বাংলাদেশ ব্যাংক ৩০ জুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথমার্ধের (জুলাই-ডিসেম্বর) জন্য নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে। আগের অবস্থান বহাল রেখে এবারও নীতি সুদহার ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা কমানো হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই সিদ্ধান্তের মূল লক্ষ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা, তবে একই সঙ্গে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও প্রবৃদ্ধির গতি ধরে রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
মুদ্রানীতি একটি দেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত দলিল। এর মাধ্যমে মুদ্রা সরবরাহ, ঋণপ্রবাহ, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক সম্পদের ব্যবস্থাপনা এবং সামগ্রিক আর্থিক প্রবাহের দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক বছরে দুইবার—জানুয়ারি-জুন এবং জুলাই-ডিসেম্বর মেয়াদের জন্য—এই নীতি প্রকাশ করে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান লক্ষ্য থাকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা। তবে একই সময়ে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়। নতুন মুদ্রানীতিতেও সেই ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা দেখা গেলেও বাস্তব পরিস্থিতি এখনো বেশ কঠিন।
গত চার বছর ধরে বাংলাদেশ ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে। কিন্তু তাতেও মূল্যস্ফীতি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নামানো সম্ভব হয়নি। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে পৌঁছায়। জুনে তা সামান্য কমে ৯ দশমিক ১৬ শতাংশে নেমে এলেও সরকারের নির্ধারিত ৭ দশমিক ৫ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এটি এখনও প্রায় দুই শতাংশ বেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, মূল্যস্ফীতির পেছনে শুধু অতিরিক্ত অর্থ সরবরাহ দায়ী নয়। জ্বালানি তেল ও এলএনজির মূল্য বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা মূল্যস্ফীতিকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। ফলে শুধু নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখা বা পরিবর্তন করেই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। বাজারে প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ বাড়ানো এবং উৎপাদন খাতকে শক্তিশালী করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এ কারণে অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন, উৎপাদনমুখী শিল্পে ঋণপ্রবাহ সহজ করা প্রয়োজন। এতে একদিকে শিল্প উৎপাদন বাড়বে, অন্যদিকে বাজারে পণ্যের সরবরাহ বৃদ্ধি পেয়ে মূল্যস্ফীতির চাপও কমতে পারে। পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও গতিশীল হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। নতুন মুদ্রানীতিতে আগামী ছয় মাসের জন্য বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। অন্যদিকে সরকারের ব্যাংক ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছে ১৭ শতাংশ।
তবে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৫ শতাংশ। অথচ চলতি বছরের জানুয়ারি-জুন মেয়াদের মুদ্রানীতিতে ৮ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, যা কোনো মাসেই অর্জিত হয়নি। সেই অভিজ্ঞতার কারণে নতুন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন নিয়েও সংশয় প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নীতি সুদহার ১০ শতাংশে বহাল থাকায় ঋণের ব্যয়ও তুলনামূলক বেশি থাকবে। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক আমানত ও ঋণের সুদহারের ব্যবধান বা স্প্রেড সর্বোচ্চ ৪ শতাংশে রাখার নির্দেশনা দিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে শক্তিশালী ও সুশাসনসম্পন্ন ব্যাংকগুলো তুলনামূলক কম সুদে ঋণ দেওয়ার সুযোগ পেতে পারে।
তবে এর কিছু নেতিবাচক দিকও রয়েছে। স্প্রেড সীমিত হওয়ায় অনেক ব্যাংক ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হতে পারে। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচি ও প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল এই ঘাটতি কিছুটা পূরণে সহায়ক হতে পারে। অন্যদিকে অনেক অর্থনীতিবিদের মত, সুদের হার নির্ধারণে প্রশাসনিক সীমা আরোপের পরিবর্তে বাজারভিত্তিক প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে গ্রাহকদের জন্য বেশি উপকারী হতে পারে।
বর্তমানে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ শিল্প ও ব্যবসা খাতে নতুন বিনিয়োগের চাহিদা দুর্বল থাকা। উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে উৎসাহ বাড়াতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। উৎপাদনের পরিবেশ উন্নত হলে ঋণের চাহিদাও বাড়বে এবং অর্থনীতির গতি ফিরে আসতে পারে।
নতুন সরকারের প্রথম বাজেট, নতুন গভর্নরের প্রথম মুদ্রানীতি এবং অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের নানা উদ্যোগ নিয়ে ইতিবাচক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন—এই তিনটি লক্ষ্য একসঙ্গে বাস্তবায়নই আগামী মাসগুলোতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয়ে থাকবে।
- লেখক: আনোয়ার ফারুক তালুকদার: ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক

