চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারের নির্ধারিত ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রেকর্ড রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণের দায়িত্ব এখন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাঁধে। ঠিক এমন সময়েই সংস্থাটির নেতৃত্বে এসেছে পরিবর্তন। প্রায় ৫৩ বছর পর এনবিআরের নিজস্ব ক্যাডার থেকে চেয়ারম্যান নিয়োগ পাওয়ায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ইতিবাচক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
এনবিআর সূত্র জানায়, সাবেক চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান কর প্রশাসনের বিভিন্ন সেবা ধাপে ধাপে ডিজিটাল করার পরিকল্পনা রেখে গেছেন। নতুন চেয়ারম্যান আহসান হাবিবও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে কর প্রশাসনের আধুনিকীকরণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। তবে শুধু প্রযুক্তিনির্ভর সেবা চালু করাই নয়, তাঁর সামনে আরও বড় দুটি চ্যালেঞ্জ রয়েছে—সরকারের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং সাম্প্রতিক সময়ে সংস্থার ভেতরে তৈরি হওয়া বিভক্তি দূর করে কার্যকর কর্মপরিবেশ ফিরিয়ে আনা।
সরকারের উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, অবকাঠামো নির্মাণ এবং বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমাতে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বৃদ্ধিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে এনবিআর। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ কম রাজস্ব আদায় হয়েছে। এবার সেই ঘাটতি কমাতে কর প্রশাসনের দক্ষতা বাড়ানো, কর ফাঁকি নিয়ন্ত্রণ, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং করদাতাবান্ধব সেবা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে প্রতিটি কর অঞ্চল ও কাস্টমস কমিশনারেটের জন্য বাস্তবসম্মত কর্মসম্পাদন সূচক (কেপিআই) নির্ধারণ, মাসভিত্তিক রাজস্ব মূল্যায়ন, ঝুঁকিভিত্তিক অডিট এবং তথ্য বিশ্লেষণনির্ভর ব্যবস্থাপনা জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
করদাতাদের জন্য একটি সমন্বিত অনলাইন প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে চায় এনবিআর। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কর নিবন্ধন, রিটার্ন জমা, কর পরিশোধ, রিফান্ড, আপিল, ট্যাক্স ক্লিয়ারেন্স, ভ্যাট এবং কাস্টমস-সংক্রান্ত সব ধরনের সেবা অনলাইনে পাওয়া যাবে। এ ছাড়া স্বয়ংক্রিয় তথ্য আদান-প্রদান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ঝুঁকি বিশ্লেষণ, ই-অডিট এবং সমন্বিত ডেটা ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। এতে করদাতাদের সময় ও ব্যয় কমবে, হয়রানি হ্রাস পাবে এবং সেবার স্বচ্ছতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
নতুন চেয়ারম্যান এমন একটি কর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চান, যেখানে আইন হবে সহজ, পূর্বানুমানযোগ্য এবং বিনিয়োগবান্ধব। বিশেষ করে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স, ভ্যাট ব্যবস্থাপনা এবং কর-সংক্রান্ত অনুমোদন দ্রুত ও ডিজিটাল করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে কর আদায় এবং ব্যবসা পরিচালনার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোও রাজস্ব প্রশাসনে স্থিতিশীলতা ও দক্ষতা বৃদ্ধির আহ্বান জানিয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে কর-জিডিপি অনুপাত এখনও কম। বিপুলসংখ্যক সম্ভাব্য করদাতা এখনো কর ব্যবস্থার বাইরে থাকায় বিদ্যমান করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। এই পরিস্থিতি বদলাতে ব্যাংকিং তথ্য, ভূমি নিবন্ধন, যানবাহন, শেয়ারবাজার, মোবাইল আর্থিক সেবা, ই-কমার্স এবং অন্যান্য সরকারি তথ্যভান্ডার সমন্বিতভাবে ব্যবহার করে নতুন করদাতা শনাক্তের উদ্যোগ নেওয়া হবে। বিশেষভাবে উচ্চ আয়ের পেশাজীবী, ডিজিটাল উদ্যোক্তা, অনলাইন ব্যবসায়ী এবং করের আওতার বাইরে