বাংলাদেশে ‘পর্যটন অর্থনীতি’ শব্দটি এখনও খুব বেশি আলোচিত নয়। তবে বাস্তবতা হলো, দেশের পর্যটন খাতকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই একটি সক্রিয় অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে উঠেছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর মতো বাংলাদেশও পর্যটন থেকে আয় করে এবং এই খাতের ওপর নির্ভর করে বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকা পরিচালিত হয়।
যদিও এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ও হালনাগাদ পরিসংখ্যানের ঘাটতি রয়েছে, তবুও ধারণা করা হয়, পর্যটন খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অন্তত ৭৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত। পাশাপাশি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) এই খাতের অবদান প্রায় ৩ শতাংশ। পর্যটনকে কেন্দ্র করে নিয়মিত আয়, বিনিয়োগ, পরিবহন, আবাসন, খাদ্যসেবা এবং নানা ধরনের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা পরিচালিত হওয়ায় দেশের অর্থনীতিতে একটি স্বতন্ত্র ক্ষেত্র হিসেবে পর্যটন অর্থনীতি বিদ্যমান।
তবে এত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও দেশের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণী আলোচনায় পর্যটন অর্থনীতি খুব বেশি গুরুত্ব পায় না। অর্থনীতিবিদদের আলোচনাতেও বিষয়টি তুলনামূলকভাবে অনুপস্থিত। সংশ্লিষ্ট সরকারি মহলেও এ খাতকে ঘিরে বড় ধরনের নীতিগত আলোচনা খুব একটা চোখে পড়ে না। অনেকের মতে, জাতীয় অর্থনীতিতে এর অবদান আরও বড় পরিসরে না পৌঁছানোই এর অন্যতম কারণ।
এদিকে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর একটি চ্যালেঞ্জপূর্ণ অর্থনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগের স্থবিরতা এবং কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অস্থিরতাও দেশের অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। ইরান-সংকট, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ, ইরান-আমেরিকা উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অনিশ্চয়তা বিশ্ব অর্থনীতিকে টালমাটাল অবস্থায় নিয়ে গেছে, যার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়ছে।
এর পাশাপাশি আগামী নভেম্বর মাসে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। এই উত্তরণে কিছু নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি হলেও একই সঙ্গে হারাতে হবে বেশ কিছু আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক ও আর্থিক সুবিধা। ফলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নে সরকারকে জটিল বাস্তবতার মধ্য দিয়ে এগোতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতি বিবেচনায় অর্থমন্ত্রীও ইঙ্গিত দিয়েছেন, দেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে অন্তত আরও দুই বছর সময় লাগতে পারে।
এমন বাস্তবতায় দেশের শীর্ষ অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ সরকারের প্রতি পরামর্শ দিয়েছেন, বাজেটের অর্থসংস্থানে দেশীয় ও বৈদেশিক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে স্থানীয় সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। তাদের মতে, দেশের নিজস্ব সম্পদ ও সম্ভাবনাময় খাতগুলোর কার্যকর ব্যবহারই টেকসই অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশের সামনে যে নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হবে, তা মোকাবিলায় কয়েক বছর আগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউট (বিএফটিআই) একটি কৌশলপত্র তৈরি করেছিল। সেই কৌশলপত্র প্রণয়নের কাজেও লেখক যুক্ত ছিলেন বলে উল্লেখ করেন। সেখানে এমন বেশ কয়েকটি দেশীয় খাতের কথা তুলে ধরা হয়েছিল, যেগুলো জাতীয় অর্থনীতিতে নতুন গতি আনতে সক্ষম। সম্ভাবনাময় সেই খাতগুলোর মধ্যে পর্যটনও ছিল অন্যতম।
তবে বাস্তবে ওই কৌশলপত্রের সুপারিশ বাস্তবায়নের তেমন কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি। বিপুল অর্থ ব্যয়ে প্রস্তুত করা নীতিপত্রটি কার্যকর উদ্যোগে রূপ না নিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের আলমারি বা ফাইলেই সীমাবদ্ধ হয়ে আছে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। আগামী বাজেটে দেশি-বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা কমাতে হলে দেশের সম্ভাবনাময় খাতগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের বর্তমান প্রেক্ষাপটে পর্যটন খাত হতে পারে এমনই একটি কার্যকর মাধ্যম, যা সঠিক পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারে।
বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পকে অনেক সময় দুর্বল খাত হিসেবে দেখা হয়। তবে অনেকের মতে, খাতটির মূল দুর্বলতা প্রাকৃতিক সম্পদের অভাবে নয়; বরং দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার ঘাটতি ও নীতিগত অবহেলায় এর সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। পাহাড়, সমুদ্র, নদী, বন ও হাওর—প্রকৃতি বাংলাদেশকে পর্যটনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় সব ধরনের সম্পদই দিয়েছে। কিন্তু এসব সম্পদকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন পণ্যে রূপান্তরের উদ্যোগ পর্যাপ্ত ছিল না। বর্তমানে যতটুকু পর্যটন অবকাঠামো ও সেবা গড়ে উঠেছে, সেটিকে কেন্দ্র করেই দেশের পর্যটন অর্থনীতি পরিচালিত হচ্ছে।
বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ (ডমেস্টিক), বিদেশি পর্যটকের আগমন (ইনবাউন্ড) এবং বিদেশে ভ্রমণকারী বাংলাদেশিদের (আউটবাউন্ড)—তিন ধরনের পর্যটনই বিদ্যমান। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ পর্যটনের পরিসর সবচেয়ে বড়। অন্যদিকে বিদেশে ভ্রমণকারী বাংলাদেশির সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও দেশে বিদেশি পর্যটকের আগমন প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না। বিষয়টি নিয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত।
