একসময় দেশের সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাত হিসেবে আলোচনায় এসেছিল জাহাজ নির্মাণ শিল্প। ১৬ বছর আগে প্রথমবারের মতো বিদেশে তৈরি জাহাজ পাঠিয়ে বাংলাদেশ যে সাড়া ফেলেছিল, তা নতুন এক শিল্পের স্বপ্ন দেখিয়েছিল উদ্যোক্তাদের। প্রথম বছরেই এ খাত থেকে আসে ৪ কোটি ৪ লাখ ৪০ হাজার ডলার বৈদেশিক মুদ্রা। পরের বছর আয় আরও প্রায় ১৬ শতাংশ বাড়ায় বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশাও বেড়ে যায়।
কিন্তু সেই আশাব্যঞ্জক যাত্রা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ইউরোপের অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাবে তৃতীয় বছরেই রপ্তানি আয় প্রায় ৮৮ শতাংশ কমে যায়। পরের অর্থবছরে পতনের হার আরও বেড়ে যায়, ফলে জাহাজ নির্মাণ শিল্প গভীর সংকটে পড়ে।
এরপর অবশ্য কিছুটা ঘুরে দাঁড়ায় খাতটি। টানা তিন বছর প্রবৃদ্ধির পর ২০১৬-১৭ অর্থবছরে জাহাজ রপ্তানি থেকে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৬ কোটি ৫৬ লাখ ১০ হাজার ডলার আয় হয়। তবে সেই ধারা আবারও থেমে যায়। পরবর্তী বছরগুলোতে আয় কমতে থাকে এবং কোভিড-১৯ মহামারী শিল্পটিকে কার্যত স্থবির করে দেয়। ২০২০-২১ ও ২০২১-২২ অর্থবছরে জাহাজ রপ্তানি থেকে কোনো বৈদেশিক মুদ্রা আসেনি। ২০২২-২৩ অর্থবছরে সামান্য রপ্তানি হলেও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আবারও আয় শূন্যে নেমে আসে।
দীর্ঘ মন্দার পর গত দুই বছরে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে। নতুন রপ্তানি আদেশ পাওয়া, বিদেশি ক্রেতাদের আগ্রহ এবং সরকারি সহায়তার কারণে উদ্যোক্তারা আবারও আশাবাদী হয়ে উঠেছেন। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ ২ কোটি ২৫ লাখ ৩০ হাজার ডলারের জাহাজ রপ্তানি করেছে। আগের অর্থবছরে এই আয় ছিল মাত্র ২৯ লাখ ৪০ হাজার ডলার। ফলে এক বছরের ব্যবধানে প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৬৬৬ দশমিক ৩৩ শতাংশ।
বাংলাদেশ থেকে প্রথম জাহাজ রপ্তানি করে ঢাকার আনন্দ শিপইয়ার্ড অ্যান্ড স্লিপওয়েজ। ২০০৮ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর ডেনমার্কে একটি পণ্যবাহী জাহাজ পাঠানোর মাধ্যমে দেশের জাহাজ রপ্তানির যাত্রা শুরু হয়। এর দুই বছর পর ২০১০ সালের ৩০ নভেম্বর চট্টগ্রামের ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড জার্মানিতে সমুদ্রগামী জাহাজ রপ্তানি করে। এখন পর্যন্ত এই দুটি প্রতিষ্ঠানই আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের জাহাজ রপ্তানির প্রধান প্রতিনিধিত্ব করছে।

বিশ্বজুড়ে সমুদ্রভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। মৎস্য আহরণ, খনিজসম্পদ অনুসন্ধান, সামুদ্রিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সমুদ্র পর্যটন, নিরাপত্তা ও গবেষণার জন্য প্রয়োজন হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের উচ্চপ্রযুক্তির বিশেষায়িত জাহাজ। বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণ পণ্যবাহী জাহাজের তুলনায় এই বাজারে ওঠানামা কম। সে কারণেই বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা বিশেষায়িত ছোট ও মাঝারি জাহাজ নির্মাণে সম্ভাবনা দেখছেন।
জাহাজ রপ্তানি বাড়াতে সরকার নগদ সহায়তা, কর সুবিধা, বিশেষ তহবিলসহ বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা দিয়েছে। ব্যাংকগুলোও এ শিল্পে উল্লেখযোগ্য অর্থায়ন করেছে। ২০২১ সালে প্রণীত জাহাজ নির্মাণশিল্প উন্নয়ন নীতিমালায় বছরে ৪ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। তবে বৈশ্বিক জাহাজ নির্মাণ শিল্পের মন্দা, কোভিড-১৯ এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সেই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হয়নি। বিদেশি ক্রেতারা অনেক অর্ডার বাতিল করেন এবং দুই রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের ঋণও অনিয়মিত হয়ে পড়ে।
ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্যাপ্টেন সোহেল হাসান বলেন, কয়েক বছর কোনো জাহাজ রপ্তানি করা সম্ভব হয়নি। এতে শুধু প্রতিষ্ঠান নয়, ব্যাংক ও পুরো শিল্পই সংকটে পড়ে। ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান খেলাপি হয়ে যায় এবং বহু শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েন।
