সরকারি অর্থের অপচয়, অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। ব্যয় ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে উন্নয়ন ও পরিচালন ব্যয়সহ সরকারি কেনাকাটার প্রতিটি ধাপে কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে দ্রুত তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
অর্থ বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগে এ-সংক্রান্ত নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে। নির্দেশনায় সরকারি প্রকল্প ও ক্রয় কার্যক্রমে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন কঠোরভাবে অনুসরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কোনো প্রকল্পের বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পরিচালকদের তাৎক্ষণিকভাবে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়ার বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া হবে।
নীতিনির্ধারকদের মতে, এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য কেবল ব্যয় কমানো নয়; বরং দুর্নীতির সুযোগ সংকুচিত করা, অপ্রয়োজনীয় অপচয় বন্ধ করা এবং সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা। সরকারের ধারণা, ব্যয় নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি অপচয় ও দুর্নীতি কমানো গেলে মূল্যস্ফীতির চাপও কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, অতীতে প্রকৃত প্রয়োজন যাচাই না করেই বিভিন্ন ব্যয় অনুমোদন, অতিমূল্যে পণ্য ও সেবা ক্রয়, প্রকল্প ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি এবং দীর্ঘসূত্রতার কারণে সরকারের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় তাই প্রতিটি ব্যয়ের আগে প্রয়োজনীয়তা, ব্যয়ের যৌক্তিকতা, বাজারদর, বিকল্প ব্যবস্থা এবং সম্ভাব্য সুফল মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বড় অঙ্কের ব্যয়ের ক্ষেত্রে একাধিক স্তরে পর্যালোচনা ও অনুমোদনের ব্যবস্থাও আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে।
সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে দরপত্র মূল্যায়ন, সরবরাহকারীর সক্ষমতা যাচাই, বাজারমূল্য বিশ্লেষণ এবং প্রচলিত আর্থিক বিধিমালা অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা, আর্থিক তদারকি এবং ডিজিটাল পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, কেবল কৃচ্ছ্রসাধনের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া সম্ভব নয়। এর জন্য সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় সুশাসন প্রতিষ্ঠা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনীতিবিদ ড. জাহির হোসেন বলেন, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, জবাবদিহি এবং কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা গেলে সরকারি অর্থের অপচয় কমবে, প্রকল্প বাস্তবায়নের দক্ষতা বাড়বে এবং জনগণের করের অর্থ আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে। তাঁর মতে, আর্থিক খাতের সংস্কার তখনই সফল হবে, যখন একই নিয়ম সব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করা হবে এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নীতিনির্ধারকদের ভাষ্য, দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে শুধু রাজস্ব আয় বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়; সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনাকেও শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে হবে। সে লক্ষ্যেই সরকারি অর্থ ব্যবহারের প্রতিটি ধাপে জবাবদিহি নিশ্চিত করা, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো, দুর্নীতির সুযোগ সীমিত করা এবং দক্ষ আর্থিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অর্থ বিভাগের মতে, এটি কেবল স্বল্পমেয়াদি কৃচ্ছ্রসাধন কর্মসূচি নয়; বরং সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় নতুন সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার একটি প্রচেষ্টা। লক্ষ্য হলো—প্রতিটি ব্যয় হবে প্রয়োজনভিত্তিক, প্রতিটি সরকারি কেনাকাটা হবে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় এবং প্রতিটি সিদ্ধান্তে জনগণের অর্থের সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত করা। এর মাধ্যমে আর্থিক শৃঙ্খলা জোরদারের পাশাপাশি সরকারের সংস্কার কার্যক্রমও আরও গতিশীল হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
গত ৮ জুলাই অর্থ বিভাগ জারি করা এক পরিপত্রে মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের জন্য একাধিক কৃচ্ছ্রসাধনমূলক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এতে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় সীমিত করার পাশাপাশি সরকারি ক্রয় ও উন্নয়ন ব্যয়ে কঠোর আর্থিক নিয়ন্ত্রণ আরোপের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিপত্র অনুযায়ী, আপাতত নতুন মোটরযান, জলযান ও আকাশযান কেনা স্থগিত থাকবে। সরকারি অর্থায়নে বিদেশ সফরও সীমিত করা হয়েছে। পরিচালন বাজেট থেকে নতুন ভবন নির্মাণ বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে যেসব প্রকল্পের কাজ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে, সেগুলো বিশেষ অনুমোদনের মাধ্যমে সম্পন্ন করার সুযোগ রাখা হয়েছে।
সরকারের ভাষ্য, এসব পদক্ষেপের লক্ষ্য উন্নয়ন কার্যক্রম থামিয়ে দেওয়া নয়; বরং সীমিত সরকারি সম্পদের সর্বোচ্চ ও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং অগ্রাধিকারভিত্তিক খাতে ব্যয় বাড়ানোর মাধ্যমে অর্থ ব্যবস্থাপনাকে আরও দায়িত্বশীল ও স্বচ্ছ করে তোলা।

