত ইতিবাচক অবস্থানে থাকলেও তাদের প্রবৃদ্ধি আগের তুলনায় কমেছে। বিপরীতে উৎপাদন ও নির্মাণ খাত আবার সংকোচনের ধারায় ফিরে গেছে।
জুনে কৃষি খাতের পিএমআই দাঁড়িয়েছে ৬৪ দশমিক ৮ পয়েন্টে। মে মাসে এ সূচক ছিল ৭০। ফলে টানা দশম মাসের মতো কৃষি খাত সম্প্রসারণে থাকলেও প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে। উৎপাদন খাত টানা দুই মাস সম্প্রসারণে থাকার পর জুনে আবার সংকুচিত হয়েছে। মে মাসে এ খাতের সূচক ছিল ৬৪ দশমিক ১ পয়েন্ট, যা জুনে নেমে এসেছে ৪৮ দশমিক ৮ পয়েন্টে।
একই প্রবণতা দেখা গেছে নির্মাণ খাতেও। মে মাসের ৫২ দশমিক ৯ পয়েন্ট থেকে জুনে সূচক কমে হয়েছে ৪০ দশমিক ২। অন্যদিকে সেবা খাতের সূচক ৬২ দশমিক ৩ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৫৪ দশমিক ৬ পয়েন্টে। তবে ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক পরিস্থিতি নিয়ে কিছুটা আশাবাদের কথাও উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়েছে, কৃষি ও সেবা খাত আগামী মাসগুলোতেও সম্প্রসারণের ধারায় থাকতে পারে। পাশাপাশি উৎপাদন ও নির্মাণ খাতও পুনরায় ইতিবাচক প্রবৃদ্ধিতে ফিরবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
জরিপে অংশ নেওয়া ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, জুন মাসে ক্রমবর্ধমান উৎপাদন ব্যয় এবং দুর্বল বাজার পরিস্থিতি তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। এলপিজিসহ বিভিন্ন জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, পরিবহন ও পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং শ্রম ব্যয় বৃদ্ধি ব্যবসার মুনাফায় চাপ সৃষ্টি করেছে।
এ ছাড়া অনেক প্রতিষ্ঠান আর্থিক সংকট, চলমান সড়ক নির্মাণকাজের কারণে ব্যবসায়িক কার্যক্রমে বিঘ্ন এবং সম্প্রতি আরোপিত ১৫ শতাংশ ভ্যাটের ফলে পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। কৃষি খাতের উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা উৎপাদন এবং মৌসুমি চাহিদা—দুই ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ধীরগতিও ব্যবসার ওপর প্রভাব ফেলছে বলে তারা মনে করছেন।
তবে এসব চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে উঠতে ব্যবসায়ীরা আশাবাদী। তাদের মতে, ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করা, জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা এবং ব্যবসাবান্ধব সরকারি নীতি গ্রহণ করা হলে আগামী মাসগুলোতে ব্যবসায়িক আস্থা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও শক্তিশালী হতে পারে।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, জুনের পিএমআই সূচক দেখাচ্ছে যে অর্থনীতি এখনো সম্প্রসারণের ধারায় রয়েছে, তবে বিভিন্ন খাতের প্রবৃদ্ধির মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। তাঁর মতে, কৃষি ও সেবা খাত ইতিবাচক অবস্থানে থাকলেও গতি কমেছে। অন্যদিকে ক্রয়াদেশ, রপ্তানি, কর্মসংস্থান এবং সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতার কারণে উৎপাদন খাত আবার সংকুচিত হয়েছে। নতুন কাজের গতি কমে যাওয়ায় নির্মাণ খাতেও একই চিত্র দেখা গেছে। এছাড়া ঈদুল আজহার দীর্ঘ ছুটি, বর্ষার শুরু এবং ঈদ-পরবর্তী সময়ে চাহিদা কমে যাওয়াও জুন মাসের ব্যবসায়িক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