তার ভাষ্য, গত দেড় বছরে প্রতিষ্ঠানটি ছয়টি মাঝারি আকারের জাহাজ আবুধাবি, দুবাই ও আজমানে রপ্তানি করেছে। বর্তমানে আরও পাঁচটি বড় জাহাজ নির্মাণাধীন রয়েছে। এর মধ্যে দুটি চলতি বছর, দুটি আগামী বছর এবং একটি পরের বছর রপ্তানি করা হবে। সবচেয়ে বড় জাহাজটি যাবে নরওয়েতে।
তিনি জানান, বর্তমানে ইউরোপসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে নতুন অর্ডার আসছে। একটি জাহাজ নির্মাণে প্রায় ১৮ মাস সময় লাগে। সক্ষমতা অনুযায়ী নতুন অর্ডার গ্রহণ করা হচ্ছে। তার মতে, বাংলাদেশ ব্যাংকের ২ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল থেকে ঋণ পাওয়া গেলে উদ্যোক্তারা নিজেদের অর্থায়নেই জাহাজ নির্মাণ করে রপ্তানি করতে পারবেন।
আনন্দ শিপইয়ার্ড ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে জাহাজ রপ্তানি করেছিল। এরপর তিন বছর কোনো জাহাজ বিদেশে পাঠাতে পারেনি। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রতিষ্ঠানটি ৫ হাজার ৫০০ ডেডওয়েট টন ধারণক্ষমতার একটি আধুনিক মাল্টিপারপাস জাহাজ তুরস্কের নোপ্যাক শিপিং অ্যান্ড ট্রেডিং লিমিটেডের কাছে হস্তান্তর করে।
প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান আবদুল্লাহেল বারী বলেন, এটি তাদের তৈরি সবচেয়ে বড় ও প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত জাহাজ। যদিও অর্ডারটি কোভিডের আগের, দীর্ঘ সময় ধরে নির্মাণ শেষে সেটি সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে।
তার দাবি, বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে আগ্রহ বাড়লেও আর্থিক সংকটের কারণে নতুন অর্ডার গ্রহণে সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী একটি জাহাজের অর্থায়নের বড় অংশ ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে এলেও উদ্যোক্তাদের নিজস্ব তহবিল থেকে ১৫ শতাংশ অর্থ জোগাড় করতে হয়, যা অনেক সময় বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এ খাতের জন্য গঠিত ২ হাজার কোটি টাকার তহবিল সহজলভ্য করার অনুরোধ জানিয়েছেন বলেও জানান তিনি।
অ্যাসোসিয়েশন অব এক্সপোর্ট ওরিয়েন্টেড শিপ বিল্ডিং ইন্ডাস্ট্রিজ অব বাংলাদেশের (এইওএসআইবি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে অন্তত ১০টি কারখানার জাহাজ রপ্তানির সক্ষমতা রয়েছে। যদিও বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে নিয়মিত রপ্তানি করছে দুটি প্রতিষ্ঠান।
বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২২ সালের মে মাসে জাহাজ নির্মাণশিল্পের জন্য ২ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করে। নীতিমালা অনুযায়ী উদ্যোক্তারা সর্বোচ্চ সাড়ে ৪ শতাংশ সুদে ঋণ পাওয়ার সুযোগ রয়েছে এবং ব্যাংকগুলো ১ শতাংশ সুদে পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা নিতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত এই তহবিল থেকে কোনো উদ্যোক্তা ঋণ নেননি। উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, দীর্ঘ সময় অর্ডার না থাকায় তখন ঋণ নেওয়ার প্রয়োজন ছিল না। এখন নতুন অর্ডার আসতে শুরু করায় ব্যাংকের সঙ্গে আবার যোগাযোগ শুরু হয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) চেয়ারম্যান জাইদি সাত্তারের মতে, বড় সমুদ্রগামী জাহাজের বাজারে চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা কঠিন। তবে ছোট ও মাঝারি আকারের বিশেষায়িত জাহাজ নির্মাণে বাংলাদেশের বড় সম্ভাবনা রয়েছে।
তার হিসাবে, ১২ হাজার ডেডওয়েট টন পর্যন্ত মাল্টিপারপাস জাহাজ, ফিডার ভেসেল ও ফেরির বৈশ্বিক বাজারের আকার প্রায় ১১৫ বিলিয়ন ডলার। ২০২৭ সালের মধ্যে বাংলাদেশ যদি এই বাজারের মাত্র ১ শতাংশও দখল করতে পারে, তাহলে বছরে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয় সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, বিশ্বের প্রায় ৮০ শতাংশ বাণিজ্য সমুদ্রপথে পরিচালিত হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বাড়লে জাহাজ নির্মাণের চাহিদাও বাড়বে। বর্তমানে শিল্পটি একটি ঊর্ধ্বমুখী চক্রে রয়েছে। তাই সরকারি নীতিসহায়তা ও বেসরকারি বিনিয়োগের সমন্বয়ে এই সুযোগ কাজে লাগানো গেলে জাহাজ নির্মাণ বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাতে পরিণত হতে পারে।

