সরকারি অর্থের সাশ্রয়ী ব্যবহার নিশ্চিত করতে এবং সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে রাখা এবং সীমিত সম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই পরিচালন ও উন্নয়ন বাজেটের একাধিক খাতে ব্যয় স্থগিত বা সীমিত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে অর্থ বিভাগের বাজেট অনুবিভাগ-১-এর উপসচিব মোহাম্মদ জাকির হোসেন স্বাক্ষরিত একটি পরিপত্র গতকাল জারি হয়েছে। নির্দেশনাটি সব সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, রাষ্ট্রায়ত্ত, সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান, পাবলিক সেক্টর করপোরেশন, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানি এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রযোজ্য হবে। পরিপত্র অনুযায়ী, পরিচালন বাজেটের আওতায় সব ধরনের থোক বরাদ্দ থেকে ব্যয় পুরোপুরি বন্ধ থাকবে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ রয়েছে ১ লাখ ২১ হাজার ৫১১ কোটি টাকা।
এ ছাড়া নতুন করে কোনো মোটরযান, জলযান বা আকাশযান কেনা যাবে না। এ খাতে বরাদ্দ রয়েছে ৭ হাজার ৪৪ কোটি টাকা। তবে ১০ বছরের বেশি পুরোনো টিওঅ্যান্ডইভুক্ত যানবাহন প্রতিস্থাপন এবং নতুন সরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য অর্থ বিভাগের অনুমোদন সাপেক্ষে যানবাহন কেনার সুযোগ রাখা হয়েছে। পরিপত্রে আরও বলা হয়েছে, অ্যাম্বুলেন্স ও নিরাপত্তা কাজে ব্যবহৃত যানবাহন ছাড়া অন্য সব নতুন বা প্রতিস্থাপিত সরকারি গাড়ি অবশ্যই পূর্ণ বৈদ্যুতিক (ইলেকট্রিক) হতে হবে।
নতুন আবাসিক, অনাবাসিক কিংবা অন্যান্য ভবন ও স্থাপনা নির্মাণেও আপাতত নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এ খাতে চলতি বাজেটে বরাদ্দ রয়েছে ৬১ হাজার ৭৬২ কোটি টাকা। তবে কোনো নির্মাণকাজের অগ্রগতি ৭০ শতাংশ বা তার বেশি হলে অর্থ বিভাগের অনুমোদন নিয়ে কাজ চালিয়ে যাওয়া যাবে।
পরিচালন বাজেটের আওতায় ভূমি অধিগ্রহণের জন্য বরাদ্দ ৬ হাজার ৭৩৩ কোটি টাকাও আপাতত ব্যয় করা যাবে না। পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তাদের গাড়ি কেনার জন্য সুদমুক্ত বিশেষ অগ্রিম বা ঋণ প্রদানও বন্ধ রাখা হয়েছে। এ খাতে বরাদ্দ রয়েছে ৪৩০ কোটি টাকা।
উন্নয়ন বাজেটের ক্ষেত্রেও নতুন যানবাহন কেনা স্থগিত থাকবে। তবে পরিপত্র জারির আগে অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে এই বিধিনিষেধ শিথিল করা যেতে পারে। একই সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণের ব্যয় প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে অর্থ বিভাগের পূর্বানুমোদন নিয়ে করা যাবে।
এ ছাড়া পরিকল্পনা কমিশনের অনুকূলে ‘বিশেষ প্রয়োজনে উন্নয়ন সহায়তা’ খাতে সরকারের সংরক্ষিত বরাদ্দও অর্থ বিভাগের পূর্বানুমোদনের ভিত্তিতে ব্যয় করা যাবে।
সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের ক্ষেত্রেও নতুন কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। সরকারি অর্থায়নে বিদেশে প্রশিক্ষণ, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও কর্মশালায় অংশগ্রহণ আপাতত বন্ধ থাকবে। তবে বিদেশি সরকার, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয় বা অন্য কোনো দেশের অর্থায়নে মাস্টার্স, পিএইচডি, স্কলারশিপ, ফেলোশিপ এবং বৈদেশিক প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়ার সুযোগ বহাল থাকবে।
এ ছাড়া প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণের বৈদেশিক অংশ উপযুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় বা প্রতিষ্ঠানে আয়োজন করা যাবে। প্রি-শিপমেন্ট ইন্সপেকশন (পিএসআই) ও ফ্যাক্টরি অ্যাকসেপটেন্স টেস্ট (এফএটি)-সংক্রান্ত বিদেশ সফর কেবল জটিল বা বাধ্যতামূলক পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা কারিগরি সনদপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জন্য বিবেচনা করা হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এসব পরীক্ষা সম্পন্ন করার ওপর গুরুত্ব দিতে বলা হয়েছে।
পরিপত্রে শেষ পর্যন্ত সব সরকারি সংস্থাকে পরিচালন ও উন্নয়ন বাজেটের অন্যান্য খাতেও সর্বোচ্চ মিতব্যয়িতা অনুসরণ এবং সরকারি অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

