আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যবসায়িক পরিবেশ চাঙা করতে কর ছাড়, বিভিন্ন প্রণোদনা এবং বিনিয়োগবান্ধব বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের প্রত্যাশা, এসব পদক্ষেপের ফলে বেসরকারি খাত নতুন করে বিনিয়োগে উৎসাহিত হবে।
তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু কর কমিয়ে বিনিয়োগে গতি আনা সম্ভব নয়। কারণ ব্যবসার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়নের ব্যয় এখনো অনেক বেশি, পাশাপাশি ব্যাংকিং খাত ও সামগ্রিক ব্যবসা পরিবেশের নানা সীমাবদ্ধতা বিনিয়োগ সিদ্ধান্তকে কঠিন করে তুলছে।
তাদের ভাষ্য, কোনো প্রতিষ্ঠান নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় শুধু করের হার বিবেচনা করে না। অর্থায়নের খরচ, জ্বালানি সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা, ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বাজারে ভোক্তা চাহিদাসহ একাধিক বিষয় একসঙ্গে মূল্যায়ন করা হয়।
বাজেটে কর-সংক্রান্ত কিছু সুবিধা দেওয়ায় প্রতিষ্ঠানের পরিচালন ব্যয় কিছুটা কমতে পারে। কিন্তু ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানকে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়। বর্তমানে কার্যকরী মূলধনের ঋণে প্রায় ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত সুদ দিতে হচ্ছে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের কিস্তির চাপও অনেক প্রতিষ্ঠানের নগদ অর্থপ্রবাহকে সংকুচিত করছে।
ফলে কর ছাড় থেকে যে আর্থিক সুবিধা পাওয়া যায়, উচ্চ সুদের ঋণের কারণে তার বড় একটি অংশই কার্যত হারিয়ে যায়। অর্থনীতিবিদদের মতে, এ পরিস্থিতিতে করের তুলনায় অর্থায়নের ব্যয়ই বিনিয়োগের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ ছাড়া ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৪ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে এসেছে। এর পেছনে শুধু উচ্চ সুদের হার নয়, খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণে অনীহাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বর্তমানে মোট ঋণের ৩২ শতাংশেরও বেশি শ্রেণিকৃত বা খেলাপি ঋণ। ফলে অনেক ব্যাংক দীর্ঘমেয়াদি শিল্পঋণ দেওয়ার পরিবর্তে তারল্য ধরে রাখতে বেশি আগ্রহী হচ্ছে। এতে নতুন উদ্যোক্তা ও বিদ্যমান ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন পাওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়ছে।
অর্থনীতিবিদরা আরও বলছেন, বাজেটে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ থাকলেও দীর্ঘদিনের জ্বালানি সংকট কিংবা উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে দুর্বল হয়ে পড়া ভোক্তা চাহিদার মতো মৌলিক সমস্যাগুলোর কার্যকর সমাধান এতে উঠে আসেনি। এসব বিষয়ও বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে বড় প্রভাব ফেলছে।
এদিকে রাজস্ব আহরণ লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী না হলে সরকারকে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে আরও বেশি ঋণ নিতে হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের প্রাপ্যতা আরও কমে যেতে পারে, যা নতুন বিনিয়োগে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।
সামগ্রিকভাবে অর্থনীতিবিদদের মূল্যায়ন হলো, কর ছাড় ও প্রণোদনা বিনিয়োগে ইতিবাচক বার্তা দিলেও উচ্চ ঋণব্যয়, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, সীমিত ঋণপ্রবাহ এবং ব্যবসা পরিবেশের বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ দূর না হলে বেসরকারি বিনিয়োগে উল্লেখযোগ্য গতি ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে।

