বিশ্বজুড়ে উন্নয়ন সহযোগিতার অর্থায়নে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। আন্তর্জাতিক অনুদান কমে যাওয়ার প্রবণতা শুধু উন্নয়ন প্রকল্পের গতি কমিয়ে দেবে না, বরং ভবিষ্যতে কোন দেশ কত অর্থ পাবে, কোন খাতে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে এবং উন্নয়ন সহযোগিতার কাঠামো কীভাবে পরিচালিত হবে—এসব ক্ষেত্রেও নতুন বাস্তবতা তৈরি করবে।
অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (ওইসিডি) প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতি যথাযথভাবে সামাল দেওয়া না গেলে বহুপাক্ষিক উন্নয়ন ব্যবস্থার ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
অনুদান নাকি ঋণ—দাতা দেশগুলোর সামনে কঠিন সমীকরণ:
ওইসিডির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, উন্নয়ন সহায়তার বাজেট সংকুচিত হলে দাতা দেশগুলোর সামনে মূলত তিনটি পথ খোলা থাকে। একটি হলো এমন আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাধিকার দেওয়া, যারা সীমিত মূলধন ব্যবহার করে তুলনামূলক বড় অঙ্কের অর্থায়ন নিশ্চিত করতে পারে। দ্বিতীয়টি হলো দরিদ্র দেশগুলোর জন্য অনুদান ও স্বল্পসুদে ঋণের ব্যবস্থা বজায় রাখা। আর তৃতীয় বিকল্প হচ্ছে সব উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানের বাজেট সমান হারে কমিয়ে দেওয়া।
তবে প্রতিটি সিদ্ধান্তেরই আলাদা প্রভাব রয়েছে। ঋণভিত্তিক অর্থায়নকে অগ্রাধিকার দিলে সামগ্রিক অর্থের প্রবাহ কিছুটা ধরে রাখা সম্ভব হলেও অনুদানের পরিমাণ কমে যায়। আবার অনুদান সুরক্ষিত রাখতে চাইলে মোট অর্থায়নের পরিমাণ কমে আসে। ফলে সীমিত বাজেটে আগের মতো অনুদান ও অর্থ ছাড়—দুটোই ধরে রাখা সম্ভব নয় বলে মনে করছে সংস্থাটি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বহুপাক্ষিক সংস্থাগুলোর জন্য অবাধ বা কোর ফান্ডিং ক্রমেই কমছে। এর পরিবর্তে বাড়ছে নির্দিষ্ট প্রকল্পভিত্তিক ও শর্তসাপেক্ষ অর্থায়ন। কোর ফান্ডিং থাকলে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত অর্থ ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু শর্তযুক্ত অর্থায়নের ক্ষেত্রে অর্থ ব্যয় করতে হয় দাতা দেশের নির্ধারিত খাতে। ফলে নতুন কোনো মানবিক বা বৈশ্বিক সংকট দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়ে।
ওইসিডির তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালে উন্নয়ন সহায়তার ১১ শতাংশ ছিল শর্তযুক্ত বহুপাক্ষিক অর্থায়ন। ২০২৪ সালে এই হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮ শতাংশে। একই সময়ে কোর ফান্ডিংয়ের অংশ কমেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বহুপাক্ষিক সংস্থাগুলো বৈশ্বিক অগ্রাধিকারের পরিবর্তে পৃথক দাতা দেশের নীতিগত লক্ষ্য বাস্তবায়নে বেশি মনোযোগী হয়ে উঠতে পারে।
প্রতিবেদন বলছে, জাতিসংঘ উন্নয়ন ব্যবস্থার অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান স্বেচ্ছা অনুদানের ওপর নির্ভরশীল। পাশাপাশি তাদের অর্থায়নের বড় অংশ আসে অল্প কয়েকটি দাতা দেশের কাছ থেকে। বেসরকারি উৎস থেকেও তাদের অর্থ সংগ্রহের সুযোগ সীমিত।
এ কারণে বড় দাতারা অনুদান কমালে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ে এসব সংস্থা। ওইসিডি বিশেষভাবে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি), আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম), ইউএনএইডস এবং জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তরকে উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
অর্থায়ন কমলে কী হতে পারে:
ওইসিডি ও বিভিন্ন বহুপাক্ষিক সংস্থার যৌথ জরিপে দেখা গেছে, ৭০ শতাংশের বেশি প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, অর্থের সংকট অব্যাহত থাকলে প্রকল্প স্থগিত, কার্যক্রম সীমিত কিংবা নতুন উদ্যোগ বাতিল করতে হতে পারে।
ইতোমধ্যে অনেক সংস্থা নতুন নিয়োগ স্থগিত করেছে, প্রশাসনিক ব্যয় কমিয়েছে এবং বিভিন্ন অঞ্চলে কার্যক্রম সংকুচিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যদিও এসব পদক্ষেপ স্বল্পমেয়াদে ব্যয় নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে, দীর্ঘমেয়াদে উন্নয়ন কার্যক্রমের মান ও কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ওইসিডির বিশ্লেষণ বলছে, স্বল্পোন্নত, নিম্ন আয়ের এবং সংঘাতপ্রবণ দেশগুলো আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার সহায়তার ওপর তুলনামূলকভাবে বেশি নির্ভরশীল। ফলে অর্থায়ন কমে গেলে এসব দেশই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিশেষ করে মানবিক