থাকা সম্ভাব্য করদাতাদের অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এনবিআরের পরিকল্পনায় কর আদায়ের মূলনীতি হবে—যার সক্ষমতা বেশি, তার করও বেশি। সৎ করদাতারা যাতে হয়রানির শিকার না হন এবং কর ফাঁকিদাতারা যাতে ছাড় না পান, সে লক্ষ্যেই ঝুঁকিভিত্তিক অডিট, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর যাচাই এবং স্বয়ংক্রিয় রিটার্ন বিশ্লেষণ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করা হবে। পাশাপাশি অভিযোগ নিষ্পত্তি, দ্রুত আপিল প্রক্রিয়া, কর শিক্ষা এবং করদাতাবান্ধব সেবা কেন্দ্রের মাধ্যমে আস্থাভিত্তিক কর সংস্কৃতি গড়ে তোলার উদ্যোগও রয়েছে।
প্রতিবছর কর ফাঁকি ও অবৈধ অর্থপ্রবাহের কারণে সরকার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সম্ভাব্য রাজস্ব হারাচ্ছে। এ কারণে গোয়েন্দা ও তদন্ত কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিগ ডেটা বিশ্লেষণ, ইলেকট্রনিক লেনদেন পর্যবেক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক তথ্য বিনিময় ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ানো হবে। বিশেষ করে ভুয়া ইনভয়েস, আন্ডার-ইনভয়েসিং, ওভার-ইনভয়েসিং, বেনামি সম্পদ, ডিজিটাল ব্যবসা এবং উচ্চমূল্যের আর্থিক লেনদেন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে।
চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ৫ জুলাই এবং পরে আরেক দফা ভার্চ্যুয়াল বৈঠকে সারাদেশের প্রায় ৫০০ কর্মকর্তা অংশ নেন। এসব বৈঠকে সহকারী কমিশনার থেকে সদস্য পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে আহসান হাবিব কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, অতীতের মতভেদ ভুলে আয়কর ও শুল্ক ক্যাডারের সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। ভবিষ্যতে কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন হবে মেধা, সততা ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে। তিনি সতর্ক করে বলেন, করদাতাকে হয়রানি কিংবা দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে দায়িত্ব পালনে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সহায়তার আশ্বাসও দেন তিনি।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আব্দুল মজিদ মনে করেন, চেয়ারম্যান নিয়োগকে ব্যক্তিগত অর্জন বা হতাশার বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তাঁর ভাষ্য, এটি রাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পদ। তিনি বলেন, এতদিন অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিবরাই এনবিআরের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এবার প্রথমবারের মতো এনবিআরের নিজস্ব কর্মকর্তা এই দায়িত্ব পেয়েছেন। ফলে তাঁকে নিজের সহকর্মীদের নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি তাদের আস্থা অর্জনেরও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।
রাজস্ব আদায়ের পাশাপাশি এনবিআরের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ স্বাভাবিক করাও নতুন চেয়ারম্যানের বড় দায়িত্ব হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে গত বছরের মে-জুনে কর্মকর্তাদের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছিল। সে সময় আহসান হাবিব কমিশনার থেকে সদস্য এবং পরে চেয়ারম্যানের দায়িত্বে আসেন। আন্দোলনের সময় তিনি ভিন্ন অবস্থানে ছিলেন বলে সংস্থার ভেতরে কিছু উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। তবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ধারাবাহিক বৈঠকের মাধ্যমে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানানোকে অনেক কর্মকর্তা ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
আহসান হাবিব বলেন, সরকারের ঘোষিত বাজেট সফলভাবে বাস্তবায়নই এনবিআরের প্রধান দায়িত্ব। তাঁর ভাষায়, সততা, দক্ষতা, আন্তরিকতা এবং দেশপ্রেমকে ভিত্তি করে সব কর্মকর্তা একসঙ্গে কাজ করলে নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব।

