বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান (এসওই) ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলোর ঋণ দায় সরকারের জন্য বড় আর্থিক উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। সর্বশেষ অর্থবছর পর্যন্ত এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য সরকারের দেওয়া সার্বভৌম গ্যারান্টির আওতায় মোট দায় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০ হাজার ১২ কোটি টাকা।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) এবং সরকারি সার কোম্পানিগুলোর বড় অঙ্কের দেশি-বিদেশি ঋণের কারণেই এই দায় দ্রুত বেড়েছে। তাদের আশঙ্কা, এ পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি তৈরি করছে।
এ বিষয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও স্বাধীন গবেষণাও সতর্কবার্তা দিয়েছে। বিশ্বব্যাংক ও পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) যৌথভাবে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অদক্ষতা, পরিচালনাগত দুর্বলতা এবং ভর্তুকির কারণে এক অর্থবছরেই সরকারি কোষাগার থেকে প্রায় ৮৮ হাজার ২০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে।
গবেষণায় বলা হয়, এই ব্যয়ের পরিমাণ দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১ দশমিক ৭ শতাংশের সমান। ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বরাদ্দের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় ঋণ গ্যারান্টির সবচেয়ে বড় অংশ তিনটি খাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। এগুলো হলো বিদ্যুৎ, বিমান পরিবহন এবং কৃষিতে ব্যবহৃত সার উৎপাদন ও আমদানি। এর মধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত সবচেয়ে বড় ঝুঁকির উৎস। বিতর্কিত বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা চার্জ এবং বিভিন্ন প্রকল্পের বিলম্বের কারণে সরকারকে বিপুল অঙ্কের গ্যারান্টি দিতে হয়েছে।
পটুয়াখালী, পায়রা ও রামপালের ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ ১৬টি বড় প্রকল্পে সরকারের দেওয়া গ্যারান্টির পরিমাণ ৪১ হাজার ৬৯০ কোটি টাকার বেশি। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদবিষয়ক মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানান, এসব প্রকল্পে সরকারের দেওয়া সার্বভৌম গ্যারান্টির কারণে চুক্তিগুলো সহজে পরিবর্তন বা বাতিল করা সম্ভব নয়। ফলে বিলম্বজনিত জরিমানা ও সক্ষমতা চার্জ পরিশোধের ক্ষেত্রেও সরকারের দায় থেকে যাচ্ছে।
সরকারি গ্যারান্টির দ্বিতীয় বৃহৎ অংশ রয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ক্ষেত্রে। নতুন উড়োজাহাজ ও ইঞ্জিন সংগ্রহসহ ১৫টি প্রকল্পের বিপরীতে সংস্থাটির মোট দায় দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০ হাজার ৯০৯ কোটি টাকা। সরকারি সহায়তা থাকা সত্ত্বেও পরিচালনাগত দুর্বলতা এবং প্রত্যাশিত আয় অর্জনে ব্যর্থতার কারণে বিমানকে এখনও উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের তালিকায় রাখা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামা সামলে কৃষকদের কাছে সার সরবরাহ অব্যাহত রাখতে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) এবং অন্যান্য সরকারি সার প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রায় ৬ হাজার ৪৩৮ কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি দেওয়া হয়েছে। তবে ব্যয়বহুল আমদানি এবং ভর্তুকিনির্ভর বিক্রয় ব্যবস্থার কারণে এসব প্রতিষ্ঠান নিজেদের আয় থেকে ঋণ পরিশোধে সক্ষম হচ্ছে না বলে অর্থ বিভাগের সর্বশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থ বিভাগের মূল্যায়নে দেখা গেছে, দেশের ৮১ শতাংশের বেশি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বর্তমানে মাঝারি থেকে অত্যন্ত উচ্চ আর্থিক ঝুঁকির মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের তুলনামূলক সূচকে দেখা যায়, সম্পদের ওপর মুনাফার (আরওএ) দিক থেকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেক পিছিয়ে। যেখানে ভারতের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর আরওএ ৯ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ভিয়েতনামের ১১ দশমিক ৯ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশের অ-আর্থিক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর আরওএ ঋণাত্মক ৫ দশমিক ২ শতাংশ।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, কর-জিডিপি অনুপাত কমে যাওয়া, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের চাপের মধ্যে সরকার রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টির অপব্যবহার কমাতে নতুন পদক্ষেপ নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে রাষ্ট্রীয়, স্বায়ত্তশাসিত ও সরকার-নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানের জন্য দেওয়া সব ধরনের সার্বভৌম ঋণ গ্যারান্টির বিপরীতে ০ দশমিক ২৫ শতাংশ অগ্রিম ফি আরোপ করা হয়েছে। একই সঙ্গে গ্যারান্টির ওপর অতিরিক্ত জরিমানার ব্যবস্থাও চালু করা হচ্ছে, যাতে অপ্রয়োজনীয়ভাবে সরকারি গ্যারান্টির ওপর নির্ভরতা কমে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, এখন পর্যন্ত কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সরকারের গ্যারান্টিপ্রাপ্ত ঋণে খেলাপি হয়নি। তবে ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা বাড়াতে বিদ্যমান নীতিমালা সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
যদিও সাময়িকভাবে কিছু ঋণ পরিশোধের কারণে মোট গ্যারান্টিযুক্ত দায় কিছুটা কমেছে, তবু অর্থনীতিবিদদের মতে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সুশাসন ও করপোরেট ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের সংস্কার ছাড়া এই ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি দায় ভবিষ্যতে জাতীয় অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি হয়েই থাকবে।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ বলেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সরকারের সার্বভৌম গ্যারান্টি দেওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে যেসব প্রকল্প থেকে ভালো অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া যাবে, কেবল সেসব ক্ষেত্রেই এমন গ্যারান্টি দেওয়া উচিত। তার মতে, কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বা দুর্বল কর্মসূচিতে সরকারি গ্যারান্টি অব্যাহত থাকলে দেশের আর্থিক সুশাসন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ঋণমান বা ক্রেডিট রেটিংও নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হতে পারে।

