একসময় দেশের ইলেকট্রনিক্স ও গৃহস্থালি পণ্যের বাজারে অন্যতম শক্তিশালী ব্র্যান্ড ছিল সিঙ্গার বাংলাদেশ। বিনিয়োগকারীদের কাছেও প্রতিষ্ঠানটি ছিল আস্থার প্রতীক। কিন্তু এক দশকের কিছু বেশি সময়ের ব্যবধানে সেই চিত্র আমূল বদলে গেছে। বিক্রি বাড়লেও মুনাফার জায়গায় দেখা দিয়েছে বড় ধরনের বিপর্যয়। এখন কোম্পানিটিকে সামলাতে হচ্ছে বিপুল লোকসান, বাড়তে থাকা ঋণের চাপ এবং বাজারে কঠিন প্রতিযোগিতার বাস্তবতা।
২০১২ সালে সিঙ্গার বাংলাদেশের বার্ষিক আয় ছিল ৬৭০ কোটি টাকা। ওই বছর কোম্পানিটি কর-পরবর্তী ৪৯ কোটি টাকা মুনাফা করেছিল। কিন্তু ১৩ বছর পর অর্থাৎ ২০২৫ সালে কোম্পানির রাজস্ব বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা হলেও এর বিপরীতে হয়েছে ২২৫ কোটি টাকার নিট লোকসান।
রাজস্ব বৃদ্ধির পরও কেন এমন আর্থিক বিপর্যয়—এ প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে। কারণ কোম্পানির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ২০২৫ সালের জন্য শেয়ারহোল্ডারদের কোনো লভ্যাংশ দিতে পারেনি সিঙ্গার বাংলাদেশ। পুঞ্জীভূত লোকসান কোম্পানির মূলধনের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ায় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারকে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নামিয়ে দিয়েছে।
কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, সিঙ্গারের মূল সংকট তৈরি হয়েছে অর্থায়ন ব্যয়ের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির কারণে। উৎপাদন ও বিক্রি বাড়লেও ঋণের সুদ পরিশোধের চাপ কোম্পানির পরিচালন আয়কে প্রায় পুরোপুরি গ্রাস করেছে। ২০২৫ সালে সিঙ্গার বাংলাদেশের অর্থায়ন ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২২ কোটি টাকা। আগের বছর এই খাতে ব্যয় ছিল ১৪৩ কোটি টাকা। অথচ ওই বছর কোম্পানির পরিচালন মুনাফা ছিল মাত্র ৫৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ সুদ পরিশোধের ব্যয় পরিচালন আয়কে কয়েক গুণ ছাড়িয়ে গেছে।
তুরস্কভিত্তিক বহুজাতিক শিল্পগোষ্ঠী আর্সেলিকের সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানাধীন এই প্রতিষ্ঠানটি ২০২৫ সালে ২২৫ কোটি টাকা নিট লোকসান দেখিয়েছে। এর আগের বছর ২০২৪ সালে লোকসানের পরিমাণ ছিল ৫০ কোটি টাকার কম। এর প্রভাব পড়েছে শেয়ারপ্রতি আয়েও। ২০২৪ সালে শেয়ারপ্রতি লোকসান ছিল ৪ দশমিক ৯১ টাকা। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২ দশমিক ৫৬ টাকায়।
নতুন কারখানা চালুর পরও ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি:
আর্থিক সংকটের মধ্যেও একটি ইতিবাচক দিক ছিল কোম্পানির বিক্রি বৃদ্ধি। নতুন কারখানায় উৎপাদন শুরুর পর ২০২৫ সালে সিঙ্গারের আয় ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে ২ হাজার ১৩৩ কোটি টাকায় পৌঁছায়। একই সময়ে মোট মুনাফাও কিছুটা বেড়েছে। ২০২৪ সালের ৪৭১ কোটি টাকা থেকে ২০২৫ সালে তা হয়েছে ৫১৬ কোটি টাকা।
তবে উৎপাদন খরচ, মূল্যস্ফীতি এবং বাজার প্রতিযোগিতার কারণে মুনাফার হার কমেছে। মোট মুনাফার মার্জিন ২৭ শতাংশ থেকে কমে ২৪ শতাংশে নেমে এসেছে। কোম্পানির বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিযোগিতামূলক বাজার পরিস্থিতির মধ্যেও বর্তমান গ্রস মার্জিন খাতের তুলনায় গ্রহণযোগ্য অবস্থানে রয়েছে।
সিঙ্গারের আর্থিক চাপের অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে স্বল্পমেয়াদি ঋণের ব্যবহার। কারখানা স্থাপন ও ব্যবসা পরিচালনার জন্য প্রতিষ্ঠানটি বড় অঙ্কের ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ২০২৫ সালে ব্যাংক ঋণ ও ওভারড্রাফটসহ কোম্পানির স্বল্পমেয়াদি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩৯৪ কোটি টাকা। আগের বছর এই ঋণের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ১৯১ কোটি টাকা।
