দেশে একদিকে নগদ লেনদেন কমিয়ে ক্যাশলেস অর্থনীতি গড়ে তোলার নানা উদ্যোগ চলছে কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। ব্যাংকে অর্থ জমা রাখার বদলে অনেক মানুষ টাকা তুলে নিজের কাছেই রাখছেন। ফলে ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে, যা অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকারদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতে আস্থার ঘাটতি, কয়েকটি ব্যাংকের আর্থিক দুর্বলতা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং নগদনির্ভর ব্যবসায়িক পরিবেশ—এসব কারণে মানুষের মধ্যে হাতে নগদ অর্থ রাখার প্রবণতা বেড়েছে। এই ধারা দীর্ঘস্থায়ী হলে ব্যাংকগুলোর তারল্য ব্যবস্থাপনা এবং সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে মাস শেষে ব্যাংকের বাইরে মানুষের হাতে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা। এর আগের মাস এপ্রিল শেষে এই পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৯৯ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র এক মাসের ব্যবধানে ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থ বেড়েছে ৪৯ হাজার ৯৪৯ কোটি টাকা, যা শতাংশের হিসাবে ১৬ দশমিক ৬৮।
গত বছরের একই সময়ের তুলনায়ও এই প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য। এক বছর আগে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৯৩ হাজার ৭৭৮ কোটি টাকা। সেই হিসাবে এক বছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৮ দশমিক ৯২ শতাংশ। অন্যদিকে একই সময়ে ব্যাংক আমানতের প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ১১ দশমিক ৪৪ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, মানুষের হাতে নগদ অর্থ বেড়ে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো ব্যাংকিং খাতের প্রতি আস্থার ঘাটতি। অনেক আমানতকারী এখন ব্যাংকে অর্থ রাখাকে আগের মতো নিরাপদ মনে করছেন না। ফলে দুর্বল ব্যাংক থেকে তুলে নেওয়া অর্থের একটি বড় অংশ আর ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরে আসছে না।
তিনি আরও বলেন, মূল্যস্ফীতির কারণে পরিবারের মাসিক ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বাজার, চিকিৎসা, শিক্ষা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে আগের তুলনায় বেশি নগদ অর্থের প্রয়োজন হচ্ছে। একই সঙ্গে অনিশ্চিত অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে অনেক পরিবার জরুরি প্রয়োজনের কথা বিবেচনা করে হাতে নগদ অর্থ রাখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে।
ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, কয়েকটি দুর্বল ব্যাংক থেকে গ্রাহকদের অর্থ তুলে নেওয়ার প্রবণতা এখনো পুরোপুরি থামেনি। উত্তোলিত অর্থের একটি অংশ শক্তিশালী ব্যাংকগুলোতে জমা হলেও উল্লেখযোগ্য অংশ মানুষের হাতেই নগদ হিসেবে থেকে যাচ্ছে।
সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শওকত আলী খান বলেন, তাঁদের ব্যাংকে আমানতের প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। তবে কিছু ব্যাংক থেকে গ্রাহকেরা অর্থ তুলে নেওয়ায় সেসব প্রতিষ্ঠানে তারল্যসংকট তৈরি হয়েছে। সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মে মাস শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২০ লাখ ৪১ হাজার ৯৯ কোটি টাকা। এক বছর আগে একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ১৮ লাখ ৩২ হাজার ৬৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ বছরে আমানত বেড়েছে ১১ দশমিক ৪৪ শতাংশ।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, কয়েকটি ব্যাংকের আর্থিক সংকট প্রকাশ্যে আসার পর গ্রাহকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। এর ফলে ওইসব ব্যাংক থেকে অর্থ উত্তোলনের চাপ বাড়তে থাকে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে কয়েকটি ব্যাংক স্বাভাবিকভাবে কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা হারায়। পরে সেগুলোকে একীভূত করে সরকারি মালিকানাধীন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়। এ ছাড়া সম্প্রতি ইসলামী ব্যাংকেও বড় ধরনের তারল্যসংকটের ঘটনা আলোচনায় এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ব্যাংক থেকে অর্থ তুলে নগদ হিসেবে সংরক্ষণ করার প্রবণতা ব্যাংকিং খাত কিংবা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক নয়। এতে ব্যাংকগুলোর তারল্যের ওপর চাপ বাড়তে পারে। পাশাপাশি বাজারে নগদ অর্থের প্রবাহ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেলে আর্থিক ব্যবস্থাপনায়ও নতুন ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

