আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল রোববার থেকে বাংলাদেশ সফর শুরু করতে যাচ্ছে। আইএমএফের বাংলাদেশ মিশন প্রধান ইভো ক্রজনারের নেতৃত্বে পাঁচ দিনের এই সফরে সরকারের অর্থনৈতিক নীতি, রাজস্ব আদায়, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং সম্ভাব্য নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে ধারাবাহিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, প্রতিনিধিদল আগামী বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বাংলাদেশে অবস্থান করবে। এ সময় প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং সরকারের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের একাধিক বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
সফরের প্রথম দিন অর্থ বিভাগের সঙ্গে দুই দফা বৈঠক নির্ধারিত রয়েছে। প্রথম বৈঠকে সম্ভাব্য নতুন ঋণ চুক্তির বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হবে। পাশাপাশি নতুন বাজেট, রাজস্ব ঘাটতি, রাজস্ব নীতি ও সংস্কার, মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো এবং অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক অর্থায়নের পরিকল্পনাও আলোচনায় স্থান পাবে।
দ্বিতীয় বৈঠকে সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি, নতুন জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের অর্থায়ন এবং এ-সংক্রান্ত সরকারি ব্যয় পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া ব্যাংক খাতের সুশাসন এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পরিস্থিতিও আলোচ্যসূচিতে থাকবে।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদের মতে, অতীতের ঋণ কর্মসূচিতে আইএমএফ রাজস্ব আদায় বৃদ্ধির শর্ত দিলেও নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণ করা সম্ভব হয়নি। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় যেমন লক্ষ্য অর্জিত হয়নি, তেমনি পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারও প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী রাজস্ব আদায় বাড়াতে পারেনি। তাঁর ভাষ্য, বর্তমান সরকার যদি নতুন ঋণ চুক্তির দিকে এগোতে চায়, তাহলে রাজস্ব আদায়ের বাস্তবসম্মত সক্ষমতার বিষয়ে আইএমএফকে বিশ্বাসযোগ্য নিশ্চয়তা দিতে হবে। কারণ বর্তমানে রাজস্ব ঘাটতির পাশাপাশি নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের আর্থিক চাপও রয়েছে।
আইএমএফের পর্যবেক্ষণেও অতীতের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ঘাটতির বিষয়টি উঠে এসেছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে এনবিআরের জন্য প্রথমে ৩ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরে তা কমিয়ে ৩ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা করা হলেও শেষ পর্যন্ত আদায় হয় ৩ লাখ ৩১ হাজার ৫০২ কোটি টাকা।
পরবর্তী ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ বাড়িয়ে ৮ দশমিক ৩ শতাংশে উন্নীত করার শর্ত দেয় আইএমএফ। এ লক্ষ্য অর্জনে প্রায় ৬৫ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব প্রয়োজন হলেও তা অর্জিত হয়নি। একইভাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শেষে কর-জিডিপি অনুপাত ৮ দশমিক ৮ শতাংশে উন্নীত করা এবং ৭৩ হাজার কোটির বেশি অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যও পূরণ করতে পারেনি এনবিআর।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত ৯ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর জন্য অতিরিক্ত প্রায় ৯৬ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব সংগ্রহের পরিকল্পনা ছিল। তবে সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত কমে প্রায় ৮ শতাংশে নেমে এসেছে এবং অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের পরিবর্তে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা। এমন পরিস্থিতিতে চলতি অর্থবছরে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের কৌশল সম্পর্কে সরকারের ব্যাখ্যা জানতে চেয়েছে আইএমএফ।
আইএমএফ আরও জানতে চেয়েছে, নতুন জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের উৎস কী হবে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এ বিষয়টিও এবারের বৈঠকে বিশেষ গুরুত্ব পাবে। একই সঙ্গে সব পণ্যে অভিন্ন ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপের পরিকল্পনা নিয়েও আলোচনা হতে পারে।
এর আগে গত ৯ জুলাই অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী রাজস্ব পরিস্থিতি নিয়ে এনবিআর কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে তিনি আশা প্রকাশ করেন, চলতি অর্থবছরে এনবিআর নির্ধারিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে সক্ষম হবে।
আইএমএফের সঙ্গে বৈঠকের জন্য প্রস্তুত করা অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে সরকারের পক্ষ থেকে অর্থনীতির সাম্প্রতিক ইতিবাচক দিকগুলোও তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠনের পর দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ছে। বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরায় চালুর জন্য ধাপে ধাপে ৬০ হাজার কোটি টাকার অর্থায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে এবং সরকারি মালিকানাধীন ৪৪টি কারখানা বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সরকারের ধারণা, এসব উদ্যোগ সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বাজার ব্যবস্থাপনায় সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতি হলে রাজস্ব আদায়ও বাড়বে। পাশাপাশি চলতি অর্থবছরের অপ্রত্যাশিত ব্যয়ের জন্য রাখা বরাদ্দ থেকে ধাপে ধাপে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের পরিকল্পনা আইএমএফকে জানানো হবে। সরকার নতুন ঋণ কর্মসূচির আওতায় আইএমএফের কাছ থেকে ৪৫০ থেকে ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ পাওয়ার প্রত্যাশা করছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, নতুন ঋণ পেতে হলে সরকারকে রাজস্ব আদায়ের বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা এবং নতুন পে-স্কেলের অর্থায়নের বিশ্বাসযোগ্য রূপরেখা উপস্থাপন করতে হবে। তাঁর ধারণা, রাজস্ব প্রশাসনের সংস্কার এবং ব্যাংকিং খাতের সুশাসন নিয়েও আইএমএফ বিস্তারিত আলোচনা করবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সরকার যে পদক্ষেপ নিয়েছে, তাও প্রতিনিধিদলের সামনে তুলে ধরা হবে। কোন প্রকল্প বাতিল করা হচ্ছে, কেন বাতিল করা হচ্ছে এবং চলমান ও নতুন প্রকল্পের বাস্তবায়ন গতি বাড়াতে কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে—এসব বিষয়ও আলোচনায় থাকবে।
মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সরকারি প্রকল্পে অনিয়ম কমাতে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা ড্যাশবোর্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেখানে প্রতিটি প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়মিত হালনাগাদ করা হবে এবং বাস্তবায়নে বিলম্বের কারণও উল্লেখ থাকবে। এর মাধ্যমে প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা আরও জোরদার করার লক্ষ্য নিয়েছে সরকার।

