বাংলাদেশের অর্থনীতি ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতার পথে এগোচ্ছে বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক ব্যাংক এইচএসবিসি। সংস্থাটির মতে, বৈশ্বিক কিছু ইতিবাচক অর্থনৈতিক পরিবর্তনের কারণে চলতি বছরের দ্বিতীয়ার্ধে দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে নতুন গতি ফিরতে পারে। একই সঙ্গে চলমান অর্থনৈতিক সংস্কার দেশীয় বিনিয়োগ ও ভোগব্যয় বাড়াতে সহায়ক হবে।
রাজধানী ঢাকায় মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত ‘এইচএসবিসি ইকোনমিক আউটলুক ২০২৬: দ্য বাংলাদেশ পারস্পেকটিভ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন এইচএসবিসির এশিয়া অঞ্চলের প্রধান অর্থনীতিবিদ ফ্রেডেরিক নিউম্যান। পরে বুধবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে অনুষ্ঠানের বিভিন্ন তথ্য প্রকাশ করে এইচএসবিসি বাংলাদেশ।
ফ্রেডেরিক নিউম্যান বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমে আসা, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি ঘিরে অনিশ্চয়তা কিছুটা হ্রাস পাওয়া এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক শক্তিশালী থাকায় বাংলাদেশের রপ্তানি খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প, বছরের দ্বিতীয়ার্ধে ইতিবাচক প্রবণতায় ফিরতে পারে।
তিনি আরও বলেন, দেশে চলমান অর্থনৈতিক সংস্কারের সুফল ধীরে ধীরে বিনিয়োগ ও ভোক্তা ব্যয়ে প্রতিফলিত হবে। এর ফলে চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রায় ৪ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এমপি। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা, বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহী এবং শিল্প খাতের প্রতিনিধিরা। বৈশ্বিক অর্থনীতির পরিবর্তনশীল বাস্তবতায় বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে তারা মতবিনিময় করেন। বিশেষ বক্তব্য দেন এইচএসবিসির এশিয়া অঞ্চলের ইন্টারন্যাশনাল মার্কেটস বিভাগের হেড অব ব্যাংকিং ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর প্রিয়া কিনি। অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন এইচএসবিসি বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহবুব উর রহমান।
অনুষ্ঠানে ‘আস্ক দ্য মিনিস্টার’ শীর্ষক এক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেন মো. মাহবুব উর রহমান। আলোচনায় ঘোষিত বাজেট বাস্তবায়নের অগ্রাধিকার সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং অর্থনীতির প্রতি মানুষের আস্থা পুনর্গঠনই সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। তিনি জানান, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে আরও কার্যকর প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মাধ্যমে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নির্মাণে সরকার কাজ করছে।
রপ্তানি বহুমুখীকরণ নিয়ে আরেক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি, নিয়ন্ত্রক বাধা কমানো, নতুন আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়ানো এবং অর্থনৈতিক অঞ্চল ও বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে নতুন শিল্পখাত বিকাশের পরিবেশ তৈরি করাই হবে এ লক্ষ্য অর্জনের প্রধান উপায়।
মো. মাহবুব উর রহমান বলেন, বাংলাদেশের পরবর্তী উন্নয়নযাত্রা শুধু প্রবৃদ্ধির পরিমাণের ওপর নয়, বরং সেই প্রবৃদ্ধির মান ও স্থায়িত্বের ওপর নির্ভর করবে। বৈশ্বিক ব্যয় বৃদ্ধি ও তারল্য সংকুচিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে শক্তিশালী ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং বৈশ্বিক মূল্যশৃঙ্খলে আরও উচ্চ অবস্থানে পৌঁছানোর সক্ষমতা ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের লক্ষ্য শুধু উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন নয়; একই সঙ্গে বহুমুখী রপ্তানি কাঠামো গড়ে তুলে এমন একটি প্রতিযোগিতামূলক, অভিযোজনক্ষম ও আন্তর্জাতিকভাবে বিশ্বাসযোগ্য অর্থনীতি নির্মাণ করা প্রয়োজন।
প্রিয়া কিনি বলেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বাজারের গতিধারা সম্পর্কে আগাম ধারণা রাখা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি জানান, এইচএসবিসির বৈশ্বিক গবেষণা দলের বিশ্লেষণ, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোকে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, যাতে তারা অনিশ্চয়তা মোকাবিলা করে নতুন ব্যবসায়িক সুযোগ কাজে লাগাতে পারে।
অনুষ্ঠানের সমাপনী পর্বে একটি নেটওয়ার্কিং ডিনারের আয়োজন করা হয়। সেখানে অংশগ্রহণকারীরা বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা, বৈশ্বিক ব্যবসায়িক পরিবেশের পরিবর্তন এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির কৌশল নিয়ে মতবিনিময় করেন।

