বৈশ্বিক উন্নয়ন অর্থায়নের চিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। মূল উন্নয়ন সহায়তার পাশাপাশি বিশেষ তহবিল থেকেও অর্থায়ন কমে আসছে। এর ফলে স্বল্প আয়ের ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর উন্নয়ন কার্যক্রম এবং মানবিক সহায়তা ভবিষ্যতে বড় ধরনের চাপের মুখে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকেরা।
গতকাল বুধবার বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এবং অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ওইসিডি)-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক ভার্চুয়াল আলোচনায় এসব বিষয় উঠে আসে। অনুষ্ঠানে ‘ওইসিডি মাল্টিলেটারাল ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স ২০২৬’ প্রতিবেদনের বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ উপস্থাপন করা হয়।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বহুপক্ষীয় উন্নয়ন অর্থায়নের পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ কমেছে। পাশাপাশি আশঙ্কা করা হচ্ছে, ২০২৩ থেকে ২০২৭ সালের মধ্যে ওইসিডির ডেভেলপমেন্ট অ্যাসিস্ট্যান্স কমিটির সদস্য দেশগুলোর উন্নয়ন সহায়তা ৩০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, বহুপক্ষীয় অর্থায়ন কমে যাওয়ার প্রবণতা বর্তমান ভূরাজনৈতিক ও ভূঅর্থনৈতিক বাস্তবতার গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। তাঁর ভাষ্য, উন্নয়ন সহযোগীদের ঘোষিত নীতি ও বাস্তব কর্মকাণ্ডের মধ্যে এখনো উল্লেখযোগ্য ব্যবধান রয়েছে।
তিনি আরও জানান, মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত বাংলাদেশকে জ্বালানি খাতে ৩৪৬ কোটি মার্কিন ডলার ভর্তুকি দিতে হয়েছে। তবে এই পরিস্থিতিতে অনেক উন্নয়ন সহযোগীর কাছ থেকে প্রত্যাশিত সহায়তা পাওয়া যায়নি। এ কারণে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন তিনি।
দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রসঙ্গ তুলে উপদেষ্টা বলেন, সরকার রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, পুঁজিবাজার ও বন্ড বাজার শক্তিশালী করা এবং বেসরকারি বিনিয়োগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে অর্থায়নের উৎস আরও বৈচিত্র্যময় করার কৌশল বাস্তবায়ন করছে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব ও সঞ্চালনা করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, বহুপক্ষীয় উন্নয়ন অর্থায়ন এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে রয়েছে। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে অবকাঠামো, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক খাতে এই অর্থায়নের সুফল পেয়েছে। তবে এলডিসি থেকে উত্তরণের পথে বৈশ্বিক অর্থায়নের পরিবর্তিত পরিস্থিতি দেশের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
ওইসিডির ‘মাল্টিলেটারাল ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স ২০২৬’ প্রতিবেদনের অন্যতম লেখক লিওনার্দো আলতিয়েরি বলেন, বহুপক্ষীয় উন্নয়ন অর্থায়ন এখন সংকোচনের পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। তাঁর মতে, ২০২৪ সালে এই অর্থায়ন প্রায় ১৫ শতাংশ কমেছে এবং আগামী কয়েক বছরে এ ধারা আরও তীব্র হতে পারে।
ওইসিডির আর্কিটেকচার অ্যান্ড অ্যানালাইসিস ইউনিটের সিনিয়র ইকোনমিস্ট প্রধান অঁরি-বের্নার সোলিনিয়াক-লেকোঁত বলেন, বর্তমানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো এই অর্থায়ন ব্যবস্থাকে কীভাবে টিকিয়ে রাখা যায়। তাঁর মতে, সাহসী ও সুপরিকল্পিত সংস্কার গ্রহণ করা গেলে এখনো পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব।
পাকিস্তানের সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট পলিসি ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আবিদ কাইয়ুম সুলেরি বলেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোর উচিত বহুপক্ষীয় অর্থায়ন ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি এর সুশাসন নিশ্চিত করার দাবি আরও জোরালোভাবে তোলা।
সাউদার্ন ভয়েসের গবেষণা ও উদ্ভাবনবিষয়ক প্রধান ড. প্রত্যুষ শর্মা বলেন, উন্নয়ন সহায়তায় কাটছাঁটের প্রভাব শুধু অর্থায়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল হয়ে মাঠপর্যায়ের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
নেপালের সাউথ এশিয়া ওয়াচ অন ট্রেড, ইকোনমিকস অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ড. পরশ খরেল বলেন, টেকসইভাবে এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য ধারাবাহিক উন্নয়ন সহায়তা অপরিহার্য। কারণ বড় ধরনের অর্থনৈতিক ধাক্কা এলে একটি দেশের অর্জিত উন্নয়নও পিছিয়ে যেতে পারে।
শ্রীলঙ্কার প্রতিনিধি ড. রোশান অ্যান পেরেরা বলেন, সহজ শর্তে উন্নয়ন অর্থায়নের সুযোগ কমে গেলে অনেক দেশ বাধ্য হয়ে উচ্চ সুদের বাণিজ্যিক ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে, যা দীর্ঘমেয়াদে ঋণের চাপ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