কোম্পানিটি কয়েকটি ব্যাংকের সমন্বয়ে গঠিত কনসোর্টিয়ামের মাধ্যমে ঋণ নিয়েছে। এর মধ্যে কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলন থেকে ৩০৫ কোটি টাকা, পূবালী ব্যাংক থেকে ২৪৯ কোটি টাকা, ডাচ-বাংলা ব্যাংক থেকে ১৭৭ কোটি টাকা এবং প্রাইম ব্যাংক থেকে ১০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে।
২০২৫ সালে ঋণ ও লিজের সুদ বাবদ কোম্পানির নগদ অর্থ ব্যয় হয়েছে ২৬৪ কোটি টাকা। বছর শেষে ব্যাংক ওভারড্রাফট সমন্বয়ের পর কোম্পানির নগদ ও সমজাতীয় অর্থের অবস্থান ঋণাত্মক ১ হাজার ৩২৮ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। তবে বিক্রয় থেকে অর্থ আদায়ের সক্ষমতা কিছুটা উন্নত হয়েছে। শেয়ারপ্রতি পরিচালন নগদ প্রবাহ আগের বছরের ঋণাত্মক ৭ দশমিক ৯৬ টাকা থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ধনাত্মক ১৪ দশমিক ৫৬ টাকায় উন্নীত হয়েছে।
সিঙ্গারের আর্থিক দুর্বলতার পেছনে শুধু ঋণের চাপ নয়, বাজার প্রতিযোগিতাও বড় ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্তিশালী অবস্থানের কারণে দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ড সিঙ্গার এখন কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছে। বিশেষ করে ওয়ালটন এবং প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিস্তৃত বাজার উপস্থিতি হোম অ্যাপ্লায়েন্স খাতে প্রতিযোগিতা বাড়িয়েছে। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ফ্রিজের বাজারে ওয়ালটনের আধিপত্য বর্তমানে প্রায় ৭০ শতাংশের কাছাকাছি। অন্যদিকে প্রাণ-আরএফএল তাদের খুচরা বিক্রয় কেন্দ্র বাড়িয়ে গৃহস্থালি পণ্যের বাজারে অবস্থান শক্ত করছে।
২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকেও লোকসানের ধারা:
২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকের আর্থিক ফলাফলও সিঙ্গারের জন্য স্বস্তির বার্তা আনেনি। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে জমা দেওয়া প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি-মার্চ সময়ে কোম্পানির বিক্রি বেড়ে ৫৭৮ কোটি টাকা হয়েছে। আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ৫৫৯ কোটি টাকা।
এই প্রবৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে রপ্তানি থেকে। প্রথম প্রান্তিকে রপ্তানি আয় হয়েছে ২১ দশমিক ৭ কোটি টাকা, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে তা ছিল প্রায় শূন্য। তবে বিক্রি বাড়লেও পরিচালন মুনাফা কমেছে। ১৭ দশমিক ৩ কোটি টাকা থেকে তা নেমে এসেছে ১৫ দশমিক ৮ কোটি টাকায়। কারণ একই সময়ে পরিচালন ব্যয় ১১৯ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১২৭ কোটি টাকা হয়েছে।
ঋণের সুদের চাপও অব্যাহত রয়েছে। প্রথম প্রান্তিকে নিট অর্থায়ন ব্যয় প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়ে ৬৭ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এর ফলে জানুয়ারি-মার্চ সময়ে কোম্পানির নিট লোকসান হয়েছে প্রায় ৫৬ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৩৫ কোটি টাকা। শেয়ারপ্রতি লোকসানও বেড়েছে। আগের বছরের ৩ দশমিক ৫০ টাকা থেকে তা হয়েছে ৫ দশমিক ৬০ টাকা।
সিঙ্গার বাংলাদেশ বলছে, স্বল্পমেয়াদে চ্যালেঞ্জ থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য থেকে তারা সরে যাচ্ছে না। কোম্পানির প্রত্যাশা, নতুন কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লে উৎপাদন খরচ কমবে, স্থানীয় উৎপাদনের পরিমাণ বাড়বে এবং পণ্যের মান উন্নত হবে। এর মাধ্যমে দেশের ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত ও ভোক্তা শ্রেণির চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে।
তবে বর্তমান আর্থিক চাপ কাটিয়ে কোম্পানি কত দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারে, সেটিই এখন বিনিয়োগকারী ও বাজার সংশ্লিষ্টদের প্রধান নজর। সর্বশেষ আর্থিক ফল প্রকাশের পর পুঁজিবাজারেও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ডিএসইতে সিঙ্গারের শেয়ার কেনার আগ্রহ কমে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট আরও স্পষ্ট হয়েছে।