সহায়তা, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, পুষ্টি, শিশু সুরক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে অর্থের ঘাটতি দেখা দিলে কোটি কোটি মানুষের জীবনে সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বব্যাংক, আঞ্চলিক উন্নয়ন ব্যাংক এবং অন্যান্য বহুপাক্ষিক উন্নয়ন ব্যাংক এখনো তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। কারণ তারা শুধু অনুদানের ওপর নির্ভরশীল নয়, মূলধন বাজার থেকেও অর্থ সংগ্রহ করতে পারে এবং সদস্য দেশগুলোর মূলধন ব্যবহার করে বহুগুণ ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা রাখে। তবে ওইসিডি সতর্ক করেছে, যদি এসব প্রতিষ্ঠানের রেয়াতি তহবিলে দাতা দেশগুলোর অবদান কমে যায়, তাহলে এর প্রভাব আরও বড় হবে। অনেক ক্ষেত্রে এক ডলার অনুদান কমে গেলে তিন ডলার বা তারও বেশি উন্নয়ন অর্থায়নের সুযোগ হারিয়ে যেতে পারে।
প্রথাগত পশ্চিমা দাতা দেশগুলোর অবদান কমার সঙ্গে সঙ্গে নতুন কিছু দেশ ও বেসরকারি ফাউন্ডেশনের ভূমিকা বাড়ছে। প্রতিবেদন বলছে, বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (আইডিএ) সর্বশেষ অর্থায়ন চক্রে চীন উল্লেখযোগ্যভাবে অবদান বৃদ্ধি করেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অবদান কমে যাওয়ার পর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অন্যতম বড় অর্থদাতায় পরিণত হয়েছে গেটস ফাউন্ডেশন। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পরিবর্তনের ফলে বৈশ্বিক উন্নয়ন সহযোগিতার ক্ষমতার ভারসাম্যেও নতুন সমীকরণ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পথে রয়েছে। এর ফলে আগামী বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক অনুদান স্বাভাবিকভাবেই কমবে। একই সময়ে যদি বৈশ্বিক উন্নয়ন অর্থায়নও সংকুচিত হয়, তাহলে দেশের জন্য চ্যালেঞ্জ আরও বাড়তে পারে।
বর্তমানে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা এবং জলবায়ু তহবিল বাংলাদেশের অবকাঠামো, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জলবায়ু অভিযোজন, সামাজিক সুরক্ষা এবং রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ অর্থায়ন দিয়ে আসছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বাস্তবতায় বাংলাদেশকে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায় বাড়ানো, বেসরকারি ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থের দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদারদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় ওইসিডি কয়েকটি সুপারিশ দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বহুপাক্ষিক সংস্থাগুলোর জন্য স্থিতিশীল ও নমনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করা, অল্প কয়েকটি দাতা দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমানো, অর্থায়ন কমানোর সিদ্ধান্ত সমন্বিতভাবে নেওয়া, নিম্ন আয়ের ও ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য রেয়াতি অর্থায়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাজের পুনরাবৃত্তি কমিয়ে দক্ষতা বাড়ানো এবং উন্নয়ন সহায়তায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি জোরদার করা।
সংস্থাটির মূল্যায়ন, বৈশ্বিক উন্নয়ন সহযোগিতা ব্যবস্থা বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে রয়েছে। এই সংকটকে সংস্কারের সুযোগ হিসেবে কাজে লাগানো গেলে ভবিষ্যতে আরও কার্যকর ও টেকসই উন্নয়ন কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হবে। অন্যথায় অর্থায়ন কমার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে দরিদ্র, ঝুঁকিপূর্ণ ও সংঘাতকবলিত দেশগুলোকে।
ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইএনএফ)-এর সাবেক নির্বাহী পরিচালক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে. মুজেরীর মতে, বর্তমান পরিস্থিতি শুধু অর্থের সংকট নয়, বৈশ্বিক উন্নয়ন সহযোগিতার কাঠামোগত পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত বহন করছে। তিনি বলেন, দাতা দেশগুলো ক্রমেই নিজেদের জাতীয় স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে উন্নয়ন অর্থায়নের জন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা আরও বাড়বে।
তার মতে, বাংলাদেশকে এখন থেকেই জলবায়ু অর্থায়ন, রূপান্তরমুখী উন্নয়ন অর্থায়ন এবং বহুপাক্ষিক উন্নয়ন ব্যাংকগুলোর রেয়াতি তহবিল ব্যবহারে কৌশলগত প্রস্তুতি নিতে হবে। পাশাপাশি উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদারদের আস্থাও আরও শক্তিশালী হবে।

