দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য সেবা আরও সহজ ও দ্রুত করতে চারটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সংস্থাকে এক ছাতার নিচে আনার পরিকল্পনা করছে সরকার। এর মাধ্যমে অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করা, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ উদ্দেশ্যে ‘সমন্বিত বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০২৬’ শিরোনামে একটি খসড়া আইন প্রস্তুত করেছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)। আইনটি কার্যকর হলে ইউনিফায়েড ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (ইউনিডা) নামে একটি নতুন স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান গঠিত হবে।
প্রস্তাবিত ইউনিডার আওতায় আসবে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা), বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (বিএইচটিপিএ) এবং পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ কর্তৃপক্ষ (পিপিপিএ)।
খসড়া আইনে বলা হয়েছে, নতুন এই কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো, শিল্পায়নকে গতিশীল করা, বিনিয়োগ-সংক্রান্ত সরকারি সেবার মান উন্নয়ন এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শিল্প ও বাণিজ্যিক সম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, ইউনিডা প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষমতাসম্পন্ন একটি সংবিধিবদ্ধ (স্ট্যাটিউটরি) প্রতিষ্ঠান হবে। এর প্রধান কার্যালয় ঢাকায় স্থাপিত হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী দেশের বিভিন্ন অঞ্চল এবং বিদেশেও শাখা কার্যালয় খোলার সুযোগ থাকবে।
বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীর ভাষ্য, বর্তমানে বিনিয়োগকারীদের প্রকল্পের ধরন ও অবস্থান অনুযায়ী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে যেতে হয়। নতুন ব্যবস্থায় একটি কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়া যাবে, ফলে বিনিয়োগ প্রক্রিয়া আরও সহজ ও সমন্বিত হবে। তিনি জানান, নতুন কাঠামো চালু হলেও চারটি প্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান সেবার পরিধি অপরিবর্তিত থাকবে। পরিবর্তন হবে শুধু সেবা প্রদান ও সমন্বয়ের পদ্ধতিতে।
খসড়া আইনে ইউনিডা পরিচালনার জন্য একটি পরিচালনা পর্ষদ গঠনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী অথবা তাঁর মনোনীত মন্ত্রী পদমর্যাদার কোনো ব্যক্তি পর্ষদের সভাপতিত্ব করবেন। এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বা উপদেষ্টা, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, একীভূত হওয়া চার প্রতিষ্ঠানের প্রধান এবং বেসরকারি খাতের তিনজন প্রতিনিধি পর্ষদের সদস্য হবেন।
দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা করবে নির্বাহী চেয়ারম্যানের নেতৃত্বাধীন একটি নির্বাহী পরিষদ। এই কর্তৃপক্ষ বিনিয়োগ উন্নয়ন, অর্থনৈতিক অঞ্চল, হাইটেক পার্ক এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বভিত্তিক (পিপিপি) প্রকল্পের তদারকি করবে। একই সঙ্গে বিনিয়োগ নীতি প্রণয়ন, প্রকল্প অনুমোদন, অবকাঠামোগত সহায়তার সমন্বয়, অনুমোদিত প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতা দূর করার দায়িত্বও ইউনিডার ওপর ন্যস্ত থাকবে।
আইনটি কার্যকর হলে বিশেষায়িত কোনো কর্তৃপক্ষের আওতায় না থাকা সব বেসরকারি শিল্পপ্রকল্পকে ইউনিডার নিবন্ধন বা অনুমোদন নিতে হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশে শাখা, লিয়াজোঁ অথবা প্রতিনিধি কার্যালয় স্থাপন করতে ইচ্ছুক বিদেশি কোম্পানিগুলোকেও এই কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হবে। প্রকল্প অনুমোদনের পর জমি বরাদ্দ, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ, শুল্ক ছাড় এবং পরিবেশগত অনুমোদনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবাগুলো নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সম্পন্ন করার ক্ষমতাও ইউনিডাকে দেওয়া হবে।
খসড়া আইনে আরও বলা হয়েছে, সরকার গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে নতুন শিল্পাঞ্চল, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাইটেক পার্ক ঘোষণা করতে পারবে। প্রয়োজন হলে অচল সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুমদখল আইন, ২০১৭ অনুযায়ী জমি অধিগ্রহণ এবং অব্যবহৃত সরকারি শিল্প ও বাণিজ্যিক সম্পদ বিনিয়োগ প্রকল্পে ব্যবহারের জন্য হস্তান্তরের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
তবে প্রস্তাবিত এই একীভূতকরণ নিয়ে কিছু বিশেষজ্ঞ প্রশ্ন তুলেছেন। পিপিপি বিষয়ে গবেষক ও উপপরিচালক তপস চন্দ্র বসে বলেন, দেশের কর-জিডিপি অনুপাত কম এবং স্বল্পসুদে বৈদেশিক অর্থায়নের সুযোগ সংকুচিত হওয়ায় অবকাঠামো উন্নয়নে পিপিপির গুরুত্ব বেড়েছে। তাঁর মতে, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে পিপিপি কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে ৪১ বিলিয়ন ডলারের বেশি সম্ভাব্য প্রকল্পের পাইপলাইন তৈরি করেছে। তাই এটিকে বৃহত্তর একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত করলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তিনি আইনটি চূড়ান্ত করার আগে আরও বিস্তৃত পরিসরে অংশীজনদের মতামত নেওয়ার পরামর্শ দেন।
অন্যদিকে পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী এম মাসরুর রিয়াজের মতে, কেবল চারটি সংস্থাকে একীভূত করলেই দেশের সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশে বড় পরিবর্তন আসবে না।
তিনি বলেন, দেশে বিনিয়োগ-সংক্রান্ত বিভিন্ন সেবা প্রদানকারী ৫০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। অথচ প্রস্তাবিত সংস্কারে মাত্র চারটি সংস্থাকে একীভূত করার কথা বলা হয়েছে, যাদের দায়িত্ব ও কার্যক্রমও একে অপরের থেকে ভিন্ন। তাঁর মতে, বেজা ও বিএইচটিপিএ শিল্পাঞ্চল ও হাইটেক পার্ক পরিচালনা করে, বিডা বিনিয়োগ আকর্ষণের কাজ করে এবং পিপিপিএ সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বভিত্তিক প্রকল্পের কাঠামো তৈরি করে। তাই শুধু প্রতিষ্ঠান একীভূত না করে অপ্রয়োজনীয় লাইসেন্স, নিবন্ধন ও অনুমোদনের সংখ্যা কমানোর দিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
বিডার নির্বাহী সদস্য (বিনিয়োগ) নাহিয়ান রহমান রচি জানিয়েছেন, অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা শেষে খসড়া আইনটি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। চলতি মাসের শেষ দিকে এটি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ প্রত্যাশার তুলনায় কম এসেছে। একই সময়ে এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রতিযোগিতাও বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে বিদ্যমান সেবার পরিধি অক্ষুণ্ন রেখে বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি সমন্বিত ও একক সেবা প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য।