পর্যটন খাতের কার্যক্রম সচল রাখতে ট্যুর অপারেটর ও ট্যুর গাইডদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশে শিক্ষিত, দক্ষ ও পেশাদার অনেক মানুষ এই পেশার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। সরকারি সহায়তা সীমিত হলেও তারা নিজেদের অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও উদ্ভাবনী উদ্যোগের মাধ্যমে পর্যটন ব্যবসাকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বেসরকারি খাতে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ ইতোমধ্যে পর্যটন শিল্পে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। টাঙ্গুয়ার হাওরকেন্দ্রিক হাউজবোট, সুন্দরবনগামী বিলাসবহুল লঞ্চ এবং সেন্ট মার্টিনগামী প্রমোদতরির মতো উদ্যোগগুলো তারই উদাহরণ। এসব প্রকল্পে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ হয়েছে এবং ধারণা করা হয়, এর একটি অংশ দেশের ব্যাংকিং খাতের ঋণের মাধ্যমে অর্থায়ন করা হয়েছে।
বাংলাদেশের পর্যটন খাতের অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তি হলো আতিথেয়তা বা হসপিটালিটি শিল্প। গত কয়েক বছরে এই খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। কক্সবাজার ও কুয়াকাটার মতো জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রে আন্তর্জাতিক মানের তারকা হোটেল গড়ে উঠেছে। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রাকৃতিক ও শান্ত পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে পরিবেশবান্ধব রিসোর্টও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা দেশীয় পর্যটকদের কাছে ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। পর্যটনসংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের পর্যটন এলাকাগুলোর অধিকাংশ হোটেল ও রিসোর্ট বর্তমানে লাভজনকভাবে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে পর্যটন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা নেওয়া তরুণদের জন্য এই খাত কর্মসংস্থানের একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে উঠেছে।
পর্যটন শিল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো অভ্যন্তরীণ বিমান পরিবহন। এ খাতে বিনিয়োগের পরিমাণও তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। গত এক দশকে বেসরকারি উদ্যোগে দেশের অভ্যন্তরীণ বিমান চলাচলে উল্লেখযোগ্য সম্প্রসারণ ঘটলেও সব প্রতিষ্ঠান দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে পারেনি। তবে বর্তমানে কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো পর্যাপ্ত যাত্রী চাহিদার কারণে ব্যবসায়িকভাবে ভালো অবস্থানে রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। তা সত্ত্বেও পর্যাপ্ত বাজার থাকা সত্ত্বেও কেন একাধিক বেসরকারি এয়ারলাইনস টিকতে পারেনি, সেটি গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে।
পর্যটন খাতের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সরকার ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য। বাজেট প্রণয়নের আগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কিংবা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) পর্যটনসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী ও অন্যান্য অংশীজনদের নিয়ে নিয়মিত মতবিনিময় সভা আয়োজন করতে পারে। এসব আলোচনার ভিত্তিতে বাস্তবসম্মত নীতিমালা ও উন্নয়ন কৌশল নির্ধারণ করা সম্ভব।
বর্তমানে দেশের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি পর্যটন মহাপরিকল্পনা (ট্যুরিজম মাস্টারপ্ল্যান) রয়েছে, যা বাস্তবায়ন করা গেলে এ শিল্পকে আরও সুসংগঠিত ও প্রতিযোগিতামূলক পর্যায়ে নেওয়া সম্ভব। তবে পরিকল্পনার পাশাপাশি বাজার গবেষণা ও বাজার সম্প্রসারণ কার্যক্রমকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। পর্যটনের মৌলিক অবকাঠামো উন্নয়নে সরকারের বড় পরিসরের বিনিয়োগ প্রয়োজন। সরকারি সক্ষমতা সীমিত হলে বিশেষ প্রণোদনা ও নীতিগত সুবিধার মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শও দেওয়া হচ্ছে।
পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও এ খাতের উন্নয়নের অন্যতম শর্ত। এজন্য পর্যটন পুলিশ সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধি, পর্যটনকেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তা জোরদার এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনা আরও কার্যকরভাবে প্রচারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। যেভাবে বাংলাদেশে অবস্থিত বিভিন্ন দেশের দূতাবাস নিয়মিত রোড শোর মাধ্যমে নিজেদের পর্যটন বাজার সম্প্রসারণ করছে, একইভাবে বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোও সম্ভাব্য পর্যটক আকর্ষণে সক্রিয় প্রচারণা চালাতে পারে।
একই সঙ্গে বেসরকারি খাতকে আরও শক্তিশালী করতে নীতিগত সহায়তা, সহজ বিনিয়োগ পরিবেশ এবং কর কাঠামো যৌক্তিক করা জরুরি। পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসার ওপর অপ্রয়োজনীয় করের চাপ কমানোর পাশাপাশি বিদেশি পর্যটক আকর্ষণে সাবরাংয়ের মতো সম্ভাবনাময় প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের দিকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, কার্যকর নীতিসহায়তা এবং সমন্বিত বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প ভবিষ্যতে জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

