চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে দেশের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক অঞ্চল ন্যাশনাল স্পেশাল ইকোনমিক জোন (এনএসইজেড)-এর তিনটি সাব-জোন উন্নয়নে ১ হাজার ৯১৮ কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)। শিল্পকারখানা স্থাপনের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করতে এসব এলাকায় অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
‘ন্যাশনাল স্পেশাল ইকোনমিক জোন প্রকল্পের সাব-জোন ৬, ১১ ও ১২-এর অবকাঠামো উন্নয়ন’ শীর্ষক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় ১ হাজার ২৯২ দশমিক শূন্য ৮ একর জমিতে উন্নয়নকাজ করা হবে। এসব জমিতে ইতোমধ্যে বিনিয়োগকারীদের শিল্প প্লট বরাদ্দ দেওয়া হলেও রাস্তা, বিদ্যুৎ ও গ্যাসসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবে কারখানা স্থাপন শুরু করা সম্ভব হয়নি বলে ডিপিপিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এনএসইজেডের জন্য এরই মধ্যে প্রায় ৫ হাজার ৭৫৫ কোটি টাকার পাঁচটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বেজা। এর মধ্যে নতুন করে আরও বড় প্রকল্প নেওয়ার উদ্যোগ সরকারি বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা ও প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। নতুন প্রকল্প গ্রহণের আগে চলমান প্রকল্পগুলোর দ্রুত সমাপ্তি এবং বিদ্যমান বিনিয়োগের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। এতে সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার ও বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা বজায় থাকবে।
প্রস্তাবিত প্রকল্পে সাব-জোনগুলোতে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নে ৩৫ দশমিক ২৬ কিলোমিটার সড়ক, ৪৯ দশমিক ৩৬ কিলোমিটার ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং ৫১ দশমিক ১১ কিলোমিটার ফুটপাত নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি সেতু নির্মাণের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ আরও উন্নত করার কথা বলা হয়েছে।
শিল্পকারখানার জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সুবিধা নিশ্চিত করতে ২২ কিলোমিটার গ্যাস বিতরণ নেটওয়ার্ক, দুটি ডিস্ট্রিক্ট রেগুলেটিং স্টেশন (ডিআরএস), ২১ দশমিক ১৫ কিলোমিটার বিদ্যুৎ নেটওয়ার্ক এবং তিনটি সাবস্টেশন স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া শিল্প ব্যবহারের উপযোগী করতে ১১ লাখ ৩০ হাজার ঘনমিটার জমি উন্নয়ন করা হবে। জোনে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য দুটি আবাসিক ভবন এবং একটি কমপ্লেক্স এলাকাও নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে। ডিপিপিতে বলা হয়েছে, কারখানা স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক সুবিধা নিশ্চিত করে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করাই এ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য।
চট্টগ্রাম বন্দরের কাছাকাছি মিরসরাইয়ে গড়ে উঠছে দেশের বৃহত্তম এই অর্থনৈতিক অঞ্চল। এনএসইজেডের জন্য প্রায় ১৭ হাজার একর জমি অধিগ্রহণ বা বরাদ্দ নেওয়া হয়েছে। মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী পুরো অঞ্চলটিকে ৩০টি সাব-জোনে ভাগ করা হয়েছে।
বেজার আশা, এই অর্থনৈতিক অঞ্চল চালু হলে চট্টগ্রামের মিরসরাই ও সীতাকুণ্ড এবং ফেনীর সোনাগাজীতে শিল্প সম্প্রসারণের পাশাপাশি ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
তবে নতুন প্রকল্পের উদ্যোগ নেওয়ার সময় এনএসইজেডের আরও কয়েকটি বড় প্রকল্প চলমান রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ২০১৯ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া ৭৬২ কোটি টাকার পানি শোধনাগার ও গভীর নলকূপ প্রকল্প, ২০২০ সালের এপ্রিলে শুরু হওয়া ২৭৪ কোটি টাকার সড়ক ও ড্রেনেজ অবকাঠামো প্রকল্প এবং ২০২১ সালের জানুয়ারিতে শুরু হওয়া ৪ হাজার ১৪০ কোটি টাকার এনএসইজেড উন্নয়ন প্রকল্প।
একসঙ্গে একাধিক বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ অর্থনৈতিক অঞ্চলের অবকাঠামোগত চাহিদার বিষয়টি তুলে ধরলেও একই সঙ্গে প্রকল্পগুলোর সমন্বয়, বাস্তবায়নের গতি এবং নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, নতুন প্রকল্প নেওয়ার আগে চলমান প্রকল্পগুলো শেষ করা এবং বিদ্যমান বিনিয়োগের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, একসঙ্গে অনেক প্রকল্প গ্রহণ করলে সরকারি সম্পদের ওপর চাপ বাড়ে এবং প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুফল পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা তৈরি হতে পারে। তাই প্রকল্প বাছাই, সময়মতো বাস্তবায়ন এবং কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা জরুরি।

