দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে শ্রমনির্ভর শিল্পের ওপর ভর করেই বাংলাদেশের অর্থনীতির বিকাশ ঘটেছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাকশিল্প দেশের রপ্তানি আয়, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের সবচেয়ে বড় ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। তবে প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির ফলে সেই প্রচলিত অর্থনৈতিক কাঠামো এখন বড় ধরনের পরিবর্তনের মুখোমুখি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), অটোমেশন এবং বৈশ্বিক উৎপাদন ব্যবস্থার রূপান্তর শুধু শিল্প খাত নয়, ডিজিটাল অর্থনীতি ও প্ল্যাটফর্মভিত্তিক সেবাসহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই কর্মসংস্থানের ধরন বদলে দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি না নিলে বাংলাদেশে প্রায় ৪০ শতাংশ চাকরি প্রযুক্তির কারণে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে তরুণ, নারী এবং প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর ওপর। কারণ তাদের বড় অংশ এখনও অনানুষ্ঠানিক, স্বল্পদক্ষ এবং প্রযুক্তির মাধ্যমে সহজেই প্রতিস্থাপনযোগ্য কাজে নিয়োজিত। এদিকে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পথে রয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা আরও বাড়বে। এমন বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে— দেশের শ্রমবাজার, শিক্ষা ব্যবস্থা এবং নীতিগত প্রস্তুতি কি সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে পারছে?
বিশ্বজুড়েই প্রযুক্তিগত পরিবর্তন শ্রমবাজারে প্রভাব ফেলছে। তবে বাংলাদেশের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। কারণ দেশের শ্রমবাজার এখনও কাঠামোগতভাবে দুর্বল। ম্যানুফ্যাকচারিং খাত সম্প্রসারিত হলেও সেই অনুপাতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। অন্যদিকে ডিজিটাল ও উচ্চমূল্য সংযোজনকারী সেবা খাত দ্রুত বাড়লেও এসব খাতের অনেক চাকরিতে সামাজিক নিরাপত্তা বা দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন ব্যবস্থা এখনও শিল্পের পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে। পাশাপাশি এই শিক্ষাব্যবস্থা এখনও অনেকের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারেনি। ফলে নতুন প্রযুক্তিনির্ভর শ্রমবাজারের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ জনশক্তি তৈরি হচ্ছে ধীরগতিতে।
অটোমেশন ও ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রভাব ইতোমধ্যেই শিল্প ও সেবা খাতে দৃশ্যমান। গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০৪১ সালের মধ্যে তৈরি পোশাকশিল্পে কর্মরত নারীদের প্রায় ৬০ শতাংশ প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে কম দক্ষ শ্রমিক, অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মী এবং সহজে প্রতিস্থাপনযোগ্য কাজে নিয়োজিত মানুষের।
বিশেষ করে পোশাকশিল্পের নারী শ্রমিক, কর্মসংস্থানের সুযোগ খুঁজতে থাকা তরুণ এবং অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী দেশে প্রায় ১৩ লাখ কর্মসংস্থান কমেছে। এর প্রায় ৯০ শতাংশই ছিল নারীদের। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি না নিলে প্রযুক্তিগত পরিবর্তন বিদ্যমান বৈষম্য আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
গত এক দশকে ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং দক্ষতা উন্নয়ন নিয়ে বিভিন্ন নীতি ও পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। তবে বাস্তবায়নের গতি এখনও সন্তোষজনক নয়। শিল্পভিত্তিক রূপান্তর কৌশল, শ্রমিকদের পুনঃদক্ষতা কর্মসূচি এবং ভবিষ্যৎ শ্রমবাজারের প্রস্তুতি এখনও বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
প্রাথমিক শিক্ষা থেকে উচ্চশিক্ষা কিংবা কারিগরি শিক্ষার পাঠ্যক্রমেও এআই, অটোমেশন ও ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। একই সঙ্গে দ্রুত বিস্তৃত হওয়া প্ল্যাটফর্ম ও গিগ অর্থনীতির জন্য কার্যকর নীতিগত কাঠামোও এখনও গড়ে ওঠেনি। বিশেষজ্ঞদের মতে, মূল সমস্যা নীতির অভাব নয়; বরং বাস্তবায়ন, সমন্বয়, পর্যবেক্ষণ এবং জবাবদিহির দুর্বলতা।
কী করতে হবে এখন: বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের বদলে সমন্বিত জাতীয় পরিকল্পনা গ্রহণের বিকল্প নেই। তাদের মতে—
- কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে শিল্পের চাহিদাভিত্তিক করতে হবে।
- পাঠ্যক্রমে ডিজিটাল দক্ষতা, এআই ও ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
- কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে শ্রমিকদের পুনঃদক্ষতা অর্জনের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
- শিল্প প্রণোদনা, ঋণ সুবিধা ও রপ্তানি সহায়তার সঙ্গে কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নকে যুক্ত করতে হবে।
- দক্ষতা, শূন্যপদ ও শ্রমবাজারের তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ করে শিক্ষা ও শিল্পনীতির সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে।
- গিগ ও প্ল্যাটফর্মভিত্তিক শ্রমিকদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা, দুর্ঘটনা সুরক্ষা, পেনশন এবং আয় নিরাপত্তাসহ সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
- নারী ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক পুনঃদক্ষতা, সহায়ক প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থান সহায়তা বাড়াতে হবে।
- শিল্প, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, রপ্তানি ও সামাজিক সুরক্ষা নীতিকে একীভূত করে একটি সমন্বিত কর্মসংস্থান কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের শ্রমবাজার এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। প্রযুক্তি, জনমিতিক পরিবর্তন, বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে কর্মসংস্থানের ধরন দ্রুত বদলাচ্ছে কিন্তু সেই পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি এখনও পিছিয়ে রয়েছে। এই ব্যবধান দীর্ঘ হলে কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা ও বৈষম্য আরও বাড়তে পারে।
বর্তমান সরকার আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্য ঘোষণা করেছে। পাশাপাশি ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্যও রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু কর্মসংস্থানের সংখ্যা বাড়ালেই হবে না। সেই কর্মসংস্থানকে হতে হবে উৎপাদনশীল, মর্যাদাপূর্ণ, প্রযুক্তি-উপযোগী এবং সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিতকারী।
কারণ প্রযুক্তির অগ্রগতি অপেক্ষা করবে না। পরিবর্তনের সঙ্গে দ্রুত খাপ খাওয়াতে না পারলে ভবিষ্যতের শ্রমবাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
- দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, তৌফিকুল ইসলাম খান, মমতাজুল জান্নাত, মালিহা রহমান: সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) যথাক্রমে সম্মাননীয় ফেলো, অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা), জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী, প্রোগ্রাম সহযোগী

